হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:৪২ পিএম
বই পড়ে দেখছেন পাঠকরা। ছবি: বাসস
স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিবছর ভাষার মাসের প্রথম দিন থেকে শুরু হওয়া প্রাণের বইমেলা এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনের পরিবর্তে ২০ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়ার দিন ধার্য আছে। বাংলা একাডেমি জানাচ্ছে, সবকিছু ঠিক থাকলে এবারের অমর একুশে বইমেলা ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। এই মেলার প্রাণ দেশের মূলধারার সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থাগুলোর বেশিরভাগই অংশ নিচ্ছে না বলে জানা গেছে। একাধিক প্রকাশনা সংস্থা ও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া গেছে এ তথ্য।
এদিকে রীতি অনুযায়ী ভাষার মাসের প্রথম দিনে ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’ শুরু না করার প্রতিবাদে গতকাল রবিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী ‘প্রতীকী বইমেলা’। বইমেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এই বইমেলার আয়োজন করে ‘একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদ’ ও ‘সৃজনশীল বই প্রকাশক সমিতি ঢাকা’। এতে অর্ধশতাধিক মূলধারার সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা অংশগ্রহণ করে। বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চ চত্বরে এই প্রতীকী বইমেলার উদ্বোধন করেন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতা দীপা দত্ত। এ সময় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ও বরেণ্য শিক্ষক-সমাজচিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
প্রতীকী বইমেলায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রকাশক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ তথা অন্তর্বর্তী সরকার অমর একুশে বইমেলার ধারাবাহিকতা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য ভঙ্গ করে ১ ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে এ বছর ২০ ফেব্রুয়ারি বইমেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যাতে দেশের হাজার হাজার লেখক, শিক্ষার্থী, পাঠক, সৃজনশীল প্রকাশক, সংস্কৃতিকর্মী চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ। যে কারণে আমরা তাদের নির্ধারিত সময়ের বইমেলায় এবার অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
মূলধারার প্রকাশনা সংস্থাগুলোর বেশিরভাগ প্রকাশকের সঙ্গে সুর মিলিয়ে প্রতীকী বইমেলায় অংশ নেওয়া সৃজনশীল প্রকাশকরা বলছেন, রমজান মাসে কোনভাবেই বইমেলা জমবে না- প্রাণবন্তও হবে না। একই সঙ্গে ধর্মীয় বাস্তবতায় রোজা, ইফতার ও তারাবির নামাজের কারণে মেলামুখী হবে না সাধারণ মানুষ। এ পরিস্থিতিতে রমজান মাসে বইমেলা আয়োজন করা হলেÑ তা প্রকাশনা শিল্প সংস্থাগুলোকে মারাত্মক ক্ষতিতে ফেলবে। কারণ বিগত দেড় বছরে দেশে বইয়ের বিক্রি ৬০ শতাংশের বেশি কমেছে। সর্বশেষ বইমেলাতেও বহু প্রকাশক তাদের বিনিয়োগ তুলতে পারেননি। অথচ বইমেলার পুরো আয়োজনের আর্থিক ঝুঁকি এককভাবে প্রকাশকরাই বহন করেন। এজন্য ঈদের পর মেলা আয়োজনের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, বাংলা একাডেমিসহ সংশ্লিষ্ট মহলে স্মারকলিপির মাধ্যমে চার দফা দাবি জানিয়েছি।
প্রকাশকদের যুক্তিÑ ফেব্রুয়ারির পরপরই রমজান ও ঈদের ছুটি শুরু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়সহ অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। ফলে শিক্ষার্থীরাÑ যারা বইমেলার অন্যতম প্রধান ক্রেতা, তারা ঢাকায় থাকবেন না। পাশাপাশি ঈদের আগে সাধারণ মানুষ পোশাক ও অন্যান্য কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকেন, বই কেনার জন্য বাজেট কমে যায়। এতে পাঠক উপস্থিতি ও বই বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। এ ছাড়া আসন্ন নির্বাচন, প্রেস ও বাইন্ডিং খাতে চাপ, কাগজের তীব্র সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে অল্প সময়ে মানসম্মত বই ছাপানো কঠিন হয়ে পড়বে।
দেশের অন্যতম জনপ্রিয় প্রকাশনা সংস্থা ‘অন্যপ্রকাশ’-এর প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সারা দিন রোজার পর ইফতার ও তারাবির নামাজের ব্যস্ততা থাকবে সাধারণ বইপ্রেমীদের। এই অবস্থায় সহজেই ধারণা করা যায়, মেলায় লোকসমাগম হবে খুবই কম। চূড়ান্ত ক্ষতির মুখোমুখি হবে দেশের প্রকাশনা শিল্প। আমরা অর্থাৎ দেশের সৃজনশীল প্রকাশকরা ইতোমধ্যে প্রকাশনা শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষা এবং একটি কার্যকর ও সফল বইমেলা আয়োজনের স্বার্থে ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-এর সময়সূচি পরিবর্তনসহ চার দফা দাবি জানিয়েছি। পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর বইমেলা আয়োজনের দাবি জানিয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। কোনো রেসপন্স পাইনি। এরপর অতিসত্বর প্রধান উপদেষ্টা বরাবর একই বিষয়ে চিঠি দেওয়া হবে।
‘অমর একুশে বইমেলা কমিটি ২০২৬’-এর সদস্য ও প্রকাশনা সংস্থা ‘আদর্শ’র প্রকাশক মাহাবুব রাহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা অবশ্যই বইমেলা করতে চাই এবং তা ঈদুল ফিতরের পরে। এ বিষয়ে আমরা সংস্কৃতি উপদেষ্টাকে স্মারকলিপি দিয়ে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে এই বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা আশা করেছিলাম। সেই সময় অতিক্রান্ত হওয়ায় আমরা ২ ফেব্রুয়ারি জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছি। সংবাদ সম্মেলনের পর আমরা প্রধান উপদেষ্টা বরাবরও স্মারকলিপি দেব।’
বাংলা একাডেমির সচিব ও ‘অমর একুশে বইমেলা-২০২৬’ পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. মো. সেলিম রেজা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বইমেলা ২০ ফেব্রুয়ারি থেকেই হবে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০০ প্রকাশনী সংস্থা ও ১৫০টা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা বইমেলায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদন করেছে। সুতরাং বইমেলা হবে; বেশিরভাগ প্রকাশনা সংস্থাই আসবে। আমরা এই সিদ্ধান্তেই অটল আছি।
যদি প্রকাশকরা অংশগ্রহণ না করে তাহলে বাংলা একাডেমি কি করবেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আশা করছি; শেষ পর্যন্ত প্রকাশকরা বইমেলায় অংশগ্রহণ করবেন। যদি না আসেন তাহলে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমরা দেখব। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অমর একুশে বইমেলার তারিখ পরিবর্তনসহ প্রকাশকদের ৪ দফা দাবি
পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর বইমেলা আয়োজনের দাবি জানিয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।
দাবিগুলো হলোÑ পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’ আয়োজন; এবারের বইমেলায় স্টল ও প্যাভিলিয়ন ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ; শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বই কেনায় সরকারি প্রণোদনা বা ভাউচার চালু; সরকারি বই ক্রয় নীতির সংস্কার করে প্রতিটি মানসম্মত বইয়ের ন্যূনতম ৩০০ কপি ক্রয়ের ব্যবস্থা করা।
প্রকাশক মেছবাহউদ্দীন আহমদ, এ কে নাসির আহমেদ, মাজহারুল ইসলাম, মনিরুল হক, সৈয়দ জাকির হোসাইন, মাহরুখ মহিউদ্দীন ও মাহাবুব রহমানের স্বাক্ষর করা স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, প্রকাশক ও সরকার পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং সহযোদ্ধা। সরকার প্রকৃত অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবেÑ এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তারা। তারপরও যদি এই সময়ে মেলা আয়োজন করা হয়, তাহলে অধিকাংশ প্রকাশকই মেলায় অংশগ্রহণ করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।