হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:০৫ পিএম
আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৪০ পিএম
জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে ছবি দেখছেন ব্যারিস্টার সার হোসেন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
নদী-নারী ও গ্রামবাংলা, বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত আমানুল হকের সংগ্রামী ক্যামেরার কাজ এবং সত্যজিৎ রায় প্রসঙ্গÑ এই তিন বিষয় নিয়ে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে চলছে ১৩তম আন্তর্জাতিক ছবি মেলা। গতকাল বিকালে গ্যালারিতে প্রবেশ করতে কিছুটা বেগ পেতে হলো। কেননা হল ভর্তি দর্শনার্থী! পরক্ষণে বুঝতে পারি, ভূমিপুত্র আমানুল হককে নিয়ে রয়েছে ‘ফিরে দেখা আমানুল’ শীর্ষক অনুষ্ঠান।
গ্যালারির দেয়ালে ঝুলছে নদী-বিল-বাওরের অপরূপ সব ছবি। এসব ছবির গল্পের সঙ্গে বয়স্করা নিজেদের ফেলা আসা অতীতকে খুঁজছেন, আর অল্পবয়সীরা হচ্ছে কৌতূহলী। কী ছবিরে বাবা! বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। তার মধ্যে ছোট্ট একটা ডিঙিতে বয়ে যাচ্ছেন একজন পুরুষ। নৌকার ওপর বসে তিনজন নারী। ওই নারীদের মুখচিত্রে ফুটে উঠেছে চিন্তা-ক্লিষ্টের ছাপ। নৌকার ওপর কাঁথা গায়ে শুয়ে আছে অসুস্থ আরেক শিশু। আরও ভুখা নাঙা তিন শিশু। একদিকে সতেজ আমন ধান। অন্যদিকে পুষ্টিহীনতায় ভোগা মানুষের প্রতিচ্ছবি। এ রকম কত ছবি যে গ্যালারির দেয়ালে ঝুলছে! কোনটা রেখে কোনটার কথা আলাদা করে বলার অবকাশও নেই। প্রতিটি ছবির বিশেষ সৌন্দর্য যেমন রয়েছে, তেমনি ঐতিহাসিক গুরুত্বও বহন করে।
এর মধ্যে উপস্থিত হলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি মুফিদুল হক, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, নাসির আলী মামুনসহ আমানুল হকের ছোট বোন ড. আয়শা বেগম এবং আলোকচিত্রীর শুভাকাঙ্ক্ষীরা। আলোচনা অনুষ্ঠানে নাসির আলী মামুন বলেন, আমরা আমানুল হককে দেখছি। বারবার দেখছি। ফিরে ফিরে দেখছি। বাংলাদেশকে দেখতে হলে আমানুল হকের কাছে ফিরে যেতে হয়। তিনি আরও বলেন, আমানুল হক ছবির ইশারা ধরতে পারতেন। আর যারা ছবির ইশারা ধরতে পারেন, তারাই ছবিকে মহামূলবান করে তুলতে পারেন। এই দক্ষতা আমানুল হকের ছিল; যা খুব কম আলোকচিত্রীর রয়েছে।
আলোচনার শুরুতে মুফিদুল হক বলেন, আমানুল হক দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরেছেন ক্যামেরায়। খুব সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ক্যামেরায় তুলে ধরেছেন তিনি। যে ছবিগুলো দেখে বোঝা যায় সাম্যবাদী চিন্তার প্রতি তার একটা আকর্ষণ ছিল। তথ্য সন্ধান ও সংগ্রহের দিক দিয়ে আমাদের অনেক দুর্বলতা রয়েছে। আমানুল হককে অনেকভাবে দেখার আছে, বলার আছে। অনেকভাবে ভাবার আছে। যিনি রিয়েলিজমের সঙ্গে কল্পনার রঙ মিশিয়ে ছবিকে তুলে ধরেছেন অনন্য উচ্চতায়; যা আমরা কখনও ছুঁতে পারব না, ধরতে পারব না এমনকি ধরার ক্ষমতাও নেই আমাদের। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনসহ এসব কাজের জন্য আমানুল হকের কাছে আমরা সারা জীবনের জন্য ঋণী। ভবিষ্যতে তার কাজ নানাভাবে সংরক্ষিত হবে; যা মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে।
আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, আমি ছবি তুলতাম, আমানলু হক ছবি নির্মাণ করতেন। আমাদের দুজনের এক জায়গায় অভিন্ন মিল ছিল, দেশের রাজনৈতিক সংকটকালে দেখা যেত দুজনেই এক কাতারে দাঁড়িয়ে গিয়েছি। পেছনের দেয়ালে ঝুলতে থাকা একটা ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের এই ছবির সঙ্গে রশীদ তালুকদারের একটা ছবির কিছু মিল আছে। আসলে আলোকচিত্রীরা ছবির গন্ধ যেখানে পান, সেখানেই ছুটে যান।
আমানুল হকের ছোট বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আয়শা বেগম বলেন, জয়নুল আবেদিনের ছবিতে দুর্ভিক্ষ যেমন কমনীয়ভাবে দেখানো হয়নি, তেমনি আমানুল হকও তার দুর্ভিক্ষের ছবিতে কল্পনার রঙ মেশাননি। সময়কালকে ধারণ করেছেন। তিনি কখনও কাউকে অনুকরণ করে নয়, ছবি তুলতেন নিজের শিল্পচেতনা থেকে। আমানুল যাদের ছবি তুলতেন, তারা তাকে খুব আপন মনে করতেন। তিনিও মিশে যেতেন তাদের অন্তরে। কৃষক, শ্রমিক, মাঝি সবাই তার আপন মানুষ। অনাথ মাঝিকে তিনি অনাথবন্ধু বলে ডাকতেন।
অনুষ্ঠান শেষে গ্যালারিতে দেখা হয় ব্যারিস্টার সারা হোসেনের সঙ্গে। আবেগে আপ্লুত এই আইনজীবী বলেন, আয়োজনটা শুধু সুন্দর নয়, তুলনাহীন। সত্যি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য উঠে এসেছে এই ছবিগুলোয়। উনি যেভাবে বাংলাদেশকে দেখেছেন, সেই বাংলাদেশকে রক্ষা করাই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে এই প্রদর্শনীতে রায়েরবাজারের ছবি দেখলাম, যা আমার কাছে অন্যরকম এক অনুভূতি। আবার ওই যে নৌকাবাইচের যে দৃশ্য, ওইটা গ্রামীণ পরিবেশের বেড়ে ওঠা মানুষের কাছে অন্যরকম একটা দ্যোতনার সৃষ্টি করে। এখানে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য ভিন্ন টেস্ট রয়েছে। আবার সত্যজিৎ রায়ের ছবি ও চিঠি। আমি মনে করি, এই প্রদর্শনীতে প্রত্যেকের আসা উচিত। তাকে নিয়ে আরও কাজ করা উচিত।
১৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী শেষ হবে আজ শনিবার। আয়োজনে ছিল দৃক ও পাঠশালা।