প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:২৮ পিএম
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে সোমবার আয়োজিত ‘পলিসি কনক্লেভ অন মিসইনফরমেশন: চ্যালেঞ্জেস টু গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ শীর্ষক নীতিসংলাপে বক্তব্য দেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদক মারুফ কামাল খান। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, সুষ্ঠু নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মিসইনফরমেশন ও ডিজইনফরমেশন-(ভুল ও অপতথ্য) এমন মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেছেন, ভারতীয় কিছু গণমাধ্যম এবং আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশকে নিয়ে অপতথ্য ছড়াচ্ছে, যা শুধু সরকারের নয়, বরং পুরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্যই হুমকি।
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে সোমবার আয়োজিত ‘পলিসি কনক্লেভ অন মিসইনফরমেশন: চ্যালেঞ্জেস টু গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ শীর্ষক নীতিসংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সাংবাদিক সমিতি (ডিআইইউসাস) বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সার্বিক সহযোগিতায় এই নীতিসংলাপের আয়োজন করা হয়।
প্রেস সচিব বলেন, “ভারতের অনেক প্রভাবশালী পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে, যারা কোনো দিন বাংলাদেশ সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেয়নি। আমরা দেখেছি আনন্দবাজার পত্রিকার মতো সর্বাধিক পঠিত বাংলা দৈনিকও একাধিকবার মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ করেছে।
“গত ১৮ মাসে ভারতীয় মিডিয়া যেভাবে বাংলাদেশকে নিয়ে ভয়াবহ মাত্রার মিসইনফরমেশন ছড়িয়েছে, তা নজিরবিহীন। গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের কোনো সরকার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে”।
তিনি অভিযোগ করেন, ‘অফ ইন্ডিয়া’ নামের একটি ওয়েবসাইট নিয়মিতভাবে বাংলাদেশবিরোধী ঘৃণা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে। তবে বিষয়টি শুধু কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধ নয়-ভারতের বড় বড় দৈনিক পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলও এই অপতথ্য ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত। এটা কি তারা নিজেরাই করছে, নাকি এর পেছনে কেউ কলকাঠি নাড়ছেএই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক,” বলেন প্রেস সচিব।
তিনি আরও বলেন, “গণতন্ত্র এলেও সংখ্যালঘুরা নিরাপদ নয়-এমন ইমেজ তৈরি করা হচ্ছে”।
“বর্তমান সরকার একটি শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার পালাবদল ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। আমরা একটি স্মুথ ট্রানজিশন চাই। আমরা একটি ভালো নির্বাচন চাই। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক যুগ দেখতে আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি”।
কিন্তু একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বাইরে পরিকল্পিতভাবে এমন একটি ইমেজ তৈরি করা হচ্ছে-বাংলাদেশে গণতন্ত্র এলেও সংখ্যালঘুরা নিরাপদ থাকবে না, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত করা হচ্ছে।
শফিকুর রহমান বলেন, “ইন্ডিয়ান মিডিয়া এবং আওয়ামী লীগ অহরহ এই বয়ান ছড়াচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা আমাদের সরকারকে দুর্বল করছে, গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে হুমকিতে ফেলছে:।
গণমাধ্যমের আত্মসমালোচনার আহ্বান
নীতিসংলাপে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদক ও বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান বলেন, তথ্য আর সংবাদ এক বিষয় নয়। তথ্য হচ্ছে সংবাদের কাঁচামাল। কিন্তু তথ্য থাকলেই তা সংবাদ হয়ে যায় না।
তিনি বলেন, “ভুল তথ্য সংশোধনের সুযোগ থাকলেও ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য বিকৃত করার সংস্কৃতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আমরা নিজেদের ‘গণমাধ্যম’ বলি, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে গণমানুষের কথা বলিনি। বরং এক পক্ষকে প্রমোট করেছি, আরেক পক্ষকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছি-এটাই অপতথ্যের বড় অংশ”।
মারুফ কামাল খান বলেন, “ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার উত্থান ও দীর্ঘস্থায়ীত্বে গণমাধ্যমের বড় দায় রয়েছে। গণমাধ্যম গণবিরোধী ভূমিকা রেখে ফ্যাসিবাদকে শক্তিশালী করেছে। ফ্যাসিবাদ আমাদের জাতিকে ধ্বংস করেছে— এটার দায় আমাদের স্বীকার করতেই হবে”।
তিনি আরও বলেন, “আজকের গণমাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড এবং জনরোষের ভয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এই জায়গা থেকে বের হয়ে এসে গণমাধ্যমকে আবার গণমানুষের কণ্ঠ হতে হবে”।
এআই যুগে বিভ্রান্তি আরও জটিল
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে বিভ্রান্তি আরও গভীর ও জটিল হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র নিজেই এখনো এই বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। এখান থেকে বের হতে না পারলে গণতন্ত্র ও সুশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে”।
তিনি বলেন, “গত সরকারের আমলে আমরা এক ধরনের ন্যাচারাল ট্রমার মধ্যে ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনায় কিংবা শ্রেণিকক্ষে যে কথাগুলো বলা দরকার ছিল, তা বলা যায়নি”।
গ্রহণযোগ্য মিডিয়া নীতির অভাব
ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশের (ইউএনবি) সম্পাদক মাহফুজুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশে এখনো গ্রহণযোগ্য ও সময়োপযোগী কোনো মিডিয়া পলিসি নেই। যে নীতিমালা কয়েক দশক আগেই হওয়া উচিত ছিল, আমরা এখনো তা নিয়ে আলোচনা করছি”।
তিনি বলেন, “গণমাধ্যম আজ বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অংশ। ধর্ম যেমন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, গণমাধ্যমও তেমনই বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে”।
মাহফুজুর রহমান বলেন, “আজকাল গণমাধ্যমকে চালাচ্ছে অডিয়েন্স। আগে আমরা অডিয়েন্সকে পথ দেখাতাম, এখন আমরা তাদের পেছনে ছুটছি। এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে দক্ষ ও নৈতিক সাংবাদিকতার বিকল্প নেই”।
অপতথ্য একটি কাঠামোগত সংকট
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শেখ মোহাম্মদ শফিউল ইসলাম বলেন, “মিসইনফরমেশন এখন আর শুধু যোগাযোগগত সমস্যা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সংকট”।
তিনি বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং দুর্বল মিডিয়া লিটারেসি—এই তিনটি একসঙ্গে অপতথ্যকে শক্তিশালী করছে”।
এই পরিস্থিতিতে শুধু আইন দিয়ে সমাধান সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, শক্তিশালী গণমাধ্যম চর্চা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় মিডিয়া লিটারেসির কার্যকর অন্তর্ভুক্তি। শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি তৈরি করতে পারলেই আমরা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব”।
বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের সাবেক সভাপতি ফসিহ উদ্দিন মাহতাব বলেন, “একটি মিথ্যা সংবাদ সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর হতে পারে”।
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক সরকারের আমলে সাংবাদিকরা নানা প্রতিবন্ধকতা ও চাপের মুখে কাজ করেছেন। তবে এই সরকারের আমলে তথ্যপ্রবাহের অবাধ সুবিধাকে আমরা অনেক সময় অপব্যবহার করছি”।
এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে সরকারের উদ্যোগ আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পুরস্কার প্রদান: নীতিসংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ উপদেষ্টা অধ্যাপক শাহ আলম চৌধুরী, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রধান উপদেষ্টা রাজিউর রহমান, ডিআইইউসাসের সাবেক সভাপতি মুছা মল্লিক, বর্তমান সভাপতি কালাম মুহাম্মদসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী। অনুষ্ঠান শেষে ২০২৫ সালের সেরা চারজন প্রতিবেদককে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে এম আই পাটোয়ারী বেস্ট রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।