× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রূপগঞ্জে গুপ্তহত্যার ছক

প্রবা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৪ এএম

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শাসনামলে এক সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন তারিকুল ইসলাম মোঘল। ফাইল ফটো

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শাসনামলে এক সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন তারিকুল ইসলাম মোঘল। ফাইল ফটো

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে রূপগঞ্জের পরিস্থিতি শান্ত মনে হলেও সেখানে গোপনে দানা বাঁধছে ভয়ংকর গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা। একাধিক গোয়েন্দা ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রকাশ্য সহিংসতার বদলে পরিকল্পিত গুপ্তহত্যা, টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরির কৌশল বেছে নিয়েছেন রূপগঞ্জের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও যুবলীগ নেতা তারিকুল ইসলাম ওরফে মোঘল। ঢাকায় আত্মগোপনে থেকেই তিনি এই হত্যার ছক আঁকছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এজন্য তার ক্যাডারদের রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। 

সূত্রগুলো জানায়, নির্বাচন বানচালের লক্ষ্যেই মোঘল নতুন করে সক্রিয় করেছেন আওয়ামী লীগ আমলে নিজ হাতে গড়ে তোলা সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীকে। আড়াই শতাধিক প্রশিক্ষিত ক্যাডার নিয়ে গঠিত এই বাহিনী অতীতে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, জমি দখল, নারী ব্যবসা, জুয়া, ক্যাসিনো ও মাদক কারবারে সরাসরি জড়িত ছিল। বর্তমানে এই বাহিনীকে ছোট ছোট সেলে ভাগ করে ‘টার্গেটভিত্তিক অপারেশন’-এর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, গুপ্তহত্যার টার্গেট তালিকায় রয়েছেনÑ একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, মোঘলের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার বাদী, সাক্ষ্য দিতে পারেন এমন ব্যক্তি ও যারা অতীতে তার বিরোধিতা করেছেন তারা। এসব টার্গেটের বেশিরভাগকেই প্রকাশ্যে নয়, বরং নীরবে ভয় দেখানো, অনুসরণ করা ও সুযোগ বুঝে হামলার পরিকল্পনা রয়েছে। 

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর দেশে ফিরে মোঘল মাঠে নামেন। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের পলাতক শীর্ষ নেতাদের সরাসরি নির্দেশনায় তিনি নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে নির্বাচন বানচালের নীলনকশা বাস্তবায়নে সক্রিয় হন। এরপর ঢাকায় আত্মগোপনে থেকেই তিনি পলাতক নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং ঢাকার অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগিয়ে গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছেন।

গোয়েন্দা ও স্থানীয় একাধিক সূত্র বলছে, ঢাকার মিরপুরে দোকানে ঢুকে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় মোঘলের যোগসাজশ রয়েছে। শুধু যোগসাজশ নয়; হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও অর্থের জোগানদাতা হিসেবেও তার নাম উঠে এসেছে। একইভাবে জুলাই যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যায় অভিযুক্ত মিরপুরের কাউন্সিলর বাপ্পীর সঙ্গে মোঘলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাপ্পী ও মোঘল দুজনেই একসময় যুবলীগের ক্যাডার ছিলেন। তারা রূপগঞ্জ ও মিরপুরের অপরাধ জগৎ যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এ ধরনের গুপ্তহত্যার ক্ষেত্রে সরাসরি মাঠে নামার বদলে অর্থ, নির্দেশনা ও টার্গেট তালিকা সরবরাহ করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। এতে মূল পরিকল্পনাকারী আড়ালে থেকেই পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন ভাড়াটে খুনি বা ক্যাডারদের মাধ্যমে। এই মডেলটিই বর্তমানে অনুসরণ করা হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়দের মতে, এই অপরাধী নেটওয়ার্ক পুনরায় সক্রিয় হওয়ায় মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে নির্বাচনী পরিবেশ। প্রকাশ্য সংঘর্ষ না হলেও একের পর এক গুপ্তহত্যার মাধ্যমে এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হলে ভোটকেন্দ্র ফাঁকা হয়ে যেতে পারে। যা নির্বাচন বানচালের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

জানা গেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিদেশে পালিয়ে গেলেও মোঘল সম্প্রতি রূপগঞ্জে ফিরে আসেন। পরে পলাতক নেতাদের পরামর্শে ঢাকায় আত্মগোপনে যান। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে থেকেই তিনি তার বাহিনীকে গুপ্তহত্যা ও নাশকতার নির্দেশ দিচ্ছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মিছিল-মিটিংকে কেন্দ্র করে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা ঘটিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার ছকও তার রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। বোমা হামলাসহ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের জন্য এরই মধ্যে ক্যাডারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী মোঘলের ব্যবসায়িক লেনদেন ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব থেকে সৃষ্ট একাধিক মামলার বাদীও বর্তমানে চরম আতঙ্কে রয়েছেন। তারা এখন অনেকটাই ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন।

কাঞ্চন ও রূপগঞ্জ এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, মোঘলের নাম উচ্চারণ করলেই সাধারণ মানুষ ভয়ে চুপ হয়ে যায়। এ কারণে মোঘল নানা ধরনের অপরাধ করলেও তার বিরুদ্ধে কথা বলার লোক পাওয়া যাবে না। এত অভিযোগ ও গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও তাকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। নির্বাচনের আগেই এই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তারা। স্থানীয়রা বলছেন, মোঘলকে যদি আইনের আওতায় না আনা হয়, তবে রূপগঞ্জে গুপ্তহত্যার মাধ্যমে বড় ধরনের অঘটন ঘটার আশঙ্কা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

স্থানীয় সূত্র মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলের শীর্ষ নেতারা পালিয়ে যান। ঠিক সেই সময় দেশে ফিরে এসে মোঘল বিএনপির একাংশের সঙ্গে আঁতাত করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করেছেন। ওই নেতাকর্মী দিয়েই এখন নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছেন। 

স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, একসময় ভূমিদস্যু, সন্ত্রাসী ও পাঁড় জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত মোঘলের রয়েছে একাধিক দেশে গোল্ডেন ও দীর্ঘমেয়াদি ভিসা। দুবাইতে তার রয়েছে ১০ বছরের গোল্ডেন ভিসা ও থাইল্যান্ডে ২০ বছরের মাল্টিপল ভিসা। বিপদ আঁচ করলেই চোখের পলকে দেশ ছাড়ার সক্ষমতা রয়েছে তার। অর্থ পাচারের পাশাপাশি তিনি নিয়মিত ক্যাসিনো খেলতে যান দুবাই, নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কায়। একটি সূত্র জানিয়েছে, গত দেড় বছরে এসব দেশে ক্যাসিনো খেলে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হারিয়েছেন তিনি। ওই অর্থ রূপগঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জোর-জুলুম, জমি দখল, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে আদায় করা হয়েছে। 

সূত্র বলছে, বিদেশে গেলে মোঘলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে দেয় স্থানীয় মাফিয়ারা। পাঁচ তারকা হোটেলে থাকা-খাওয়া, বিলাসী জীবন ও দেশি-বিদেশি নারীর সরবরাহÑ সবই নাকি তার ‘প্যাকেজ’। তার পছন্দের তালিকায় নেপালি ও আরব নারীরা থাকেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুবাইতে পলাতক একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গেও তার নিয়মিত বৈঠক হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার বড় বড় ক্যাসিনোতে মোঘলের রয়েছে বিশেষ সমাদর। মিরপুরের কুখ্যাত জুয়াড়ি মনির ওরফে আমেরিকান মনির ও সোহেল খান তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। মাঝেমধ্যে বিদেশে যেতে না পারলে দেশে বসেই ভার্চুয়ালি শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়ার ক্যাসিনো কোর্টে খেলেন তিনি। প্রতিবার বিদেশ যাওয়ার আগে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা হুন্ডিতে পাঠানো হয় কামরুল নামের এক হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে। পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা এসবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত দেড় বছরে মোঘল অন্তত ১৭ বার দেশের বাইরে গেছেন। তার নামে দুটি পাসপোর্ট রয়েছে। ইমিগ্রেশন পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৭-২০১৯ সালে তিনি শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, দুবাই ও থাইল্যান্ডে ৫০ বারের বেশি যাতায়াত করেছেন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা