মুসাব্বির হত্যা
নূর মোহাম্মাদ মিঠু
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:০৬ এএম
ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে বিক্ষোভের ডাক এবং খুনিদের কঠোর হাতে দমনের দাবি জানানো হয়েছে। এ খুনে জড়িত প্রধান শুটারকে শনাক্ত করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
কারওয়ানবাজারের বিভিন্ন এলাকা ও রেললাইনের আশপাশের ভবনের শতাধিক সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে তাকে শনাক্ত করা হয়। এ ছাড়া এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অন্তত আরও ৭ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ‘তারা বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যাকআপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে।’ এমন পরিস্থিতিতে শুটারসহ জড়িতরা যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে সেজন্য গোয়েন্দা নজরদারি ও গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ। এরই মধ্যে সন্দেহভাজনদের ছবি পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও সোর্সদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলেও গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে ময়নাতদন্ত
শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে নিহত মুসাব্বিরের
জানাজা সম্পন্ন হয়। এ ঘটনায় তেজগাঁও থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা দায়ের
করেছেন মুসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। মামলা দায়ের পর তিনি দাবি করেন,
‘অনেক আগে থেকেই খুন হওয়ার আশঙ্কা করছিলেন মুসাব্বির।’
এ বিষয়ে জানতে
চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘সিসি ক্যামেরার
ফুটেজে খুনির ছবি স্পষ্ট। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। গ্রেপ্তার করা সম্ভব
হলে খুনের পেছনের ঘটনা সম্পর্কে জানা যাবে।’ তিনি বলেন, ‘গোয়েন্দা পুলিশের মূল টার্গেট
এখন খুনিকে গ্রেপ্তার করা। পাশাপাশি সন্দেহভাজন অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’ তদন্তের
স্বার্থে এখনই কারও নাম-ঠিকানা প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
গত বুধবার রাতে
তেজগাঁওয়ের কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ সংলগ্ন এলাকায় অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের গুলিতে
নিহত হন মুসাব্বির। এ সময় আহত হন তার সঙ্গী তেজগাঁও থানা
ভ্যানশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান ব্যাপারী মাসুদও। জানা যায়, কারওয়ান
বাজারে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, ফার্মগেটে একটি গ্যারেজ দখলকে কেন্দ্র করে বহিষ্কৃত যুবদল
নেতা আব্দুর রহমানের সঙ্গে বিরোধ ছিল আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের। গত ২৯ ডিসেম্বর চাঁদাবাজির
বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের করা মানববন্ধন ও হামলার ঘটনার পর থেকেই কারওয়ান বাজারের নিয়ন্ত্রণ
নিয়ে তেজগাঁও থানা যুবদলের বহিষ্কৃত সদস্য সচিব আব্দুর রহমান গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে
জড়িয়ে পড়েন মুসাব্বির। এই দ্বন্দ্বের পর থেকেই ক্রমাগত হত্যার হুমকিও পাচ্ছিলেন তিনি।
তবে সুনির্দিষ্টভাবে কারা হত্যার হুমকি দিচ্ছিলেনÑ তা তিনি বলে যেতে পারেননি। ঘটনার
দিন রাতে ও গতকাল বৃহস্পতিবার মুসাব্বিরের একাধিক অনুসারী বিআরবি হাসপাতালে
প্রতিদিনের বাংলাদেশকে এমন তথ্য জানান। মুসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগমও হুমকির
একই তথ্য গতকাল পুলিশকে জানিয়েছেন।
এদিকে ব্যবসায়ীদের
অভিযোগ, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই বাজারটিতে সক্রিয় হয়েছে নতুন চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট।’
এর আগে তেজগাঁও থানা যুবদলের সদস্য সচিব পরিচয় দেওয়া আব্দুর রহমান গত বছর প্রকাশ্যেই
একটি গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ‘বিগত চাঁদাবাজরা তো আসেনি, এটার হাল তো ধরতে হবে।’ তার ওই
বক্তব্যের পর দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হলেও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ আব্দুর রহমানের দৌরাত্ম্য
কমেনি। জানা যায়, গত মাসেই কারওয়ান বাজারের ৫৫০ জন ব্যবসায়ী এ বিষয়ে ইসলামিয়া শান্তি
সমিতির কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছিলেন।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য,
‘আব্দুর রহমান ও তার অনুসারীরা লাখ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন, দোকান বন্ধের পর হামলা
চালিয়েছেন, এমনকি পুলিশের উপস্থিতিতেও ব্যবসায়ীদের মারধর করা হয়েছে। ঠিক সেসময়েই নতুন
করে নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিলেন মুসাব্বির।’
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের
