দীপক দেব
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:৫৩ এএম
প্রতীকি ছবি
আর মাত্র আট দিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ভোটের পরিবেশ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সহিংসতার আশঙ্কাও বাড়ছে। গত ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রতিপক্ষের বাধার মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ করছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকরা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় একাধিক সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহে নিহত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা। বিষয়গুলো নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানানো হলেও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন ঘটেনি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ইসি আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন না করলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আদৌ সম্ভব কি নাÑ সে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক এখন।
এরই মধ্যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মন্তব্য করেছে, সরকার মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে। এই অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ইসিকে আরও সক্রিয় হতে হবে এবং প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অসহিষ্ণু মনোভাব পরিহার করে দায়িত্বশীল আচরণ করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিগত তিন নির্বাচনকে ঘিরে নানা অভিযোগ ও প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। তারা চাইছেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই একটার পর একটা অঘটন ঘটে চলেছে। তফসিল ঘোষণার পরদিনই শরিফ ওসমান হাদির ওপর প্রাণঘাতী হামলা দিয়ে শুরু হয়েছে সহিংসতা। ১১ ডিসেম্বরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এ পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৪ জন। আহত হয়েছেন ৫ শতাধিক। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৪ জন, আহত হয়েছেন ৪১৪ জন। সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৫১টি। নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মতো ঘটনাকে ঘিরে মাঠপর্যায়ের উত্তেজনা বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি করছে। অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, সংঘাতের ঝুঁকিও তত বাড়বে। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অসহিষ্ণু মনোভাব ও ক্ষমতায় যাওয়ার যে প্রবল ইচ্ছা, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সহিংসতা রোধ করা সম্ভব হবে না।
সহিংসতার আশঙ্কা নানা মহলে : জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে কি না, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। গত ৩০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করে এখানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক করা হয়েছে। ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের এক ফেসবুক পোস্টে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক সহিংসতা বা উগ্রপন্থী হামলার ঘটনা ঘটতে পারে।
এদিকে গত রবিবার এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘দেশে কোনো নির্বাচনই শান্তিপূর্ণভাবে করা যায়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিক্ষিপ্ত বা বিচ্ছিন্ন সহিংসতা হতে পারে। তা এড়াতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে। নির্বাচনকালীন সহিংসতা নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ বিদেশিদের জানানো হয়েছে।’
সরকার যদি মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে, তাহলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আর যেন নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা না হয়। তবে সহিংসতার ঝুঁকি শুধু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত নয়, এর পরবর্তী কয়েক দিনও থাকতে পারে। সরকার এই ঝুঁকির বিষয়টি ভালোভাবেই জানে এবং ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা ও সক্ষমতা তাদের রয়েছে।’ অতীত নির্বাচনী ইতিহাসের কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘অতীতের নির্বাচনগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সহিংসতা প্রতিরোধ করতে হবে।’
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী সহিংসতার ৬৪টি ঘটনার মধ্যে ৩৩টিই ঘটেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। এ ছাড়া বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বে ১৩টি, বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ৯টি সংঘর্ষ, গণঅধিকার পরিষদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে একটি এবং বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে একটি ঘটনা ঘটেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে কমপক্ষে ৭৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে ১১ জন নিহত হয়েছেন এবং কমপক্ষে ৬১৬ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচনী প্রচার শুরুর পর ২১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত কমপক্ষে ৫১টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে ৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৪১৪ জন।
প্রার্থীদের অসহিষ্ণুতা ও ইসির নমনীয়তা আশঙ্কা বাড়াচ্ছে : নির্বাচন সামনে রেখে সংঘাত-সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ার পেছনে মোটাদাগে দুটি কারণকে উল্লেখ করছেন কেউ কেউ। এর একটি হচ্ছে আচরণবিধি ভঙ্গ নিয়ে ইসির নমনীয় আচরণ, যা আপরাধকে আরও উৎসাহিত করছে। আরেকটি প্রার্থীদের অসহিষ্ণু মনোভাব। রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ও সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করে নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিতে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অসহিষ্ণু আচরণ করছেন অনেকেই।
অসহিষ্ণুতা থেকেই সহিংসতা সৃষ্টি হয় এবং এখানেও সেটা হচ্ছে বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের অন্যতম সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে চরম অবক্ষয় ও অসহিষ্ণুতা বিরাজ করছে। রাজনীতি এখন এমন এক শ্রেণির হাতে চলে যাচ্ছে, যাদের মধ্যে যেকোনো উপায়ে এমপি হওয়ার মানসিকতা দেখা দিয়েছে। ফলে তারা এমন অসহিষ্ণু আচরণ করতেও কুণ্ঠাবোধ করছেন না। আর এই অসহিষ্ণুতা থেকেই সহিংসতা দেখা দিচ্ছে। এর পেছনে নির্বাচন কমিশনের নমনীয়তাকেও দায়ী করেছেন নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম। তিনি বলেন, ‘ইসি দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দিয়েছে, যেটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এ ছাড়া বড় দুই দলের প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতেও তারা উদাসীনতা দেখাচ্ছে। প্রার্থীরা যখন দেখছেন আচরণবিধি ভঙ্গ করলে কঠোর শাস্তি পেতে হচ্ছে না, তখন তারা আচরণবিধি ভঙ্গে আরও উৎসাহিত হচ্ছেন। আচরণবিধি ভঙ্গ থেকেই সহিংসতা উৎসাহিত হচ্ছে।’
সহিংসতার ঝুঁকি এড়াতে তিনটি পদক্ষেপের কথা বলেছেন নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের অন্যতম সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলিম। তিনি বলেন, ‘ইসিকে ছোটখাটো অভিযোগ থেকে শুরু করে প্রতিটি ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। দ্রুত তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পেলে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ আসনের যে তালিকা করা হয়েছে, সেগুলোতে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সর্বোপরি রাজনৈতিক দলগুলোকেও ভালো নির্বাচনের জন্য সহযোগিতা করতে হবে এবং সহিষ্ণু আচরণ করতে হবে। তবেই ভালো ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব হবে।’
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতির বার্তা : নির্বাচন নিয়ে সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করা হলেও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য নির্বাচন-পূর্ববর্তী ৪ দিন নিবিড় টহল পরিচালনা করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় টহল কার্যক্রম বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে নিবিড়ভাবে পরিচালনা করতে হবে। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারিসহ বিভিন্ন অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।’ উপদেষ্টা বলেন, ‘নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।’
নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৫ হাজারের বেশি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ৮ হাজার ৭৮০টি, গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ১৬ হাজার ৫৪৮টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ১৭ হাজার ৪৩৩টি। রাজধানী ঢাকায় পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর। ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ৬১৪টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ২৫ হাজার ৫০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা এবং ৫০০টি ড্রোন ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি সারা দেশে মোতায়েন থাকবেন মোট ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৫০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। এর মধ্যে দেড় লাখ পুলিশ, এক লাখের বেশি সেনাসদস্য এবং ৫ লাখ ৭৬ হাজার আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
যা বলছে কমিশন : নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর করতে ইসির পক্ষ থেকে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসউদ। গতকাল সোমবার তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকে ঘিরে কোনো ধরনের অনিয়ম হবে না। সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকবে, তারপরও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটার আশঙ্কা তো থাকেই। কারণ নির্বাচনকে ভালো করার জন্য সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সহযোগিতা বেশি দরকার।’