আবু কাওসার
প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:১৯ এএম
আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:২২ এএম
অনিশ্চয়তা-সংশয়ের মধ্যে অবশেষে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সুখবর এসেছে।
অনিশ্চয়তা-সংশয়ের মধ্যে অবশেষে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সুখবর এলো। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত পে-কমিশন আজ বুধবার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন-ভাতার (পে-স্কেল) সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে। আজ বিকাল ৫টায় কমিশনপ্রধান সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে কমিশনের সকল সদস্য রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেবেন। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদও এ সময় উপস্থিত থাকবেন।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করে গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘কমিশন তাদের রিপোর্ট চূড়ান্ত করেছে। আজ প্রধান উপদেষ্টার কাছে এটি জমা দেওয়া হবে।’ তবে পে-কমিশনের প্রতিবেদন জমা হওয়ার আগ পর্যন্ত অর্থ উপদেষ্টা এর সুপারিশের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেছেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীরা পে-স্কেল পেয়ে খুশি হবেন। এমন সুপারিশই প্রতিবেদনে থাকবে।’
এর আগে অর্থ উপদেষ্টা আভাস দিয়ে আসছিলেন যে, নতুন বেতন কাঠামো এই সরকারের আমলে হচ্ছে না। আর্থিক সংকট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় পে-স্কেল ঘোষণার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছিল সরকার। বলা হয়েছিল, নির্বাচন-পরবর্তী সরকার এটি কার্যকর করবে। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের আন্দোলন ও আমলাদের চাপে শেষ সময়ে আগের সিদ্ধান্ত পালটিয়ে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিক কার্যকরের সুপারিশ করেছে সরকার। এর আগে সিদ্ধান্ত ছিল পে-কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে অর্থ উপদেষ্টার কাছে। অর্থ উপদেষ্টা পরে তা উপস্থাপন করবেন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে। কিন্তু নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিবেদন এখন সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় জমা দেবেন কমিশনের সদস্যরা।
গত বছরের ২৭ জুলাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো নির্ধারণের জন্য বেতন কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশনের প্রধান সাবেক অর্থসচিব ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান। ২১ সদস্যের এ কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখন ২০১৫ সালের বেতনকাঠামো অনুসারে বেতন-ভাতা পান।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা, নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী, এটা দ্বিগুণের বেশি বাড়তে পারে। বর্তমানে সর্বোচ্চ ধাপে নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা। নতুন পে-স্কেলে এটা বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি প্রস্তাব করা হচ্ছে। এ ছাড়া সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৮ করার সুপারিশ রয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডের একজন কর্মচারীর বেতন ধরা হলে সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন হবে তার আটগুণ, যা বর্তমানে আছে ১০ গুণ বা ১:১০। প্রস্তাবিত পে-স্কেলে নিচের দিকে বেতন-ভাতা বেশি বাড়ানোরও সুপারিশ করা হয়েছে।
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেতন গ্রেড আছে ২০টি। এটি কমিয়ে ১৫-১৬টি ধাপ করা হতে পারে। কমিশন সূত্র জানায়, বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রধানত চারটি বিষয়কে বিবেচনায় আনা হয়। এগুলো হলোÑ ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, পরিবারের সদস্য সংখ্যা, আবাসন ও শিক্ষা ব্যয় ইত্যাদি।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আংশিক পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এই ব্যয় নির্বাহের জন্য ইতোমধ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের পেছনে বেতন-ভাতা বাবদ খরচ হয় বছরে ৮৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেট প্রণয়নে সম্পৃক্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে গেলে বাড়তি ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা লাগবে। দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে পে-কমিশন ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিক বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। এটি পুরো মাত্রায় কার্যকর হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে।
উল্লেখ্য, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। পরে তা ২ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয় ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। গত ২৪ ডিসেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই সংশোধিত বাজেট অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে বেতন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। নতুন পে-স্কেল যাতে আংশিক বাস্তবায়ন করা যায়, সেজন্য সংশোধিত বাজেটে এ খাতে আরও ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে বেতন-ভাতা খাতে মোট বরাদ্দ বাড়ল ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা।
প্রসঙ্গত, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ ২০১৫ সালে পে-কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এর দশ বছর পর নতুন করে এই কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকা। দেশের প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি এখন ২০১৫ সালের পে-স্কেল অনুসারে বেতন-ভাতা পান। এর বাইরে আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষক আছেন প্রায় সাত লাখ। যারা সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন পান। মূল বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত বাবদ আলাদা ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পান সরকারি চাকরিজীবীরা। এছাড়া বছরে দুটি উৎসব ভাতার পাশাপাশি বাংলা নববর্ষে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়তি একটি ভাতা পান তারা। বেতন-ভাতার বাইরে সরকারি চাকরিজীবীরা অবসর ভাতা পান। এ খাতে সরকারের বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে আসার পর থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের মহার্ঘ ভাতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার জন্য একটি কমিটি কাজ শুরু করে। এ নিয়ে বিরূপ সমালোচনা শুরু হলে সরকার পরে পিছিয়ে যায়। পরে চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা বলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, যা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, নতুন বেতন পে-স্কেল কার্যকর হলে এই বিশেষ সুবিধা বেতনের সঙ্গে সমন্বয় হবে।