কবির হোসেন
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:০৫ এএম
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় মোট সাতজনের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের তথ্য পাওয়া গেছে। ওই গ্রুপের সন্দেহভাজন মূল দুজনকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তারা হলেনÑ ফয়সাল করিম মাসুদ ও মো. আলমগীর শেখ ওরফে রুবেল। এ দুজন যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্য তাদের পাসপোর্ট ব্লক করা হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
একটি সূত্রমতে, এরই মধ্যে শুটার ফয়সাল দেশ ছেড়েছেন। যদিও তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে মোটরসাইকেল চালক রুবেলকে গোয়েন্দ জালে রাখা হয়েছে। যেকোনো সময় আটক দেখাতে পারে বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
এই সাতজনের মধ্যে হাদিকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় অস্ত্রধারীদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মালিক আব্দুল হান্নান নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও দুজনকে। তারা ফয়সালকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন বলে ধারণা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। মোটরসাইকেলের মালিক হান্নানকে গতকাল আদালতে সোপর্দ করে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি চান পল্টন থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক শামীম হাসান। শুনানি নিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলম ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী যুগান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এদিকে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুলিবিদ্ধ আহত ওসমান হাদিকে আজ সোমবার দুপুরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হবে।
রবিবার প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান, এভারকেয়ার হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. জাফর ও ওসমান হাদির ভাই ওমর বিন হাদির মধ্যে জরুরি কল কনফারেন্সে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
গত দুদিন ধরে হাদির চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার কয়েকটি হাসপাতালে যোগাযোগ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।গতকাল এভারকেয়ার হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের পরামর্শে ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার পর প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করা হয়। প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান ড. ইউনূসকে জানান, বর্তমানে ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল এবং অপরিবর্তিত রয়েছে।
এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় মেডিকেল এয়ার অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক দল এবং ভ্রমণ সংক্রান্ত সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের অ্যাক্সিডেন্ট ইমার্জেন্সি বিভাগে তার চিকিৎসার সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ওসমান হাদির চিকিৎসা সংক্রান্ত সকল ব্যয় রাষ্ট্রীয়ভাবে বহন করা হবে।
জানা গেছে, হাদির ঘটনায় অভিযুক্তদের কেউ কেউ ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ওসমান হাদির ওপর হামলায় জড়িতরা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়েছেনÑ এমন তথ্য নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছে ডিএমপি। পুলিশের ভাষ্যমতে, হামলাকারীরা বর্তমানে দেশেই অবস্থান করছেন এবং তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। একটি নির্ভরশীল সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর শুটার ফয়সাল বিভিন্নভাবে দেশত্যাগ করার চেষ্টা করেন। সূত্র জানিয়েছে, তিনি প্রথমবার সীমান্ত এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া দিয়ে পালাতে গিয়ে ব্যর্থ হন। পরে সিলেট সীমন্তে যাওয়ারও তথ্য মেলে। সর্বশেষ শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী এলাকার সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও কেউ সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে গেছেনÑ এমন তথ্য এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
ডিএমপি বলছে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সতর্ক করা হয়েছে। নলিতাবাড়ী সীমান্ত থেকে সিবিয়ন দিও এবং সঞ্জয় চিসিম নামে দুজনকে আটক করা হয়েছে। তারা চোরাই পথে মানব পাচার করেন। আলোচনায় আসা ফয়সাল আইটি ব্যবসায়ী এবং রুবেল ঠিকাদারির ব্যবসা করেন। তারা দুজনই ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজের অনুসারী। জাহাঙ্গীর কবির নানকের কাছের লোক এই রিয়াজ অনেক আগে থেকেই নাশকতার পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতা বলে পুলিশ বিভিন্ন সময় দাবি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল শুটার ফয়সালের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। এছাড়াও ফয়সালের স্বাক্ষরকৃত বিপুল পরিমাণ চেক বই ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসসহ তিনজন সন্দিগ্ধ ব্যক্তিকে পুলিশের নিকট হস্তান্তর করেছে র্যাব।
হাদির প্রাণনাশের চেষ্টার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। পুলিশ আসামিকে গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। পরিবারের সদস্যরাও হাদির চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত আছেন। এ বিষয়ে গতকাল রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) এসএন নজরুল ইসলাম জানান, সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা হেলমেট পরিহিত অবস্থায় ভিকটিম ওসমান হাদিকে খুব কাছ থেকে গুলি করেন। ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও শনাক্তকৃত সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারে ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং অভিযান চলমান রয়েছে। তারা যেন সীমান্ত পার হতে না পারেন, সেজন্য তাদের পাসপোর্ট ব্লক করা হয়েছে এবং সীমান্তে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এছাড়া সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে সহযোগিতায় তথ্য প্রদানকারীকে সরকার কর্তৃক ৫০ লাখ টাকা অর্থ পুরস্কারের ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে শেরপুরের নালিতাবাড়ী সীমান্ত দিয়ে লোক পারাপারে জড়িত সন্দেহে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেনÑ সিবিয়ন দিও এবং সঞ্জয় চিসিম। এ ছাড়া র্যাব মোটরসাইকেলের মালিক মো. আব্দুল হান্নানকে গ্রেপ্তার করে পল্টন থানায় হস্তান্তর করেছে। হত্যাচেষ্টায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হান্নানকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হলে তা মঞ্জুর করা হয় বলে জানা গেছে।
এদিকে ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থা নিয়ে দ্বিতীয় দিনেও তেমন কোনো আশার কথা শোনাতে পারেননি চিকিৎসকরা। সর্বশেষ সিটি স্ক্যানে তার মস্তিষ্কের ফোলা (সেরিব্রাল ইডেমা) আগের চেয়ে বেড়েছে; একই সঙ্গে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি লক্ষ করা গেছে বলে জানিয়েছে তার চিকিৎসায় গঠিত মাল্টিডিসিপ্লিনারি মেডিকেল বোর্ড। গতকাল বিকালে এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউ ও এইচডিইউ কো-অর্ডিনেটর এবং সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মো. জাফর ইকবাল স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে জানানো হয় এভারকেয়ার হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে চিকিৎসাধীন হাদির সর্বশেষ সিটি স্ক্যানে দেখা গেছে, তার মস্তিষ্কের ফোলা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ক্লিনিক্যাল পরিস্থিতি।
হাদির ওপর হামলাকারী সন্দেহভাজন ফয়সালের সব ব্যাংক হিসাব জব্দ করার পাশাপাশি তার আইটি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল সফট আইটি লিমিটেডের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়েছে। গতকাল রবিবার সকালে ফয়সাল ও তার প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের চিঠি সব ব্যাংকে পাঠানো হয় বলে এনবিআরের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। ফয়সাল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সদস্য।
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর বাদ জুমা রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেলে করে আসা দুই আততায়ীর একজন চলন্ত রিকশায় থাকা ওসমান হাদির মাথায় গুলি করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। সেখান থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে ওই হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন হাদি।