তার আগে ঘোলা হলো পানি
কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩২ এএম
সারা দেশে চলমান প্রশাসনিক অভিযান বন্ধ করা, বিতরণকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ বৃদ্ধি করা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এই তিন দাবি আদায়ের পর ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন এলপিজি ব্যবসায়ীরা। এরপর বিকাল থেকে সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি শুরু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক শেষে এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সেলিম খান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
ব্যবসায়ীরা দাবি
করছেন, সরকার এলপিজি আমদানি ও সিলিন্ডারের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) কমালে ভোক্তা
পর্যায়ে দাম সহনীয় হবে। এতে বাজারে সৃষ্ট সংকটও ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। তবে
ধর্মঘটের কারণে সারা দেশে গ্যাস সিলিন্ডারের সংকট আরও তীব্র হয়। এতে গ্রাহকদের ভোগান্তি
পোহাতে হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আমদানি করা এলপিজির ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে
১০ শতাংশ করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে তা ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের
সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলোÑ ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম কমানো এবং বাজারে জ্বালানি
সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা।
বিইআরসি চেয়ারম্যান
জালাল আহমেদ বলেন, কমিশন বৃদ্ধির ব্যাপারে আমরা একমত হয়েছি। বাকি দাবির ব্যাপারে সরকারের
সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
গতকাল দেশের বিভিন্ন
এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যাপক সংকট দেখা যায়। গৃহিণী, হোটেল ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা
থেকে শুরু করে কারখানা মালিকÑ যারা সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তারা সবাই চরম
দুর্ভোগে পড়েন। কোথাও রান্না বন্ধ হয়ে যায়, কোথাও উৎপাদন কার্যক্রম থমকে থাকে। সাধারণ
মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে দাবি আদায়ের এ কৌশলকে অনেকেই ‘নতুন নৈরাজ্য’ বলে আখ্যা
দিচ্ছেন। গত ১০ দিনের বেশি সময় ধরে রাজধানীসহ সারা দেশে এলপিজির সংকট চলছে। কুড়িল বিশ্বরোড
এলাকায় সরেজমিন দেখা যায়, এলপিজির সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন ভ্রাম্যমাণ খাবার বিক্রেতা
থেকে শুরু করে ভাতের হোটেল মালিক ও সাধারণ ভোক্তারা। সংকট ও বাড়তি দামের কারণে অনেকেই
দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। এই এলাকায় ভ্রাম্যমাণ খিচুড়ি বিক্রি করেন রফিকউল্লাহ।
গত তিন দিন ধরে তার দোকান বন্ধ। তিনি বলেন, আমরা পুরোপুরি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল।
এখানেই রান্না করতাম। কিন্তু এখন গ্যাসের সংকট, দামও অনেক বেড়ে গেছে। খুঁজেও সিলিন্ডার
পাওয়া যাচ্ছে না। বেশি দামে কিনলে যা লাভ হয়, তা দিয়ে পরিবার চালানো সম্ভব না। তাই
দোকান বন্ধ রেখে জমানো টাকা দিয়েই চলছি।
একই অবস্থা ভাতের
হোটেল মালিক ইসমাইল মাহমুদের। তিনি জানান, গত ১০ বছরে এমন সংকট কখনও দেখেননি। আমার
প্রতি তিন-চার দিন পরপর একটি করে সিলিন্ডার লাগে। এখন যদি আড়াই হাজার টাকা দিয়ে একটি
সিলিন্ডার কিনি, তাহলে দৈনিক লাভ থাকে কত? এর সঙ্গে কর্মীদের বেতন, বিদ্যুৎবিলসহ অন্যান্য
খরচ কীভাবে মেটাব।
এদিকে খুচরা গ্যাস
বিক্রেতা জাকারিয়া জানান, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ নেই। তিনি
বলেন, গ্যাস না থাকায় দোকানই খুলি না। যেসব এলাকায় আমি সরবরাহ করি, সেখান থেকে বারবার
ফোন আসছে, কিন্তু রিসিভ করতে পারছি না। এখন অল্প কিছু সিলিন্ডার আছে, সেগুলো বেশি দামে
বিক্রি করতে হচ্ছে। ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি করছি প্রায় দুই হাজার টাকায়।
এক মেয়ে ও দুই
ছেলে নিয়ে জোয়ার সাহারায় বাস করেন কুলসুম বেগম। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে অফিস সহায়ক হিসেবে
কাজ করেন। হোটেল থেকে ভাত নিতে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাসায় সিলিন্ডার শেষ
হওয়ার পর থেকেই বিপদে আছি। সরকার আমাদের সঙ্গে মশকরা করছে। চাইলে তো এগুলো বন্ধ করা
সম্ভব। যাত্রাবাড়ির কাজলার বাসিন্দা মিঠু মজুমদার বলেন, কোনো দোকানে গ্যাস নাই। যাদের
আছে, তারা দাম চাচ্ছে বেশি। ২ হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত চাচ্ছে।
এলপিজি ব্যবসায়ীদের
বক্তব্যকে গতানুগতিক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের
(ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন,
এখন অনেক ব্যবসায়ীর অন্য নামই যেন মানুষকে জিম্মি করে পকেট কাটা। আমদানি কম হলে তা
অন্তত এক মাস আগে জানানোর কথা, কারণ এলপিজি দেশে আসতে ন্যূনতম এক মাস সময় লাগে। শীত
বাড়লেই লাইনের গ্যাসে সংকট দেখিয়ে এলপিজির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজার থেকে সিলিন্ডার
উধাও হয়ে যাওয়া স্পষ্ট কারসাজির ইঙ্গিত দেয়। এখানে আমদানিকারক, ডিস্ট্রিবিউটর এবং পাইকারি-খুচরা
বিক্রেতাদের যোগসাজশ রয়েছে। ভোক্তা অধিদপ্তর ও প্রশাসন অভিযান চালালে তারা দোকান বন্ধ
করে পালিয়ে যায়, এমনকি ধর্মঘট ডেকে বিক্রি বন্ধ রাখে, যা সরকারের আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি
প্রদর্শনের শামিল। এসব আসলে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার অপচেষ্টা ছাড়া কিছু নয়।
সম্প্রতি এক বক্তব্যে
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, দেশে সিলিন্ডারের ঘাটতি
নেই। পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের একটি অংশের যোগসাজশ ও পরিকল্পিত কারসাজির ফল। উপদেষ্টা
জানান, বাংলাদেশে এলপিজি ব্যবসার প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। সরকারের
সম্পৃক্ততা মাত্র প্রায় দুই শতাংশ, যেখানে প্রোপেন ও বিউটেন আমদানি করে বোতলজাত করা
হয়। বিইআরসির সাম্প্রতিক মূল্য সমন্বয়কে কেন্দ্র করে কিছু বেসরকারি অপারেটর বাজারে
কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে।