প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:১৮ পিএম
অবৈধ ও ক্লোন করা মোবাইল হ্যান্ডসেট শনাক্ত করে ধাপে ধাপে বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর প্রতিবাদে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ভবনে হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এতে ৫৫ জনের নামোল্লেখ করে অজ্ঞাত ৫০০-৬০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪৫ জনকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। অন্যদিকে এনইআইআর চালু এবং সহকর্মীদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা দেশে মোবাইল ফোনের দোকান ও ব্যবসা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে ‘মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ’ (এমবিসিবি)।
গত বৃহস্পতিবার এনইআইআর কার্যকর হয়। এর প্রতিবাদে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। এর আগে গত ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর কার্যক্রম চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীদের আন্দোলনের মুখে কার্যকরের সময়সীমা ১৫ দিন পিছিয়ে ১ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়।
বিটিআরসি সূত্রে জানা যায়, এক ব্যক্তির নামে ১০টির বেশি সক্রিয় সিম থাকলে অতিরিক্ত সিম ৩০ অক্টোবরের মধ্যে বাতিল বা মালিকানা পরিবর্তনের জন্য গত বছরের আগস্টে নির্দেশ দেওয়া হয়। সে সময় ১০টির বেশি সক্রিয় সিম ছিল প্রায় ৬৭ লাখ গ্রাহকের। গত তিন মাসে প্রায় ১৫ লাখ গ্রাহক স্বেচ্ছায় সিম বাতিল করেছেন। তবে এখনও প্রায় ৫২ লাখ সিম বাতিল হয়নি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব সিম বাতিল না করায় সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে জানায় সংস্থাটি।
বিটিআরসির সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত বছরের অক্টোবরে দেশে মোবাইল সিম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮ কোটি ৭৯ লাখ ৭০ হাজার। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহক আট কোটি ৫৯ লাখ, রবির পাঁচ কোটি ৭৫ লাখ, বাংলালিংকের তিন কোটি ৭৯ লাখ এবং টেলিটকের ৬৬ লাখ ৭০ হাজার। বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা ২৬ কোটি ৬৩ লাখ, যার মধ্যে প্রায় ১৯ কোটি সিম সক্রিয়।
অনেকের এনআইডিতে সচল সিম বা হ্যান্ডসেটের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখাচ্ছেÑ এমন অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। তিনি জানান, এনইআইআর চালু হলেও আগামী ৯০ দিন কোনো অবৈধ বা ক্লোন করা হ্যান্ডসেট বন্ধ করা হবে না।
গতকাল শুক্রবার ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে তিন বিলিয়নের বেশি ডেটাসেট সংগ্রহ করা হয়েছে। হিস্টোরিক ডেটাসহ সব তথ্য সিস্টেমে যুক্ত থাকায় অনেকের এনআইডিতে হ্যান্ডসেট বা সিমের সংখ্যা বেশি দেখাচ্ছে। ধীরে ধীরে এসব হিস্টোরিক ডেটা ব্যাকগ্রাউন্ডে আর্কাইভ করে কেবল বর্তমানে সচল হ্যান্ডসেটের তথ্য দেখানো হবে। এতে কিছুটা সময় লাগবে। বিটিআরসি ও মোবাইল অপারেটররা যৌথভাবে এ বিষয়ে কাজ করছে।
তিনি জানান, একজন ব্যক্তির এনআইডির বিপরীতে আগে ২০টি এবং পরে ১৫টি সিম ব্যবহারের অনুমতি ছিল। এ কারণে এনইআইআর ম্যাপিংয়ে এনআইডির বিপরীতে হিস্টোরিক ডেটায় বেশি হ্যান্ডসেটের সংখ্যা দেখানো স্বাভাবিক।
বিটিআরসির উপ-পরিচালক মো. জাকির হোসেন খাঁন বলেন, সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ডেটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। সেই ডেটাবেজে ধীরে ধীরে কাজ করে অবৈধ হ্যান্ডসেট শনাক্ত করা হবে এবং সেগুলো আলাদা করার চেষ্টা চলবে।
তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত জটিল কাজ এবং এক দিনে শেষ করা সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতে যেন নতুন কোনো অবৈধ সেট নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে না পারে, সেটিই প্রধান লক্ষ্য।
যেভাবে জানবেন আপনার ফোন বৈধ কি না
*#০৬# ডায়াল করে আইএমইআই নম্বর দেখুন। এসএমএসে লিখুন : KYD (space) আপনার ১৫ ডিজিট আইএমইআই। পাঠান ১৬১৬১ নম্বরে। ফিরতি বার্তায় জানিয়ে দেওয়া হবে ফোনটি বৈধ কি না। এনইআইআর-সংক্রান্ত তথ্যের জন্য বিটিআরসির হেল্পডেস্ক নম্বর ১০০-তে যোগাযোগ করা যাবে। এ ছাড়া *১৬১৬১# ডায়াল করে অথবা সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার নম্বর ১২১-এ যোগাযোগ করেও সেবা নেওয়া যাবে। ওয়েবসাইট : neir.btrc.gov.bd
বিটিআরসি ভবনে হামলায় ৬০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
বিটিআরসি ভবনে হামলার ঘটনায় গতকাল সংস্থার লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ আশরাফুজ্জামান জাহেদ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেছেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম মনির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মামলায় ৫৫ জনের নামোল্লেখ করে ৫০০-৬০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। তাদের কারাগারে পাঠান আদালত।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার বেলা আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে আগারগাঁও এলাকায় বিটিআরসি ভবনের সামনে জড়ো হন আন্দোলনকারীরা। তারা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে পুনরায় আন্দোলন শুরু করেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিটিআরসি ভবনের কাচের দেয়ালসহ বিভিন্ন অংশ ভাঙচুর করেন। এ ছাড়া ভবনের সামনে পার্ক করা ৫১ আসনের একটি এসি স্টাফবাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে বিটিআরসি ভবন ও যানবাহনের আনুমানিক দুই কোটি এক লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেট নিয়ন্ত্রণে এনইআইআর সিস্টেম চালুর বিরোধিতা করে আসছিল ব্যবসায়ীদের একটি অংশ। বিষয়টি নিয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ জানুয়ারি সিস্টেমটি চালু করা হয়। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীরা আগারগাঁও এলাকায় সড়ক অবরোধ করে এবং কমিশনের কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে ৪৫ জনকে আটক করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা আরও ১০ জন পলাতক আসামির নাম প্রকাশ করেছেন।
এদিকে এনইআইআর চালুর প্রতিবাদ এবং সহকর্মীদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা দেশে মোবাইল ফোনের দোকান ও ব্যবসা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে ‘মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ’ (এমবিসিবি)। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মোবাইল আমদানিতে করহার কমানো, এনওসি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আটক ব্যবসায়ীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই কর্মসূচি চলবে।