× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্বরাষ্ট্রের গোপনীয়তার দেয়াল আরও উঁচু হচ্ছে

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৯ এএম

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লোগো

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লোগো

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর গোপনীয় তথ্য’ গণমাধ্যমে যাতে প্রকাশিত না হতে পারে, তা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কঠোর নজরদারি ও মনিটরিংয়ের নির্দেশনা দিয়েছে। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩-এর পরিপন্থী কোনো তথ্য ফাঁস হলে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কিন্তু এই নির্দেশনাকে বিশেষজ্ঞরা শুধু একটি প্রশাসনিক আদেশ হিসেবে দেখছেন না। তারা বলছেন, এই নিদের্শনার ফলে এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, এর মাধ্যমে আসলেই কি রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার সুরক্ষা আরও জোরদার করা হচ্ছে? নাকি প্রশাসনের অস্বচ্ছতা ও তথ্য গোপনের সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে চলেছে?

নির্দেশনা-সংশ্লিষ্ট মহলের ভাষ্য, ইদানীং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শাখার গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্য পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে পুলিশের বদলি-পদায়ন, শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা, নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিবেদন, তদন্তের অগ্রগতি, কিছু কৌশলগত নীতি প্রস্তাবÑ এসব বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে খবর প্রকাশ হয়েছে। এগুলোর কিছু ছিল প্রকাশিত নথির হুবহু অনুলিপি, কিছু গোপন বৈঠকের সিদ্ধান্ত-সংক্ষেপ। মন্ত্রণালয় মনে করছে, এর ফলে মূলত ‘তথ্য ফাঁস’ হয়েছে। তবে সাংবাদিকদের মতে, এসবের উল্লেখযোগ্য অংশই ছিল ‘জনস্বার্থে প্রকাশযোগ্য’ তথ্য। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই এ মন্ত্রণালয়ে জারি হয়েছে তথ্য ফাঁস মনিটরিং, গোপন তথ্যের চেইন কঠোর করা এবং দায়ীদের শাস্তির হুমকিসংবলিত নতুন নির্দেশনা।

এ বিষয়ে প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গোপনীয়তার নামে সবকিছু ঢেকে রাখা যায় না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার যৌক্তিক কারণ আছে, কিন্তু জনস্বার্থ-সম্পর্কিত সিদ্ধান্তগুলো অযথা গোপন রাখলে অবিশ্বাস বাড়ে।’ 

ঔপনিবেশিক আইনের আধুনিক প্রয়োগ

যে আইনের কথা এ-সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩। এই আইন ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে রাষ্ট্রীয় নথিকে ‘গোপন’ ঘোষণার ব্যাপক সুযোগ রেখেছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, কূটনীতি, সামরিক পরিকল্পনা, চলমান তদন্তÑ এসব তথ্য গোপন থাকা প্রয়োজন; কিন্তু সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বদলি, পদায়ন বা আর্থিক স্বচ্ছতার তথ্য এই আইনের আড়ালে ঢেকে রাখা গণতান্ত্রিক শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার ড. গাজী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এই আইনটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতির খবর প্রকাশ কঠিন হয়ে যায়। আবার সত্যিকারের নিরাপত্তা-সংবেদনশীল তথ্যের সুরক্ষাও জরুরি। দুয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম সীমারেখা টানার কাজ সরকারকেই করতে হয়; কিন্তু এ সীমারেখা অস্পষ্ট থাকলে অপব্যবহারের ঝুঁকি থেকেই যায়।’

বাড়তি নজরদারিÑ ভয় নাকি দায়িত্ববোধ

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘সকল কর্মকর্তার মাধ্যমে মনিটরিং করা একান্ত প্রয়োজন।’ কথাটি প্রশাসনিক ভাষায় সংক্ষিপ্ত হলেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এর অভিঘাত বড়। কারণ কেউ মনে করছেন, ‘এটি দায়িত্বশীল তথ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ’; কেউ আবার বলছেন, এটি নজরদারি সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার ইঙ্গিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, এখন কার সঙ্গে কী কথা বলছি, কোন নথি কার টেবিল দিয়ে কোথায় যাচ্ছেÑ সবকিছু নিয়েই একটা অস্বস্তি কাজ করবে। এর ফলে সিদ্ধান্ত তৈরি আরও সংকীর্ণ বৃত্তের মধ্যে আটকে যাবে।

তবে আরেকজন কর্মকর্তা উল্টো যুক্তি দেন, গোপন নথি গোপন রাখাই দায়িত্ব। সংবেদনশীল তথ্য অহেতুক বাইরে গেলে শুধু বিব্রতকর পরিস্থিতিই দেখা দেয় নাÑ গোটা নিরাপত্তা কাঠামো ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে মনিটরিংয়ের সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী।

প্রসঙ্গত, নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘তথ্য ফাঁস হলে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে সাময়িক বরখাস্ত, বিভাগীয় মামলা, এমনকি চাকরিচ্যুতি।’ ফলে অনেকের আশঙ্কা, এ ধরনের সতর্কতা যৌক্তিকভাবে অভিযোগ তোলার সাহসও কমিয়ে দেবে। প্রশাসনের ভেতরের অনিয়ম-দুর্নীতি, প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, অনধিকার চর্চাÑ এসব বিষয়ে তথ্য দেওয়া বা নথি প্রকাশের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে। কারণ রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অজুহাতে সব তথ্য গোপন রাখা হলে জবাবদিহিতার জায়গা উধাও হয়ে যায়। তথ্য ফাঁসের নামে হুইসল ব্লোয়ারদের ভয় দেখানো হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই দুর্বল হয়ে পড়বে। ‘আইনানুগ ব্যবস্থা’ প্রশাসনে নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি করবে বলে অনেকের ধারণা।

তথ্যের অধিকার বনাম তথ্যের গোপনীয়তা সংক্রান্ত আইন

একদিকে তথ্য অধিকার আইন নাগরিককে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার অধিকার দিয়েছে; অন্যদিকে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট গোপন নথি প্রকাশকে দণ্ডনীয় করেছে। এই দুই আইনের বাস্তব প্রয়োগেই তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বড় টানাপড়েন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশনা সেই সংঘর্ষকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

নীতি বিশ্লেষকদের মতে, ‘তথ্যের নিরাপত্তা’ ও ‘নাগরিকের জানার অধিকার’Ñ এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে রাষ্ট্র যান্ত্রিকভাবে নিরাপদ হলেও গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। আর প্রশাসনের নথির ওপর কালো পর্দা নামলে জনগণের আস্থাও ক্ষয় হয়। যেমন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, তথ্য ফাঁসে ‘জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। সাংবাদিকদের প্রশ্ন, বিভ্রান্তি কি তথ্য প্রকাশে নাকি নীতিনির্ধারকদের অস্পষ্ট ব্যাখ্যায়? গণমাধ্যমের দায়িত্ব তথ্য যাচাই করে প্রকাশ করা; কিন্তু জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশকে যদি অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে, তাহলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিসর ছোট হয়ে আসে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, গোপনীয়তার প্রয়োজন আছে, কিন্তু তার সুযোগে অস্বচ্ছতা, অদৃশ্য ক্ষমতার লেনদেন, অযাচিত প্রভাবÑ এসব ঢেকে রাখার চেষ্টা হলে সাংবাদিকতা সেখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলবে। জনগণের ট্যাক্সে পরিচালিত প্রশাসনের নীতি-প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানার অধিকারও তাদের আছে। অবশ্যই সংবেদনশীল বিষয় গোপন থাকবে, কিন্তু ‘জনস্বার্থ বনাম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা’র সীমারেখা অস্পষ্ট থাকলে সংকট বাড়বে।

সূত্র বলছে, নির্দেশনায় মন্ত্রণালয়ের মনিটরিংয়ের কথা থাকলেও বাস্তবে তা কীভাবে হবে, এটিই এখন কৌতূহলের বিষয়। ফাইল ট্র্যাকিং সিস্টেম, অফিসিয়াল ইমেইল এনক্রিপশন, প্রিন্টিং লগ মনিটরিং, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণÑ এসব প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি আরও জোরদার হতে পারে। তবে আশঙ্কা রয়েছে এর আড়ালে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারÑ এমনকি ব্যক্তিগত ডিভাইসের ওপরও অঘোষিত নজরদারি বাড়তে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাইবার বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেন, ‘তথ্য নিরাপত্তা জোরদার করা ভালো, কিন্তু তা যেন ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘনে রূপ না নেয়। প্রযুক্তি ভুল হাতে গেলে নজরদারি রাষ্ট্রের ঝুঁকি বেড়ে যায়।’

নিরাপত্তা শক্তিশালী হচ্ছে নাকি জবাবদিহিতা দুর্বল হচ্ছে

সূত্র বলছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর প্রশাসনে যে বার্তা গেছে তা খুবই স্পষ্টÑ ‘কড়া গোপনীয়তা।’ নিরাপত্তা-সংবেদনশীল তথ্য এখন আরও সুরক্ষিত হবেÑ এ নিয়ে সংশয় কম। কিন্তু একই সঙ্গে একটি বড় প্রশ্ন মাথা তুলেছে, এই কঠোরতা কি দুর্নীতির খবর, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতির নথি, বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়াÑ এসব তথ্য প্রকাশ আরও কঠিন করে তুলবে? গোপনীয়তার সংস্কৃতি যদি প্রশাসনের নীতি হয়ে যায়, তাহলে রাষ্ট্রের ভেতরে নীরবতা বাড়ে। নীরবতা বাড়লে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়ে, আবার জবাবদিহিতা কমে যায়।

সচিবালয়ে একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তেমনি নাগরিকের জানার অধিকার এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক নির্দেশনা এই দুই দায়িত্বের মধ্যে নতুন করে এক দেয়াল টেনে দিল কি নাÑ এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এখন দেখার বিষয় এই নির্দেশনা তথ্য-নিরাপত্তা জোরদারের স্বার্থেই হয়েছে নাকি একে অস্বচ্ছ প্রশাসন রক্ষার নতুন ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, গোপনীয়তার দেয়াল যতই উঁচু করা হোক, জনস্বার্থে তথ্যের আলো নিভিয়ে রাখা কখনও দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা