× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অমর একুশে বইমেলা

অনিশ্চয়তা আবারও

হাসনাত শাহীন

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২১ এএম

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:২৯ পিএম

প্রকাশকরা এবার রোজার মাসে মেলা করতে চাচ্ছে না। কারণ পাঠকরা মূলত মেলায় ঘোরাঘুরি করে সন্ধ্যা থেকে মেলা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত বই কেনেন। কিন্তু এই সময় ইফতার এবং তারাবির সময়। ধর্মীয় বাস্তবতায় এই সময়ে সাধারণ মানুষ বই কিনতে আসবেন না বলে জানান তারা। ছবি: বাসস

প্রকাশকরা এবার রোজার মাসে মেলা করতে চাচ্ছে না। কারণ পাঠকরা মূলত মেলায় ঘোরাঘুরি করে সন্ধ্যা থেকে মেলা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত বই কেনেন। কিন্তু এই সময় ইফতার এবং তারাবির সময়। ধর্মীয় বাস্তবতায় এই সময়ে সাধারণ মানুষ বই কিনতে আসবেন না বলে জানান তারা। ছবি: বাসস

‘অমর একুশে বইমেলা’ রীতি অনুযায়ী ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে শুরু হয়। কিন্তু এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে আইনশৃঙ্খলাসহ সার্বিক দিক বিবেচনায় সেই ধারাবাহিকায় ছেদ তো পড়েছেই; সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানান জটিলতা।
‘সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির সময়সূচি নিয়ে বারবার অবস্থান পরিবর্তন, সিদ্ধান্তহীনতা এবং প্রকাশকদের একাংশের কঠোর অবস্থানের কারণে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী দেশের সবচেয়ে বড় এই সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজন নিয়ে আবারও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। 

প্রথমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে আইনশৃঙ্খলাসহ সার্বিক দিক বিবেচনায় বইমেলার আয়েজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি ১৭ ডিসেম্বর থেকে ১৭ জানুয়ারি বইমেলা আয়োজনের সময় নির্ধারণ করলে লেখক-প্রকাশক-পাঠক থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। ফলে মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি; প্রকাশক ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। শেষ পর্যন্ত তিন দফা তারিখ পরিবর্তনের পর আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত বইমেলা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। এ লক্ষ্যে গত ১৮ জানুয়ারি থেকে মেলায় স্টল বরাদ্দের আবেদন গ্রহণসহ অন্যান্য কাজও শুরু করেছে তারা; যা চলবে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত।

এ পর্যায়ে মেলার প্রাণ বইয়ের প্রকাশকদের দুটি সংগঠন বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (বাপুস) সদস্যভুক্ত অধিকাংশ প্রকাশকরা রমজানে মেলার বিষয়ে আপত্তি তুলেছে। এরই মধ্যে দেড় শতাধিক প্রকাশকের স্বাক্ষরসহ সৃজনশীল প্রকাশ সমিতি সংস্কৃতি উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি দিয়ে মেলা পিছিয়ে রমজানের ঈদের পর করার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে একই দাবিতে আগামীকাল রবিবার রমজান মাসে মেলা না করার অনুরোধ জানিয়ে বাংলা একাডেমিকে ‘বাপুস’ চিঠি দেবে বলে জানিয়েছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রকাশক।

সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির একাধিক শীর্ষ নেতা জানান, রমজানের কারণে মেলায় উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ফলে স্টল ভাড়া, নির্মাণ বায়, কর্মচারীর বেতন, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের তুলনায় বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় নগণ্য। বাস্তব অর্থে এই সময়ে মেলায় অংশ নেওয়া মানেই প্রকাশকদের জন্য নিশ্চিত আর্থিক ক্ষতি।

তারা আরও বলেন, করোনাকালীন দীর্ঘ স্থবিরতার পর প্রকাশনা শিল্প এখনও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। একের পর এক বইমেলায় লোকসান, পাঠকসংখ্যা হ্রাস, কাগজ ও মুদ্রণ ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিÑ সব মিলিয়ে প্রকাশকরা আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে। এই অবস্থায় রমজানকেন্দ্রিক সময়সূচিতে অমর একুশে বইমেলা আয়োজন করা প্রকাশনা শিল্পকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দেওয়ার শামিল। 

অন্যদিকে ৯০ শতাংশ প্রকাশকের সংগঠন বাপুসের সদস্যরাও মেলার সময় নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। গত বৃহস্পতিবার সাংগঠনিক বৈঠকে শতভাগ প্রকাশকই এই সময়ে মেলা আয়োজন না করার দাবি তুলেছেন। বৈঠক সূত্র জানায়, সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে কমিটির নেতারা মেলায় পিছিয়ে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়েছেন। তারপরও যদি এই সময়ে মেলা আয়োজন করা হয় তাহলে অধিকাংশ প্রকাশকই মেলায় অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

একাধিক ছোট-বড় প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই প্রকাশনা ব্যবসায় চরম মন্দা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ থেকে শিক্ষিত সমাজÑ সব মহলই দিন দিন বইবিমুখ হচ্ছেন। এর ওপরে মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা হয়ে এসে ‘করোনা’কাল প্রকাশনা ব্যবসায় প্রায় অচল করে দিয়েছে। এ অবস্থায় প্রকাশনা শিল্প যদি এবারও ধাক্কা খায় তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠান একেবারেই হারিয়ে যাবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকেই বলেন, বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো সারা বছরই টুকটাক ব্যবসা করলেও ছোট প্রকাশকদের মূল ব্যবসা বইমেলাকে কেন্দ্র করে। মেলাকে কেন্দ্র করে লেখকদের সঙ্গে সমঝোতা করে অনেকেই বই প্রকাশ করেন, মেলার সময় কিছুটা হলেও ব্যবসা করে, যা দিয়ে তাদের সারা বছরই চলতে হয়। 

রমজানে বইমেলায় অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অনেক প্রকাশক। তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, মেলার সিঙ্গেল রুমের স্টল নিলে কোনো রকমভাবে অংশগ্রহণ করলেও লাখ টাকা খরচ আছে। কিন্তু এত টাকার বই বিক্রি কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। 

বাপুসের সহ-সভাপতি ও পুঁথিনিলয় প্রকাশনীর কর্ণধার শ্যামল পাল এবং বাপুসের পরিচালক ও মেলা কমিটির আহ্বায়ক (কনভেনার) আবুল বাশার ফিরোজ শেখ ‘প্রতিদেনর বাংলাদেশ’কে জানান, আমাদের প্রকাশকরা এবার রোজার মাসে মেলা করতে চাচ্ছে না। কারণ প্রতিবছর মেলা ৩টার দিকে (এবার ২টা থেকে শুরু হবে) শুরু হলেও পাঠকরা মেলায় ঘোরাঘুরি করে সন্ধ্যা থেকে মেলা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত মূলত বই কেনেন। কিন্তু এই সময় ইফতার এবং তারাবির সময়। ধর্মীয় বাস্তবতায় এই সময়ে সাধারণ মানুষ বই কিনতে আসবেন না। তাই আমরা (প্রকাশকরা) ঈদের পর মেলা আয়োজনের দাবি জানাচ্ছি। 

সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও রিদম প্রকাশনীর কর্ণধার গফুর হোসেন বলেন, প্রকাশকদের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা বলছে, রমজানে বইমেলা আয়োজন মানেই নিশ্চিত লোকসান। এই প্রেক্ষাপটে সৃজনশীল প্রকাশকদের একমাত্র দাবিÑ অমর একুশে বইমেলা অবশ্যই ঈদের পর আয়োজন করতে হবে। 

অপরদিকে ‘বৈষম্যবিরোধী সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি’ মেলায় অংশ নেওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে স্টল ভাড়া অর্ধেক করা, আগের সরকারের সুবিধাভোগী বা ফ্যাসিবাদী প্রকাশকদের স্টল না দেওয়া এবং প্যাভিলিয়ন সংস্কৃতি বাতিল করা। সংগঠনটির নেতাদের অভিযোগ, গত বছর স্টল ভাড়া কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এবারও দাবি মানা না হলে তারা মেলায় অংশ নেবেন না।

তবে এর মাঝেও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম জানিয়েছেন, আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি বইমেলা অবশ্যই অনুষ্ঠিত হবে। সে লক্ষ্যে এরই মধ্যে প্রস্তুতিমূলক কাজও শুরু হয়েছে। প্রকাশকরা অংশগ্রহণ না করলেও একাডেমি নিজ উদ্যোগেই মেলার আয়োজন করবে। তার ভাষায়, অন্য কোনো বিকল্প নেই, বইমেলা করতেই হবে।

প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালে চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণের বটতলায় ৩২টি বই নিয়ে প্রথম বইমেলার সূচনা করেন, যা কালপরিক্রমায় অমর একুশে বইমেলা হিসেবে রূপ নেয়। এরপর ১৯৮৩ সালে এরশাদের সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কারণে একবার বইমেলা বন্ধ হওয়া ছাড়া বইমেলা বন্ধের আর কোনো নজির নেই। এর আগে নির্বাচনের মধ্যেই বইমেলা যথাসময়ে হয়েছে। তবে ২০২১ সালের করোনা মহামারির সময়ে বইমেলা হয়েছে পহেলা ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে ১৭ মার্চ ও ২০২২ সালে ১৫ মার্চ থেকে শুরু হয়েছিল।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা