× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তাপমাত্রার ব্যবধান কমছেই, জীববৈচিত্র্যে বিপর্যয়ের শঙ্কা

ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৫৩ পিএম

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখন শীতের আমেজ। মাঠে গরু নিয়ে গেছেন এক কৃষক। ছবি: বিবিসি বাংলা

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখন শীতের আমেজ। মাঠে গরু নিয়ে গেছেন এক কৃষক। ছবি: বিবিসি বাংলা

বিদায়ী বছরের ২৭ ও ২৮ ডিসেম্বর দেশের বিভিন্ন বিভাগে দিন ও রাতের (সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন) তাপমাত্রার পার্থক্য হঠাৎ করেই বড় ধরনের ব্যবধান সৃষ্টি করে। একদিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা কমে যায় ৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরের দিন ২৯ ডিসেম্বর ব্যবধান আরও কমে ১.৭ ডিগ্রিতে চলে আসে। এসবের মূল কারণ ছিল কুয়াশা, ছিল না কোন শৈত্যপ্রবাহ। কুয়াশায় পড়ে তীব্র শীত অনূভূত হয়। এই পরিবর্তন গত ৭২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যবধান সৃষ্টি করে। আবহাওয়াবিদরা বিশ্লষণ করে দেখেছেন, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৯৫৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হিসেব করলে ১৯৯৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২৭ বছরের মধ্যে ৮ বছরে ১২ বার এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর ঢাকায় সর্বোচ্চ অর্থাৎ দিনের তাপমাত্রা ছিল ২৩ ও সর্বনিম্ন অর্থাৎ রাতের ১৩.৫ ডিগ্রি। এখানে দুটিতে পার্থক্য ছিল ৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেই তাপমাত্রা একদিনের ব্যবধানে সর্বোচ্চতে ৫.১ ডিগ্রি কমে যায়। ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় সর্বোচ্চ ছিল ১৬ ও সর্বনিম্ন ১৩.৫ ডিগ্রি ও দুটিতে পার্থক্য ছিল ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজশাহীতে সর্বোচ্চ ছিল ১৫.৩ ও সর্বনিম্ন ১২.৪ এবং দুটিতে পার্থক্য ছিল ২.৯ ডিগ্রি, সৈয়দপুরে সর্বোচ্চ ছিল ১৬.৬ ও সর্বনিম্ন ১২.৪ এবং পার্থক্য ৪.২ ডিগ্রি।

২০২৩ সালের ৭ জানুয়ারি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৪.৪ ডিগ্রি ও সর্বনিম্ন ছিল ১১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় পার্থক্য ছিল ৩.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৫.৫ ডিগ্রি ও সর্বনিম্ন ছিল ১২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় পার্থক্য ছিল ৩.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৫ ডিগ্রি ও সর্বনিম্ন ছিল ৭.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় পার্থক্য ছিল ৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০৪ সালের ২ জানুয়ারি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৫.১। ডিগ্রি ও সর্বনিম্ন ছিল ১২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় পার্থক্য ছিল ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। 

২০০৩ সালে তিন সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান কমে এসেছিল। ৯ জানুয়ারিতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৩.৪ ডিগ্রি ও সর্বনিম্ন ছিল ১০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় পার্থক্য ছিল ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৩ জানুয়ারি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৪.৫ ডিগ্রি ও সর্বনিম্ন ছিল ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৯৮ সালের ৭ জানুয়ারি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৫.৫ ডিগ্রি ও সর্বনিম্ন ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় পার্থক্য ছিল ৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নিয়ে গবেষণা করছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কমার এই পার্থক্য দুই বা তিন দশকজুড়ে বেশি হচ্ছে। 

তিনি বলেন, সাধারণত শৈত্যপ্রবাহ হলে শীত বাড়ে কিন্তু এবার তা না হয়ে কুয়াশার কারণে শীত বেড়ে যায়। আমাদের গত বছরের গবেষণাতেও দেখা গেছে, দিনের তাপমাত্রা বা সূর্যের কিরণ কাল কমে যাচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে সূর্যের আলোর সময়কাল কমে যাচ্ছে। 

এদিকে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন-কুয়াশা বেড়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে পরিবেশ দূষণ। ড. মো. বজলুর রশিদ বলেন, আমাদের মূল বিষয়টি দিনের আলো কমে যাচ্ছে। আমাদের ক্ষেত্রে ২৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকলে শরীরের সঙ্গে মানান সই। ১০ ডিগ্রির নিচে থাকলে শীতের মাত্রা বাড়ে ও ৫ ডিগ্রির নিমে নামলে শীত তীব্রতর হয়। 

স্ট্যামফোর্ড ইউনির্ভাসিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, টেম্পারাচারের হিট ব্যালেন্স মেইনটেইন করার জন্য কিছু জলাধার, কিছু সবুজ গাছপালা ও বিল্ডআপ এরিয়ার রেশিও ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিককালে লক্ষ্য করছি- আমাদের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট হয়ে কমে গেছে, সবুজ বৃক্ষের পরিমাণও কমেছে। সে সবের মধ্যে রয়েছে-ইন্ডাস্ট্রি, হাউজিং, রাস্তা নির্মাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তাপমাত্রা যতটা আছে সেটা এবজার্ভ করে থাকে। রাতের বেলা যেটা শীতল হওয়ার কথা তা হচ্ছে না বরং এলাকাকে উত্তপ্ত করে রাখছে। 

দিন ও রাত তথা সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান ইদানিং সামনে আসলেও আমরা সেটি গত ৫০ বছরের গবেষণায় দেখতে পাচ্ছি। 

গত ২০ বছরে তাপমাত্রার ব্যবধান বেশি কমেছে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসান বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, তাপমাত্রার এই ব্যবধান কমে যাওয়ার বেশকিছু কারণ রয়েছে। তারমধ্যে এডমোসফিয়ার পলুশন ও আরবানাইজেশন অন্যতম কারণ। আগে মানুষ হয়ত এতোগুলো লাইট জ্বালাতো না। ঢাকায় গাড়ির পরিমাণও কমছিল। এডমোসফিয়ার পলুশন ও আরবানাইজেশনের ফলেই দিন দিন রাত-দিনের তাপমাত্রার ব্যবধানটা কমে যাচ্ছে। 

লাইটিং বেড়ে গেলে রাতে চলাচল করা পোকা-মাকড় ও অন্যান্য প্রাণির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, অন্ধকারে যেসব পোকা-মাকড় থাকে, অন্যান্য প্রাণী থাকে স্বভাবগত দিকে পরিবর্তন আসবে। এর ফলে ইকোসিস্টেমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। 

বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. গুলশান আরা লতিফা বলেন, দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়ায় প্রাণবৈচিত্র্যে বড় ধরনের প্রভাব না ফেললেও কিছু কিছু প্রাণির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমরা দেখেছি কয়েকদিন তাপমাত্রার ব্যবধানটা খুব কম ছিল পরবর্তীতে এটি আবার বেড়েছে। যদি ধারাবাহিকভাবে কম থাকত তাহলে বড় ধরনের ক্ষতি হত। এক কোষি এনিম্যাল, লোয়ার ফাইলান, এমিবা, পানিবাহিত কিছু ব্যাকটেরিয়া ওদের ক্ষতি বেশি হত। তিনি বলেন, মার্চ-এপ্রিলের দিকে গরম আসবে। তখন গরমের মাত্রা বেশি হলে আবার ক্ষতিকর হবে। 


বায়োলজিক্যাল সিস্টেস ক্ষতিগ্রস্ত হবে:

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাবেক চেয়ারমন্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল কালাম আজাদ চৌধুরী বলেন, গ্র্যাজুয়ালি ওয়ার্ল্ড ওয়ার্মিংয়ের কারণে তাপমাত্রার এই পার্থক্যটা হচ্ছে। আমার কাছে মনে হয় এটি ছোট করে দেখার কোন সুযোগ নেই। আমাদের আবহাওয়া গ্র্যাজুয়ালি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে আমরা আরো বড় আকারের ক্ষতির মধ্যে পড়বো। এটি বায়োলজিক্যাল সিস্টেস ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা