রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:০৬ এএম
ছবি: বাসস
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি দেশজুড়ে একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত গণভোট। গণভোট সামনে রেখে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারকাজ শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনসচেতনতা তৈরিতে সরকারি সেবা সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সরকারি দপ্তরগুলোয় একই সঙ্গে গণভোটের লোগো ব্যবহার ও ব্যানার প্রদর্শন করতে হবে। ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এ অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব বিষয়ে ভোটারদের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনায় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত সব সরকারি যোগাযোগে গণভোটের লোগো ব্যবহার এবং প্রতিটি সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সামনে দুটি করে খাড়া ব্যানার প্রদর্শনের কথা বলা হয়। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সম্মতিও রয়েছে।
তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেবা সংস্থাগুলোর কেন্দ্রীয় দপ্তরগুলোতে সীমিত পরিসরে কিছু প্রচার থাকলেও জোন বা মাঠপর্যায়ে তেমন কোনো আয়োজন দৃশ্যমান নয়। মাঠপর্যায়ের প্রচার কার্যক্রম এখনও ঢিমেতালে চলছে। ফলে সাধারণ মানুষের বড় অংশের কাছে গণভোটের উদ্দেশ্য, পদ্ধতি ও গুরুত্ব অস্পষ্টই থেকে যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় গণভোটের প্রচারকাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ঢাকা ওয়াসা, রাজউক, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, গণপূর্ত অধিদপ্তর (পিডব্লিউডি) এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। এসব সংস্থার কার্যক্রমে সমন্বয়ের ঘাটতিও স্পষ্ট। কোথাও খণ্ডিত উদ্যোগ, কোথাও আবার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিÑ সব মিলিয়ে প্রচারকাজ কোনো সমন্বিত রূপ পাচ্ছে না। এতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাটি কার্যত আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সীমিত হয়ে পড়ছে।
সরেজমিন ঢাকার দুই সিটির কয়েকটি প্রধান সড়ক বাদে কোথাও প্রচারের দৃশ্যমান উপস্থিতি চোখে পড়েনি। তবে সচেতনতা বাড়াতে সংস্থাগুলোর নিজস্ব ওয়েবসাইট ও ফেসবুকেও নিরবচ্ছিন্ন প্রচার চালানো হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তাদের পক্ষ থেকে বহুমাত্রিক প্রচার চালানোর দাবি করেছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়ার্ড পর্যায়, আঞ্চলিক ও প্রধান কার্যালয়ে ড্রপডাউন ব্যানার ও গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। সড়কের মিডিয়ানে ‘হ্যাঁ ভোট’ ফেস্টুন, আইল্যান্ডে পিভিসি বিলবোর্ড, ডিজিটাল বিলবোর্ডে সরকারি বার্তা, যানবাহনের জন্য স্টিকার এবং দুই ধরনের লিফলেট তৈরি ও বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমেও গণভোট ও ‘হ্যাঁ ভোট’ সংক্রান্ত কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জহিরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন আয়োজিত গণভোটের প্রচারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের “জুলাই সনদের” চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে রাখা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে জনগণকে জানানো, যাতে তারা ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার সময় উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখতে পারেন। স্থানীয় কাউন্সিলর বা জনপ্রতিনিধি না থাকায় আঞ্চলিক ও জোন অফিসের মাধ্যমে নিজস্ব জনবল ব্যবহার করে এই প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’
একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজও দাবি করছেন, ‘গণভোটের প্রচারে কয়েক লাখ স্টিকার ও ফেস্টুন লাগানো হবে। বেশকিছু লাগানোও হয়েছে।’
রাজউকের প্রধান কার্যালয়ে গণভোট ও ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে দুটি ব্যানার দেখা গেছে। তবে সংস্থাটির জোনাল অফিসগুলোয় তেমন কোনো প্রচার চোখে পড়েনি। রাজউক সূত্রে জানানো হয়েছে, গণভোট বিষয়ে সব কর্মচারীকে পাঁচ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু জোন পর্যায়ের ভাড়া অফিসগুলোয় এ ধরনের প্রচারকাজের আয়োজন দেখা যায়নি। বিশেষ করে ভাড়া অফিসগুলোয় গণভোট ঘিরে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। এ প্রসঙ্গে রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) এবিএম এহছানুল মামুন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গণভোট সম্পর্কে সংস্থার সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে জানানো হচ্ছে। জোন অফিসগুলোয়ও এ বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। তবে জোনাল অফিসগুলো জোনাল ডিরেক্টরদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।’
গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) প্রধান কার্যালয়ে গণভোট সংক্রান্ত ব্যানার থাকলেও শাখা দপ্তরগুলোর চিত্র ভিন্ন। সরেজমিন রাজধানীর ১৫ নম্বর আবদুল গণি রোডে অবস্থিত অধিদপ্তরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে গণভোট বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান প্রচার দেখা যায়নি। নগর গণপূর্ত বিভাগ, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ ও ৪, রমনা গণপূর্ত উপবিভাগ এবং মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত উপবিভাগÑ কোনোটিতেই পোস্টার, ব্যানার বা গণবিজ্ঞপ্তি নেই। তবে মতিঝিল ও আজিমপুরে ‘হ্যাঁ ভোট’-এর পক্ষে প্রচারাভিযান দেখা গেছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান বলেন, ‘গণভোটের পক্ষে প্রচারের জন্য ঢাকাসহ সারা দেশে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী অধিদপ্তরের অধীন সব প্রতিষ্ঠানকে গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে বলা হয়েছে।’
প্রচারণা আরও গতিশীল ও সমন্বিত না হলে এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মত দিয়েছেন নাগরিক অধিকার ভিত্তিক সংগঠন সেন্টার ফর সিটিজেনস রাইটসের (সিসিআর) মুখপাত্র ইকবাল কবির। তিনি বলেন, ‘গণভোটের মতো একটি প্রক্রিয়ায় জনসম্পৃক্ততাই মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ সংস্থার প্রচার কার্যক্রম কেবল অফিসকেন্দ্রিক কর্মঘণ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে কর্মঘণ্টার বাইরে থাকা নাগরিকদের বড় অংশ এই প্রচারের বাইরে থেকে যাচ্ছে। শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির দিনে দপ্তরগুলো বন্ধ থাকায় প্রচারণা কার্যত বন্ধ থাকে।’
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি দেশে অনুষ্ঠিত হবে এই গণভোট। এতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়া হবে। ভোটাররা আলাদা ব্যালটে একটি প্রশ্নের উত্তরে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন। জুলাই সনদে রাষ্ট্রভাষা, নাগরিক পরিচয়, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, সংসদ ও বিচারব্যবস্থাসহ মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে আগামী সংসদ এসব সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে, আর ‘না’ ভোট এলে সনদ কার্যকর হবে না।