ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪১ এএম
নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর দেশের কয়েকটি জেলার মাঠ প্রশাসনে সমন্বয়হীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও যাচাই-বাছাইয়ে চরম অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ছবি : সংগৃহীত
নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর দেশের কয়েকটি জেলার মাঠ প্রশাসনে সমন্বয়হীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এসব জেলায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও যাচাই-বাছাইয়ে চরম অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেনÑ এমন অভিযোগ উঠেছে।
এতে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে তাদের সক্ষমতা নিয়ে সংশয়-সন্দেহ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের (এসপি) মধ্যে ব্যাচÑসিনিয়রিটি বৈষম্য, ভূমি প্রশাসনে অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ‘সাহসের ঘাটতি’ ইত্যাদি কারণে মাঠ প্রশাসনে অনেকাংশে অস্থিরতা ও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি সরকারের একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব ও নির্বাচন কমিশনের সচিব বরাবর এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে কয়েকজন জেলা প্রশাসককে সরিয়ে অভিজ্ঞদের পদায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতি সম্প্রতি কয়েকটি জেলার ডিসি মনোনয়ন যাচাই-বাছাইসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। একই সঙ্গে ভূমি-প্রশাসনে অনভিজ্ঞতার কারণে কয়েকটি জেলায় দায়িত্বরত জেলা প্রশাসক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দোদুল্যমানতার পরিচয় দিচ্ছেন। ফলে সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠছে। তবে ওই চিঠির আলোকে সরকারের নীতিনির্ধারকরা এখনও কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে জানা গেছে।
জেলা প্রশাসক ‘জেলার অভিভাবক’, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন:
প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ও সরকারের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে জেলা প্রশাসককে (ডিসি) জেলার অভিভাবক ধরা হয়। অন্যদিকে, পুলিশ সুপার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ফোকাল পারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রচলিত প্রথায় ডিসি সিনিয়র হলে কমান্ড ও সমন্বয় প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। কিন্তু বর্তমানে বেশ কয়েকটি জেলায় ডিসিরা পুলিশ সুপারদের তুলনায় এক থেকে তিন ব্যাচ পর্যন্ত জুনিয়র বলে জানা গেছে।
এর ফলে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে কিংবা নির্বাচন-সংক্রান্ত দায়িত্বে ডিসিদের কর্তৃত্ব প্রভাবিত কিংবা উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সচিবালয়ে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসনে সিনিয়রিটি শুধু মর্যাদার বিষয় নয়; এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কমান্ড প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। জুনিয়র ডিসি এবং সিনিয়র এসপি এই অসম কাঠামো মাঠ প্রশাসনে দ্বিধা ও সংঘাত তৈরি করে।
ভূমি প্রশাসনে অনভিজ্ঞ ইকোনমিক ক্যাডারের ডিসি:
বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক ইকোনমিক ক্যাডারের কয়েকজন কর্মকর্তা।
তাদের ক্যারিয়ারের বড় অংশই কেন্দ্রীভূত ছিল অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, বাজেট, উন্নয়ন পরিকল্পনা ইত্যাদি খাত ঘিরে। কিন্তু জেলা প্রশাসকের দায়িত্বের বড় ক্ষেত্র হলোÑ ভূমি প্রশাসন, নামজারি ও রেকর্ড, উচ্ছেদ অভিযান, ম্যাজিস্ট্রেসি ও রাজস্ব আদায়।
তাই এসব ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতার অভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দোদুল্যমানতা দেখা যাচ্ছে। অথচ ভূমি ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব প্রশাসন ও ম্যাজিস্ট্রেসি এসবই ডিসির মূল কাজের বড় অংশ।
ডিসিদের ‘সাহস দিতে’ কর্মকর্তা নিয়োগ:
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ইকোনমিক ক্যাডার থেকে আসা কয়েকজন কর্মকর্তা ডিসি নিয়োগ পেলেও তারা ভূমি-সংক্রান্ত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ঘন ঘন দ্বিধা ও সংশয় বোধ করছেন।এমন প্রেক্ষাপটে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দূর করতে ডিসিদের ‘সাহস’ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি ৬৪ জেলার জন্য ৩২ জন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যাদের কাজ হচ্ছেÑ জেলা প্রশাসকদের ‘সাহস দেওয়া’ এবং বিধিবিধানের সঠিক প্রয়োগে দিক-নির্দেশনা দেওয়া।
ইতোমধ্যে প্রায় ১২ জন কর্মকর্তা মাঠে নেমে ডিসিদের সহায়তা করছেন বলে জানা গেছে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ বলছেন, ডিসিদের ‘সাহস প্রদান’ উদ্যোগ অনেকের কাছে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সংকটের বহিঃপ্রকাশ, যা তাদের মতে, ‘নজিরবিহীন’।
কারণ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে যদি আলাদাভাবে কাউকে পাঠিয়ে ডিসির সাহস বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হয়, তবে তা স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামোর ব্যর্থতা নির্দেশ করে।
তাদের মতে, ‘মাঠ প্রশাসনের সবচেয়ে বড় সংকট এখন সিদ্ধান্তগ্রহণে ভীতি। আইন আছে, ক্ষমতা আছেÑ কিন্তু সাহস নেই।’
এ বিষয়ে সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “ভূমি ব্যবস্থাপনা হচ্ছে জেলা প্রশাসকের হৃদপিণ্ডের মতো। এ খাতে যারা কাজ করেননি, তারা জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেলে বহু ক্ষেত্রে ফাইল জট, সিদ্ধান্ত বিলম্ব এবং মাঠ পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হবে– এটাই স্বাভাবিক।”
তিনি আরও বলেন, “ব্যাচ, সিনিয়রিটি প্রশাসনে নীরব ক্ষমতা। এখানে যারা জুনিয়র, তারা বাস্তবে সিদ্ধান্ত দিতে হোঁচট খান। আর সিনিয়ররা প্রভাব বিস্তার করেন। ফলে দ্বৈত নেতৃত্ব তৈরি হয়।
“এই কাঠামো তৈরি করছে–সমন্বয় সংকট, কমান্ড দুর্বলতা ও আইনশৃঙ্খলা বৈঠকে নেতৃত্বের দ্বিধা নির্বাচনকেন্দ্রিক দায়িত্ব পালনে অনিশ্চয়তা। রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচনের প্রথম প্রহরী। তিনি দুর্বল হলে পুরো প্রক্রিয়াই ঝুঁকিতে পড়বে।”
নির্বাচন ঘিরে ডিসিদের অদক্ষতার অভিযোগ:
তফসিল ঘোষণার পর কয়েকটি জেলার জেলা প্রশাসক মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত কাজে চরম অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ডিসিরা রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি নাÑ এ নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলার বর্তমান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সি বিসিএস ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা। অপরদিকে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বিসিএস ২৯তম ব্যাচের কর্মকর্তা। অর্থাৎ ডিসি এখানে এসপির তুলনায় চার ব্যাচ জুনিয়র।
সূত্র বলছে, এর ফলে বিভিন্ন সমন্বয় বৈঠক ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ডিসির প্রভাব অনেকাংশেই কম থাকে। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে এসপির প্রভাব অনেক বেশি পড়ে। তা ছাড়া অনভিজ্ঞতার কারণে ভূমি-সংক্রান্ত মামলা বা জটিলতা নিরসনে নানামুখী সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক মিজ নাজমুন আরা সুলতানা বিসিএস ২৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা। মাঠ প্রশাসনে ভূমি-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা না থাকায় ভূমি-সংক্রান্ত জটিল বিষয়ে তিনি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ ভূমি মামলা, নামজারি, উচ্ছেদ অভিযান ইত্যাদি ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত জরুরি।
বৃহৎ জেলা ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার করা হয়েছে ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমানকে। সেখানে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বিসিএস ২৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা। ব্যাচবৈষম্যের কারণে এখানেও সমন্বয় সংকটের অভিযোগ উঠেছে।
একই অভিযোগ বাগেরহাট, নেত্রকোনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়।
বাগেরহাটের ডিসি গোলাম মোহাম্মদ বাতেন, নেত্রকোনার ডিসি মো. সাইফুর রহমান এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের ডিসি মো. শাহাদাত হোসেন বিসিএস ২৮তম ব্যাচের। এই তিন জেলাতেই ডিসিরা সংশ্লিষ্ট এসপির তুলনায় জুনিয়র।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর ফলে অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান, অবৈধ দখলমুক্তকরণ, ভূমি অফিসের অনিয়মÑ এসব বিষয়ে প্রশাসনের দৃঢ় পদক্ষেপ কম দেখা যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ওপরে দ্বিধা থাকলে নিচের স্তরও স্থবির হয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় এসব স্থানে সিদ্ধান্তহীনতা দেখা গেছে। বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে ডিসির সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়েছে। এতে প্রার্থী ও সমর্থকদের ভোগান্তি বেড়েছে।
ঢাকা এবং চট্টগ্রামের ডিসি নিয়োগেও সমালোচনা:
ঢাকা ও চট্টগ্রামের ডিসিকে অন্যত্র সরানোর সুপারিশ করেছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য অভিজ্ঞ ও সাহসী কর্মকর্তাকে এসব মহানগরে নিয়োগের জোর সুপারিশ করা হয়েছে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, “মেগাসিটি দুটি জেলার ডিসির নেতৃত্ব ও সমন্বয় প্রশাসনের মান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। তাদের নেতৃত্ব দুর্বল হলে এর প্রভাব পড়ে সারা দেশে।”
সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ মহলে কতিপয় আমলার বিশেষ ইচ্ছায় ডিসি নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিসখ্য ও রাজনীতিকে বেশি গুরত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে তাই সিনিয়র কিংবা জুনিয়র বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে আগের মতোই ডিসি ও এসপির মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই অব্যাহত রয়েছে।
ছাত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আসন্ন নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন দেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সুধী মহলের ব্যক্তিরা। সুতরাং ডিসি বা এসপি নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনিয়র ও জুনিয়র দূরত্বকে বিবেচনায় আনা উচিত ছিল বলে মনে করছেন তারা
বিষয়টি উপেক্ষা করায় ক্যাডার বৈষম্য যেমন হয়েছে, তেমনি অভিজ্ঞতার অমিল, রাজনৈতিক চাপ ও সিদ্ধান্তহীনতা ফুটে উঠেছে। মাঠ প্রশাসনে আস্থাহীনতা ও ভীতি সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক বিভাগীয় কমিশনার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, ভূমি প্রশাসনে অনভিজ্ঞতা এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক চাপÑ সব মিলিয়ে মাঠ প্রশাসন এখন মানসিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় আছে।”
তার মতে, ডিসি পদায়নে সিনিয়রিটি বিবেচনায় আনা দরকার। ভূমি-প্রশাসনে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ডিসি-এসপি সমন্বয় বাড়াতে নীতিমালা স্পষ্ট করতে হবে। সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, অদক্ষতার অভিযোগ, সিদ্ধান্তহীনতা এবং নির্বাচন-কেন্দ্রিক চাপ- সব মিলিয়ে মাঠ প্রশাসন এক অনিশ্চয়তার পর্যায়ে দাঁড়িয়ে। জেলা প্রশাসকরা দৃঢ় নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হলে ভূমি প্রশাসন দুর্বল হবে, আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় ভেঙে পড়বে এবং নির্বাচন পরিচালনা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।