× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

‘মিথ্যা মামলা’র লাগাম টানা যাচ্ছে না

মাসুদুল হাসান

প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৬ এএম

বিভিন্ন সংগঠন ও আইন সংশ্লিষ্টরা নানা সময়ে মিথ্যা মামলার বিষয়ে প্রতিবাদ করেও এসব প্রতিহিংসা ও হয়রানির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না।

বিভিন্ন সংগঠন ও আইন সংশ্লিষ্টরা নানা সময়ে মিথ্যা মামলার বিষয়ে প্রতিবাদ করেও এসব প্রতিহিংসা ও হয়রানির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না।

হয়রানিমূলক মামলা এক আতঙ্কের নাম। অভিযোগের বস্তুনিষ্ঠতা না থাকা সত্ত্বেও রাজধানীসহ সারা দেশে প্রচুর হয়রানিমূলক মামলা হয়েছে। মূলত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হয়রানিমূলক মামলা করা হয়। প্রায় সব মামলার উদ্দেশ্য থাকে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা। নারীঘটিত মিথ্যা মামলার সংখ্যাও বেড়েছে দেদার। অপ্রয়োজনীয় মামলার আতিশয্যে আদালতপাড়ায় বিচারপ্রার্থীরা বছরের পর বছর হয়রানির শিকার হচ্ছেন। 

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ৮০ বছরের মাজেদা বেগম পুত্রবধূর দেওয়া নারী নির্যাতন যৌতুকের মামলায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই প্রতিবেদককে মাজেদা জানান, তার মালয়েশিয়া প্রবাসী ছেলে বাবুল মিয়া, ঢাকায় বসবাসরত মেয়ে দুই মেয়ে ও তার নাতিন (আগের স্ত্রীর মেয়ে) সবার বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করেছে তার ছেলের দ্বিতীয় স্ত্রী। অথচ এ ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। 

জনপ্রিয় অভিনেতা ইরেশ জাকের জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার পরেও তার বিরুদ্ধে ওই সময়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হত্যা মামলা দায়ের করে একটি পক্ষ, যে ঘটনার সঙ্গে তার ন্যূনতম সম্পৃক্ততা নেই বলে খোদ সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা গণমাধ্যমে এ তথ্য দেন। ব্যক্তিগত স্বার্থে এসব মামলা করা হচ্ছে বলে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমকে জানান। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন দেওয়া হলেও পরিস্থিতি খুব একটা উন্নত হয়নি। 

ফেনীর প্রবাসী নজরুল ইসলাম হাজারী জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলার আসামি নন, ভুলবশত তাকে র‍্যাব গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের। বাবার নামের সঙ্গে আংশিক মিল থাকায় প্রকৃত আসামি যুবলীগ নেতা নুরুল হুদা ওরফে রিয়াদের পরিবর্তে প্রবাসী নজরুলকে আসামি বানানো হয়েছে বলে স্বজনদের দাবি। উচ্চ আদালত জামিন দিলেও রাষ্ট্রপক্ষের বিরোধিতায় তিনি এখনও মুক্তি পাননি।

বাংলাদেশে পুলিশের দেওয়া হিসাবমতে, ২০১৭ সালে দেশব্যাপী ১৫ হাজারের কিছু বেশি নারী নির্যাতনের মামলা হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় চার হাজার মামলার ক্ষেত্রে পুলিশ তদন্তে ঘটনার কোনো প্রমাণ পায়নি বলে মামলা বিচার পর্যন্ত গড়ায়নি। একই বছর প্রায় সাড়ে আট হাজার নারী নির্যাতনের মামলার রায় হয়েছে। মাত্র সাড়ে ৫২৭টি মামলায় অভিযুক্তের সাজা হয়েছে। আর বাদবাকি সবগুলোতে অভিযুক্ত খালাস পেয়েছেন। 

বরগুনার আমতলীতে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার মামলা করে উল্টো জেল খেটেছেন আব্দুর রশিদ (৫৫) নামে এক ব্যক্তি। ২০২০ সালে আব্দুর রশিদ একই গ্রামের ক্বারি আব্দুর রাজ্জাক, সিদ্দিকুর রহমান ও আব্দুল হককে আসামি করে আমতলীর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন। তদন্তের সময় মামলার বাদী ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করতে পারেননি। ২০২২ সালের ২৭ নভেম্বর বিচারক ওই মামলা খারিজ করে বাদী আব্দুর রশিদকে আদালতে শোকজ করেন। পরে গত ৫ ডিসেম্বর তাকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন বিচারক।

ফেনীতে ২০২২ সালের ২৩ মে নাজমা আক্তার ভাসুর আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার অভিযোগ এনে মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। পিবিআইয়ের তদন্তে নাজমা আক্তারের স্বামী শহীদুল্লাহর সঙ্গেই শিশুটির ডিএনএ মিল পাওয়া যায়। এতে ট্রাইব্যুনাল মামলা থেকে ভাসুর আবদুর রহমানকে অব্যাহতি দেন এবং নাজমা আক্তার ও তার স্বামী শহীদুল্লাহকে ট্রাইব্যুনালের বিচারক এএনএম মোরশেদ খান ৩ বছর ৬ মাস করে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।

বিএনপির দপ্তর সূত্রে জানা যায়, শেখ হাসিনার শাসনামলের ১৫ বছরে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮২৫টির বেশি মামলা হয়। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৫০ লাখ ৩২ হাজার ৬৫৫ জনের বেশি। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের ১০টি বিভাগে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৬৪৫টির বেশি মামলা দায়ের করা হয়, যার বড় অংশই মিথ্যা ও হয়রানিমূলক। 

২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সংসদের এক প্রশ্নোত্তর পর্ব থেকে জানা যায়, বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সাল এবং ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের দিন পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৮ হাজার ১০৫টি মামলা হয়েছে। এর বৃহৎ অংশই মিথ্যা ও হয়রানিমূলক বলে দলটির নেতাকর্মীরা দাবি করেন।

জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে ৫০০ মামলা দেওয়া হয়। এসব মামলা বিশ্লেষণ করে সত্যতা ও ন্যূনতম সম্পৃক্ততা মেলেনি।

 এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, হয়রানিমূলক মামলা বিষয়ে সেক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসন এবং আইনি প্রশাসন সক্রিয় করতে হবে, দৃশ্যমান শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যদিও আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধি এবং অন্য অনেক আইনে মিথ্যা মামলার সাজার কথা বলা আছে। কিন্তু সেগুলো প্রকৃতপক্ষে কার্যকর করা হয় না। 

সিনিয়র আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, এগুলো বহুদিন ধরে হয়ে আসছে। রাজনৈতিক কারণেও এসব হয়রানিমূলক মামলা হয়। আমরা আশা করেছিলাম ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর এসব থেকে আমরা মুক্ত হব। কিন্তু গত ১৭ মাসে শত শত নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয়েছে এবং রাজনৈতিকভাবেও সম্পৃক্ত করার জন্য হয়রানি করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে আশি শতাংশ মামলা এফআইআরে নাম দেওয়া হয়েছে তারা ঘটনার সঙ্গে মোটেও সম্পৃক্ত নয়। 

আইনজীবীদের মতে দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা মামলার সাজা হলো— দুই বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম ও বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় ধরনের দণ্ড। যদি মিথ্যা মামলা কোনো মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সাত বছর বা তার বেশি মেয়াদের কোনো দণ্ডনীয় অপরাধ সম্পর্কে দায়ের করা হয়, তাহলে মিথ্যা মামলার বাদী সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়দের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। এর সঙ্গে অর্থদণ্ডেরও বিধান আছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৭ (১) ধারায় বলা হয়েছে, এ মামলায় বাদী অনধিক সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ডে এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, দলবেঁধে মামলা দেওয়ার রেওয়াজ অতীতেও ছিল, এখনও আছে। মামলা নেয় পুলিশ। পুলিশের মামলা গ্রহণ করা না করার পূর্ণ ক্ষমতা আছে। অথবা ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশকে মামলা গ্রহণের আদেশ দেবেন। মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা এখন বিষয়টা পুলিশ এবং বাদীর বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে গেছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের অধীনস্তদের সাবধান করে দেওয়া উচিত ছিল যে প্রমাণ ছাড়া কোনো মামলা না নেওয়ার জন্য। অতীতেও এ বিষয়ে তেমন কোনো শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। 

বিভিন্ন সংগঠন ও আইন সংশ্লিষ্টরা নানা সময়ে এর প্রতিবাদ করেও এসব প্রতিহিংসা ও হয়রানির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। আইন আদালতকে প্রভাবিত করে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা করার প্রবণতা বাড়ছে। বাঙালি সংস্কৃতিতে মামলা দিয়ে হয়রানি করা একটা নিত্যকার অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা