নির্বাচন ঘিরে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’
আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৩ এএম
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দুই জোটের শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়ে ভোটের মাঠে দানা বাঁধছে এই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে ছড়ানো ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ প্রভাবিত করছে সব শ্রেণির সাধারণ নাগরিক ও ভোটারদের। বিশেষত প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দুই জোটের শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়ে ভোটের মাঠে দানা বাঁধছে এই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’।
এক দিনে দুটি ভোট এবং তার বিলম্বিত ফলাফলের সুযোগে নির্বাচনি ফল পাল্টে যেতে পারে, টার্গেটেট প্রার্থীকে হারিয়ে দেওয়া হতে পারে, পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র একটি রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার সব আয়োজন করা হচ্ছেÑ বিশেষত এমন সব প্রচারণা জনমনে নির্বাচন সম্পর্কে ধূম্রজাল সৃষ্টি করছে। ফলে বাড়ছে শঙ্কা ও সংশয়।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, “প্রতিটি নির্বাচনের আগেই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে থাকে। তবে এবারের অভিযোগগুলো সুনির্দিষ্ট হওয়ায় এর প্রতিরোধেরও সুযোগ রয়েছে।” তিনি বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় ফলাফল প্রভাবিত করার সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে এই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ এড়ানো সম্ভব।
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে অভিযোগ
নির্বাচন ঘিরে প্রথম অভিযোগ আসে প্রবাসীদের জন্য সরবরাহ করা পোস্টাল ব্যালট নিয়ে। অভিযোগ ওঠে, বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’ ব্যালটের অনুল্লেখযোগ্য স্থানে রাখা হয়েছে। পক্ষান্তরে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক দাঁড়িপাল্লাকে ওপরের দিকে দৃষ্টিগোচরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাহরাইনে জামায়াতের এক নেতার ধারণকৃত ভিডিও থেকে বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর বিএনপি ইসিতে গিয়ে এ ব্যাপারে অভিযোগ করে। জবাবে নির্বাচন কমিশন জানায়, আদ্যাক্ষর অনুযায়ী ব্যালট ছাপানো হয়েছে। পরে এই ব্যালট পেপারে সংশোধন আনা হলেও বিএনপির দাবি অনুযায়ী নির্বাচনি এলাকাভিত্তিক ব্যালট পেপার সরবরাহ করা হয়নি।
বিপুলসংখ্যক ভোটার স্থানান্তর
অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করার জন্য জামায়াত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট এলাকায় বিপুলসংখ্যক ভোটার স্থানান্তর করেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের নির্বাচনি এলাকাসহ কিছু টার্গেটেড আসন। কমিশন জানিয়েছে, ইসির ১০টি প্রশাসনিক অঞ্চলের মধ্যে ঢাকা অঞ্চলে এখন পর্যন্ত স্থানান্তর হয়েছে ৮৬ হাজার ৮২৫ জন ভোটার। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে বিভিন্ন আসনে স্থানান্তর হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ভোটার। আসনপিছু হিসেবে কোনোভাবেই ৪ হাজারের বেশি ভোটার স্থানান্তর হয়নি।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান দুই দফা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে একই অভিযোগ করার পর সাংবাদিকদের বলেছেন, এ বিষয়ে ইসির ব্যাখ্যায় তিনি সন্তষ্ট নন। বছরওয়ারি হিসেবে গত ২০২৩ সাল ও ২০২৪-এর চেয়ে ২০২৫ সাল ভোটার স্থানান্তরের সংখ্যা অনেক বেশি। গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ভোটার স্থানান্তরের আবেদন অনুমোদন হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৫৬৫ জনের।
নিরাপত্তা প্রটোকল নিয়ে প্রশ্ন
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং সেনাবাহিনীসহ নিরাপত্তা দেওয়া প্রটোকল নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে শুরু থেকেই। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ কমিশনে দেওয়া বিএনপির অভিযোগের পাল্টা অভিযোগ করে বলেছেন, “সরকারসহ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র বিএনপির হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। তারা সেভাবেই নির্বাচনের মাঠ সাজিয়েছে।” তারেক রহমানকে দেওয়া রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার কারণে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ফল প্রকাশে বিলম্ব হওয়ার ইস্যু
ইতোমধ্যেই সরকারি মহল থেকে জানানো হয়েছে, একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সংস্কার ইস্যুতে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট হওয়ায় নির্বাচনের ফল প্রকাশে বিলম্ব হতে পারে। অন্যদিকে ভোটের ব্যালট পেপার গণনায় দেরি হওয়ার সুযোগে কেউ যাতে নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ার সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে দলীয় নেতাকর্মীকে সতর্ক করেছেন খোদ বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২ ফেব্রুয়ারি যশোরে এক সমাবেশে তিনি বলেন, “নতুন গল্প শুনছি ইদানীং, ভোট গণনায় নাকি অনেক বেশি সময় লাগবে। এদেশের মানুষ হয়তো গত এক যুগ ভোট দিতে পারেনি। কিন্তু ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা যে তাদের নেই, তা তো নয়। ৯১ সালে তারা ভোট দিয়েছে। ৯৬ সালে ভোট দিয়েছে। ২০০১ সালে ভোট দিয়েছে। ভোট গুনতে কত সময় লাগে দেশের মানুষের সে ধারণা আছে।”
এদিকে জামায়াতের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ উঠেছে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের এনআইডি নাম্বার সংগ্রহ, বিকাশ, নগদ, রকেটসহ মোবাইল মানি ট্রান্সফার নাম্বার নেওয়ার। বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করে নিজেদের পক্ষে ভোট সংগ্রহের চেষ্টা করছে জামায়াত। এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও মাঠপর্যায়ে এমন ঘটনার প্রমাণ মিলেছে বলে জানাচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা।
ভুয়া সিল ও ব্যালটের অভিযোগ
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সর্বশেষ যে অভিযোগ করেছেন সেটা খুবই আশঙ্কাজনক। বরিশালের এক সমাবেশে তিনি বলেছেন, “একটি গোপন গোষ্ঠী নির্বাচনের আগেই ভুয়া সিল ও ব্যালট ছাপিয়ে অনৈতিকভাবে ভোট প্রভাবিত করার ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। যারা গুপ্ত নামে পরিচিত, তারা নতুন জালেম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ভুয়া সিল তৈরি করছে, ব্যালট ছাপাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের তথ্য সংগ্রহ করে ভয় দেখাচ্ছে।” তিনি এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। ইতোমধ্যে লক্ষ্মীপুরে ভোটের অবৈধ ৬টি সিল উদ্ধার এবং এ ঘটনায় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর এক নেতাসহ দুজনের নামে মামলা হয়েছে; যা থেকে অনেকেই বলছেন, এই অভিযোগ একেবারে অমূলক নয়।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, এবারও ২০১৮ সালের নির্বাচনের মতো ‘রাতের ভোট’ হতে পারে। জামায়াতের পক্ষে রাতের বেলায় যাতে কেউ ভোট দিতে না পারে, তার জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকতে বলেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি ভোটকেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর অবস্থান করে ফলাফল বুঝে নেওয়ার পর কেন্দ্র ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস অভিযোগ করেছেন, সরকারের একটি অংশের সমর্থন নিয়ে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেষ্টা চলছে। এর ফল হিসেবে ঢাকায় টার্গেটেড আসনগুলো নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেওয়া হতে পারে।
এর বাইরেও শেষ মুহূর্তে পরিকল্পিত সহিংসতা ছড়িয়ে নির্বাচন বানচাল করা, দেশে অরাজনৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠা কিংবা জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের মতো নানা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বের’ কথা ভেসে বেড়াচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। যার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। আবার জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বঙ্গভবনে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও ভারতের পরিকল্পিত চক্রান্তে একটি দল ক্ষমতায় যেতে চায়। এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলামও নির্বাচন ঘিরে ভারত ‘ষড়যন্ত্র’ করছে বলে অভিযোগ করেছেন।
এ ব্যাপারে ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জকরিয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “নির্বাচন ঘিরে একটি দলের এত অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে, এ রকম কখনও শোনা যায়নি। নির্বাচন নিয়ে যতই ষড়যন্ত্র হোক না কেন, জনগণ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে গেলে সব অনিয়ম বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ যারা অনিয়ম করতে চায় তারা সব সময় দুর্বলই থাকে। অসত্যের পথে যারাই থাকুক তাদের বুকে বল থাকে না।” তিনি বলেন, “সরকার, নির্বাচন কমিশন, মিড়িয়া সরব থাকলে কোনো নির্বাচনে ষড়যন্ত্র সফল হবে না।”