ভাষ্য অনুযায়ী মানববন্ধন ও পরবর্তীতে মামলায় যাদের গ্রেপ্তার করা হয়, তাদের প্রভাব
কমে গেলে সেই এলাকায় মুসাব্বির ‘নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছিলেন’ এমন অভিযোগও ওঠে। এখান
থেকেই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নেয়। এ ছাড়া ফার্মগেট এলাকার একটি গ্যারেজ
দখল নিয়েও দুই গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলছিল।
জানতে চাইলে তেজগাঁও
বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ফজলুল করিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কারওয়ান
বাজারের নিয়ন্ত্রণ, গ্যারেজ দখলসহ সব বিষয় আমলে নিয়েই আমরা তদন্ত করছি। কোনো বিষয়ই
বাদ যাচ্ছে না। আশা করছি খুব শিগগিরই পুরো বিষয়টি সম্পর্কে জানাতে পারব।’
হত্যাকাণ্ডের
পর গতকাল বৃহস্পতিবার মুসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম পুলিশকে জানান, বেশকিছু দিন
ধরেই তার স্বামী জীবননাশের হুমকি পাচ্ছিলেন। তবে কারা বা কেন এই হুমকি দিচ্ছিলÑ সে
বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি।
এ বিষয়ে তেজগাঁও
বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান জানান, এই হুমকির বিষয়টি আগে কখনও পুলিশকে অবহিত
করা হয়নি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চাঁদাবাজি, গ্যারেজ দখল এবং রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারÑ
সব দিক একসঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
এদিকে বর্তমান
অন্তর্বর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে
হত্যা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল
বৃহস্পতিবার বিকালে এক শোকবার্তায় এই প্রতিক্রিয়া জানান তিনি।
শোকবার্তায় বিএনপি
মহাসচিব বলেন, ‘ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর পতনের পর দুষ্কৃতকারীরা
আবারও দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিসহ নৈরাজ্যের মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের অপতৎপরতায়
লিপ্ত হয়েছে। দুষ্কৃতকারীদের নির্মম ও পৈশাচিক হামলায় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক
দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বির নিহতের ঘটনা সেই অপতৎপরতারই
নির্মম বহিঃপ্রকাশ। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এ ধরনের লোমহর্ষক
ঘটনার বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হচ্ছে। তাই এসব দুষ্কৃতকারীকে কঠোর হস্তে দমনের বিকল্প
নেই।’
বিএনপি মহাসচিব
শোক বিবৃতিতে আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার
ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে নিহতের রুহের মাগফিরাত কামনাসহ শোকার্ত
পরিবার-পরিজনদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা জ্ঞাপন করেন।
২৪ ঘণ্টার
মধ্যে হত্যাকারীরা গ্রেপ্তার না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি
এদিকে আগামী ২৪
ঘণ্টার মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা
না হলে কঠোর কর্মসূচি হুঁশিয়ারি দিয়েছে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল। গতকাল বৃহস্পতিবার
দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মুসাব্বিরের জানাজার আগে দলটির জ্যেষ্ঠ
সহসভাপতি ইয়াসীন আলী ও সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
রবিন বলেন, ‘মুসাব্বিরের
হত্যাকারী দুষ্কৃতকারীদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করার দাবি জানাচ্ছি। এই
গ্রেপ্তারের দাবিতে শনিবার (আগামীকাল) ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশে মহানগর ও জেলায় বিক্ষোভ
কর্মসূচি ঘোষণা করছি। এর মধ্যে মুসাব্বিরের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা
না হলে স্বেচ্ছাসেবক দল কঠোর কর্মসূচি দেবে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার
বাদ জোহর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয় মুসাব্বিরের
মরদেহ। সেখানে
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সম্পাদক মীর সরাফত
আলী সপু, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, এসএম জাহাঙ্গীর, মোস্তাফিজুর রহমান,
ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হক, দক্ষিণের সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিনসহ স্বেচ্ছাসেবক
দলের সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াসীন আলীসহ নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত
বক্তব্যে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে
যারা জড়িত অনতিবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। স্বেচ্ছাসেবক
দলের নেতারা ২৪ ঘণ্টা সময় দিয়েছেন। আমরা আশা করব এই সময়ের মধ্যেই হত্যাকারীরা গ্রেপ্তার
হবে। তা না হলে ধরে নেব আন্তরিকতায় কোনো ঘাটতি আছে অথবা আপনারা পারবেন না। তাই সরকারকে
বলব, কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।’