প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৮ এএম
আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৪৪ পিএম
র্যাব
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন সময় অপব্যবহার করা হয়েছে। এ কারণে সেগুলোর সংস্কার করতে হবে। সংস্থাগুলোর অপব্যবহার রোধে আইনশৃঙ্খলা ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা থেকে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করতে হবে। গতকাল সোমবার রাজধানীর গুলশান অ্যাভিনিউয়ে গুম সংক্রান্ত কমিশনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের এ সুপারিশ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন কমিশনপ্রধান মইনুল ইসলাম চৌধুরী। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া গুম সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় কমিশনপ্রধান বলেন, ‘আগের সরকারগুলো এবং সদ্যবিদায়ি সরকার, সবাই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে অপব্যবহার করেছে। তবে সদ্যবিদায়ি সরকার অনেক বেশি করেছে। সে প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘দেশের প্রত্যেকটা গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কার করতে হবে। আমাদের দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলায়, কারণ তারা ক্ষমতার অংশ হতে চায়।’
সম্মেলনে কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর গঠিত এই কমিশন ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ১৫ বছর সময়ে সংঘটিত বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো অনুসন্ধান করে।
র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ
কমিশন স্পষ্টভাবে জানায়, বলপূর্বক গুম বন্ধে বিদ্যমান নিরাপত্তা কাঠামোয় আমূল পরিবর্তনের বিকল্প নেই। যে কারণে প্রতিবেদনে বেশকিছু জোরালো সুপারিশও করেছে কমিশন। এর মধ্যে অন্যতম হলো র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তকরণ। সংবাদ সম্মেলনে কমিশনপ্রধান বলেন, ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে এই কাজে যুক্ত করা হয়। তদন্তে মোট ৪০টি ডিটেনশন সেন্টার (বন্দিশালা) পেয়েছে কমিশন। এর মধ্যে র্যাবের ২২ থেকে ২৩টি।’
এছাড়া প্রতিবেদনে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহার, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা মৌলিক সংশোধন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন্স আইন, ২০০৩-এর ১৩ ধারা বাতিল, সব বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহিতার আওতায় আনা, বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণ, ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এবং ‘আয়নাঘর’গুলোকে জাদুঘরে রূপান্তরের সুপারিশও করা হয়েছে। কমিশনের ভাষায়, ‘সত্য, স্মৃতি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে বাংলাদেশে বলপূর্বক গুমের অবসান সম্ভব নয়।
সংবাদ সম্মেলনে মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সেনা কর্মকর্তাদের কাজ নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে তাদের প্রত্যাহার করতে হবে। বরং পুলিশের মধ্য থেকে দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি এলিট ফোর্স গঠন করা যেতে পারে।
আয়নাঘর, টিএফআইসি ও গোপন বন্দিশালার জাল
অনুসন্ধানে নেমে গুম সংক্রান্ত কমিশন বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নথি-তথ্য পর্যালোচনা, পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই করে। একই সঙ্গে সরেজমিন পরিদর্শন করে স্বীকৃত ও গোপন উভয় ধরনের আটক কেন্দ্র। এর মধ্যে ছিল ডিজিএফআই ও র্যাব পরিচালিত জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল বা ‘আয়নাঘর’, র্যাব সদর দপ্তরের টিএফআইসি, র্যাব ব্যাটালিয়নসমূহ, এনএসআই, ডিবি, সিটিটিসি এবং পুলিশ লাইন্সসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা। অনুসন্ধানকালে দেশের বিভিন্ন জেলায় গোপন বন্দিশালার সন্ধান পায় কমিশন। এসব বন্দিশালা তাৎক্ষণিকভাবে পরিদর্শন করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো অপরিবর্তিত অবস্থায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। কমিশন গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ডিজিএফআইর জেআইসি (আয়নাঘর) ও র্যাব সদর দপ্তরের টিএফআইসি পরিদর্শন করে আলামত ধ্বংসের সরাসরি প্রমাণ পায় কমিশন। অনুসন্ধানে উঠে আসে, আলামত ধ্বংসে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে ছিল র্যাব। এ অবস্থায় কমিশন তাৎক্ষণিকভাবে আলামত ধ্বংস বন্ধের নির্দেশ দেয়। পরবর্তী সময়ে গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট ভিকটিমদের উপস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য এই দুটিসহ মোট তিনটি গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেন।
অভিযোগের হিসাব ও নিখোঁজের দীর্ঘ তালিকা
কমিশন জানায়, মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ নিয়ে কাজ শুরু করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে একাধিকবার দায়ের হওয়ায় ২৩১টি অভিযোগ বাদ দেওয়া হয় এবং প্রাথমিক তদন্তে গুমের সংজ্ঞার বাইরে বিবেচিত হওয়ায় ১১৩টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। ফলে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় থাকে। এসব অভিযোগ অনুযায়ী গুম হওয়া ২৫১ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এবং ৩৬ জনের গুম-পরবর্তী লাশ উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজদের অবস্থান নির্ধারণে কমিশন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সন্দেহভাজন ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক সাক্ষীসহ মোট ২২২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পাশাপাশি ৭৬৫ জন গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে কমিশনপ্রধান বলেন, ‘তাদের মধ্যে বেশিরভাগই রাজনৈতিক ব্যক্তি। তাদের শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষাসহ সম্ভাব্য সবরকম বিষয়ে কমিশন সুপারিশ করেছে।’
গুম করা লাশের ডাম্পিং জোন নদী
সাবেক সরকারের আমলে রাজধানীর আশপাশের নদীগুলো কার্যত হয়ে উঠেছিল লাশের ডাম্পিং জোন। গুম করে আনা লোকজনকে হত্যার পর হাত-পা বেঁধে লাশ ফেলে দেওয়া হতো এসব নদীতে। পরিচয়হীন মরদেহগুলো পরে ‘বেওয়ারিশ লাশ’ হিসেবে দাফন করা হতো মুন্সীগঞ্জের পৌর কবরস্থানে। সেখানে দাফন হওয়া অসংখ্য লাশের মাথায় ছিল গুলির চিহ্ন, দুই হাত ছিল পিছমোড়া করে বাঁধা। একই সময় বরিশালের বলেশ্বর নদ ও বরগুনার পাথরঘাটায়ও লাশ ফেলা হয়। কমিশন জানিয়েছে, বলেশ্বর নদে সবচেয়ে বেশি লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে এবং অনেক লাশের আর কোনো হদিস মেলেনি। গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির এসব তথ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে গত ১৫ বছরে গুম ছিল পরিকল্পিত, পদ্ধতিগত এবং রাষ্ট্রীয় মদদে সংঘটিত গুরুতর অপরাধ।
পুশইন ও ভারতের কারাগার
কমিশনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশইন করা ব্যক্তিদের বিষয়ে সীমান্তবর্তী জেলার পুলিশ সুপার ও বিজিবির সেক্টর কমান্ডারদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এতে গুমের শিকার কারও নাম পাওয়া যায়নি। তবে কমিশনের এ অনুসন্ধানে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা উঠে আসে। ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার ধামরাইয়ের বাসিন্দা গুমের শিকার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্ত দিয়ে পুশইন করা হয়। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে প্রথম দফায় আটক ১ হাজার ৫২ জন এবং দ্বিতীয় দফায় আটক ৩ হাজার ২৮৫ জন বাংলাদেশি নাগরিকের তালিকা কমিশন পেলেও যাচাই শেষে সেখানে গুমের শিকার কারও নাম পাওয়া যায়নি। তালিকাগুলোর তথ্য অসম্পূর্ণ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা ও হালনাগাদ তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং অগ্রগতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে জানাতে বলা হয়েছে।
কমিশন জানায়, গুম সংক্রান্ত অভিযোগে গণশুনানির প্রস্তাব এলেও কমিশন তা গ্রহণ করেনি। কমিশনের মতে, ভিকটিম ও তাদের পরিবারের জীবন ও নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং অনুসন্ধানের স্বার্থে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী গোপনীয়ভাবে জবানবন্দি গ্রহণই ন্যায়বিচারের জন্য অধিকতর উপযোগী ছিল।
গুমে কারা কতটুকু জড়িত
কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গুমের ঘটনায় প্রায় ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে র্যাব জড়িত, ২৩ শতাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ। এছাড়াও ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআই ব্যাপকভাবে সংশ্লিষ্ট ছিল। বহু ঘটনায় সাদাপোশাকধারী বা ‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয়েও অপহরণ করা হয়। কমিশনের বিশ্লেষণে বলা হয়, এসব তথ্য প্রমাণ করে গুম কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একক ও যৌথ অভিযানে পরিচালিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত অপরাধ, যা রাষ্ট্রীয় সমন্বিত কার্যক্রমের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
তদন্ত, লাশ ও ডিএনএ
ফিরে না আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে চার ধাপে কিছু অভিযোগ বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানায় কমিশন। দুই থেকে পাঁচ দিনের গুমের অভিযোগগুলোর তদন্তেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আলাদা পত্র পাঠানো হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে অগ্রগতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে জানাতে বলা হয়েছে। কমিশন সম্ভাব্য ক্রাইম সিন, পিক-আপ পয়েন্ট, আয়নাঘর ও ডাম্পিং প্লেস পরিদর্শন করেছে। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জের পৌর কবরস্থান, বরিশালের বলেশ্বর নদ এবং বরগুনার পাথরঘাটার ডাম্পিং প্লেস সরাসরি পরিদর্শন করা হয়। বরিশালে দুটি মরদেহ উত্তোলন করে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে অনুসন্ধানের কাজ শুরু হয়েছে। অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি বিস্তৃত ডিএনএ ডেটাবেস গঠনের সুপারিশ করেছে কমিশন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কমিশন প্রতিটি বিভাগে ভিকটিম ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পরামর্শ সভা করেছে, ৩০০ জনের বেশি বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য চারটি কর্মশালা আয়োজন করেছে এবং একাধিক প্রেস ব্রিফিং করেছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মাধ্যমে গুম বিষয়ক ১ ঘণ্টার প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা ও কূটনৈতিক মিশনগুলো গুমের ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে।