ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:২৬ এএম
আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:২৬ পিএম
আর মাত্র ৪ দিন পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচনকে ঘিরে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাভাবনা। নির্বাচন আদৌ হবে কি নাÑ এ রকম সন্দেহও পোষণ করেন কেউ কেউ। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল থেকে বলা হচ্ছেÑ কোনো বাধাই নির্বাচনকে ঠেকাতে পারবে না। নির্বাচন কমিশনও পুরোদস্তুর কাজ করছে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় সকল সেক্টর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের কর্মপরিধি সাজাচ্ছে।
তৃণমূলের ভাবনা
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ব্যবসায়ী মফিজুর রহমানের মতেÑ এবার নির্বাচনটি ভিন্ন ধরনের হবে। গত বুধবার ৭২ বছর বয়সী এই প্রবীণ বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বিগত ১২টি নির্বাচনই দেখেছি। অন্যান্য নির্বাচন ও এবারের নির্বাচনের বেশকিছু পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। যেমনÑ আগের নির্বাচনগুলোয় অবাধে মিছিল-মিটিং ছিল। এতে কোন রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা কতটুকু তা বোঝা যেত। এবার মিছিল-মিটিংয়ের জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। পোস্টারেও আছে নিষেধাজ্ঞা। ফলে বোঝা যাচ্ছে না কোন দল নির্বাচনে জয়ী হবে।
রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় রিকশা চালান মো. ওয়াহিদুর রহমান। তিনি বলেন, এবারর নির্বাচনী আমেজ নেই। কিছু কাপড়ের ব্যানার টানানো হয়েছে। আমাদের মেসগুলোতে আগে প্রার্থীরা যেত, এবার যাচ্ছে না।
গত রবিবার লালবাগ কেল্লার মোড় থেকে কামারাঙ্গীরচরগামী টেম্পুর যাত্রী মো. মাইদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আমার দেখা নির্বাচনগুলোর মধ্যে এবারের পরিবেশ সবচেয়ে গুমোট। ৬০ বছর বয়সী এই প্রবীণ বলেন, এই নির্বাচন নিয়ে কেউ মুখ খুলছে না। অর্থাৎ কে কোন প্রার্থীকে ভোট দেবেÑ তা বলছে না। যে দল প্রচারে আসছে তাদেরই আশ্বাস দিচ্ছে। আগে এ অবস্থা ছিল না। ভোটাররা আগেই কোনো একটা পক্ষ নিয়ে নিত।
একই গাড়িতে কথা হয় স্থানীয় মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষিকা রত্না পালের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা নির্বাচনটি সুষ্ঠু হবে। কেননা নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশ্বব্যাপী যে সুনাম, তা ক্ষুণ্ন হবে। তাই তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের।
বংশাল এলাকায় কথা হয় মধ্যবয়সী মোটরসাইকেল ব্যবসায়ী রবিউল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা ব্যবসায়ীরা চাই নির্বাচনটি হোক সুষ্ঠু। নতুন সরকার এলে ব্যবসার পরিবেশটা ভালো হবে।
গত ৩০ জানুয়ারি কুমিল্লার মুরাদনগর ও দেবিদ্বারে কথা হয় কয়েজন ভোটারের সঙ্গে। দেবিদ্বারের নয়ন বিশ্বাসের প্রত্যাশা নির্বাচনটি নিঃসন্দেহে সুষ্ঠু হবে। বিগত নির্বাচনগুলোর মতো প্রশ্নবিদ্ধ হবে না। মুরাদনগরের ভোটার আব্দুল কাইয়ুম বলেন, এই নির্বাচনে যে কয়েকটি দল অংশ নিয়েছে তারা কোনো প্রকার কারচুপি মেনে নেবে না। একদিকে জামায়াতে ইসলামী যেমন তৎপর থাকবে, অন্যদিকে বিএনপিও সচেতন থাকবেÑ যাতে কোনোভাবেই নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেওয়া না হয়।
সম্প্রতি সচিবালয়ে কথা হয় কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, নির্বাচনে কোনো প্রকার ইঞ্জিনিয়ারিং মানুষ গ্রহণ করবে না। প্রশাসনও সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে। তবে ভিন্নমতও আছে। কয়েকজন বলেন, আসলে নির্বাচন হবে কি না সেজন্য আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। কেননা এ নির্বাচনে মাত্র দুটি পক্ষÑ একদিকে বিএনপির নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া দলগুলো। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এখানে কোনো একটি জোট পিছু হটলেই নির্বাচন থমকে যাবে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সতর্ক ও তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।
আইনশৃঙ্খলা ও উপদেষ্টাদের ভাবনা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নাগরিকবান্ধব আচরণের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় স্টেডিয়াম, গুলিস্তানে অবস্থিত সেনা ক্যাম্প পরিদর্শন ও অসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
একই দিন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আশা করছি, এক সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন হয়ে যাবে। যদিও সন্দিহান লোকজনের এখনও অভাব নেই। তবে আমি মনে করি, তেমন কোনো কারণ নেই নির্বাচন না হওয়ার।
এদিকে গতকাল শুক্রবার নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এখন ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা ছাড়া আর কোনো প্রস্তুতি বাকি নেই।
কী ভাবছেন বিশেষজ্ঞরা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলমের মূল্যায়ন হচ্ছেÑ যথাসময়ে নির্বাচন না হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিশেষ একটি মহল নির্বাচন হবে নাÑ এ ধরনের একটি গুজব ছড়াচ্ছে। তবে এটি হালে পানি পাবে না। নির্বাচন নির্ধারিত সময়েই হবে। আর সেই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ড. মো. আব্দুল মান্নান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এবারের নির্বাচনে এক পক্ষ অপর পক্ষকে দমন করে ভোটকেন্দ্র দখল করে নেবেÑ এসব যাতে না হয়। এসব যারা করতে চায় মানুষ যেন তাদের পরিহার করে।
স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শে উজ্জীবিত চবি শিক্ষক সমাজের (সাদা দল) ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ড. শাহাদাত হোছাইন বলেন, প্রথমত আমরা এমন একটা নির্বাচন চাইÑ যেটা জুলাইয়ের প্রত্যাশা পূরণ করবে। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত পরিবেশ মোটামুটি ভালো থাকলেও কাদা ছোড়াছুড়ির পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। সেটা কমে এলে সবার জন্যই কল্যাণ।