ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:২৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সারা দেশে জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়ন ঘিরে প্রশাসনে নতুন করে সমালোচনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। জনপ্রশাসনে কাঠামোগত বৈষম্য ও ‘সিন্ডিকেট’ দ্বারা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগের অন্ত নেই। যোগ্য, নিরপেক্ষ ও সৎ কর্মকর্তারা বছরের পর বছর বঞ্চিত হচ্ছেন; অথচ একই গোষ্ঠীর সুবিধাভোগীরা বারবার গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পদায়ন পাচ্ছেন। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পদায়নের ধারায় এক ধরনের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক বা সিন্ডিকেট এমনভাবে সক্রিয় হয়েছে যে, তাদের চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পাচ্ছেন না প্রশাসনের নিরপেক্ষ কর্মকর্তারা।
বারবার একই মুখ
২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া পরপর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় ডিসি পদ পেয়েছেন। রাজবাড়ী, নারায়ণগঞ্জ ও সর্বশেষ চট্টগ্রাম। অতীতে তিনি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রভাবশালী সচিব আব্দুস সামাদের একান্ত সচিব ছিলেন। সূত্র বলছে, তিনি মৌখিক আদেশে আরও কয়েকজন শীর্ষ সচিবের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার ধারাবাহিক পদায়ন প্রশাসনের ভেতরে বিশেষ সুবিধাভোগী চক্রের অস্তিত্ব আরও দৃশ্যমান করেছে।
একই ব্যাচের শারমিন আক্তার জাহান। নড়াইলে ‘ভুয়া জুলাই যোদ্ধা’ বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এই কর্মকর্তা দ্বিতীয়বার ডিসির দায়িত্ব পেয়েছেন। এবার জনপ্রশাসন সচিবের নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জে সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটিও নিয়মমাফিক ভোগ করেননি।
২৭তম ব্যাচের তৌফিকুর রহমানও তিন দফায় ডিসি হয়েছেন কুষ্টিয়া, খুলনা এবং সর্বশেষ বগুড়ায়। ২৫তম ব্যাচের আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীনও একাধিক জেলা ঘুরে এসেছেন। নড়াইলের বর্তমান ডিসি ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম দুই ধাপে দুই জেলায় ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এত ধারাবাহিকতা কারও কর্মদক্ষতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন বলে মনে করছে সূত্র।
বঞ্চিতদের দীর্ঘশ্বাস
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বঞ্চিত এক কর্মকর্তা বলেন, একজন কর্মকর্তা তিন জেলায় ডিসি, আরেকজন দুই জেলায় এটা স্বাভাবিক নীতি নয়। যারা সচিবদের একান্ত সচিব ছিলেন, তারাই বারবার সুযোগ পাচ্ছেন।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, ২৫তম ও ২৭তম ব্যাচের কিছু কর্মকর্তাকে তিন-তিনবার ডিসি করা হচ্ছে। অথচ অনেক সিনিয়র কর্মকর্তা আছেন, যারা বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু তাদের ডিসি পদে পদোন্নতি নেই।
জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্সের অভিযোগ
‘এপিডি সিন্ডিকেটই নিয়ন্ত্রণ করছে পদায়ন’ : জনপ্রশাসন সংক্রান্ত এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স। তাদের ভেরিফায়েড পেজে বলা হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি উইং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন একজন প্রভাবশালী যুগ্ম সচিব, দুজন উপসচিব। অ্যালায়েন্সের দাবি, এরাই ইউএনও ও ডিসি বদলি-পদায়ন ‘নিয়ন্ত্রণ’ করছেন এবং আওয়ামী-ঘনিষ্ঠ ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় পাঠানো হচ্ছে। অন্যদিকে ৩৫তম ও ৩৬তম ব্যাচের ১৫৮ ইউএনওকে আকস্মিক প্রত্যাহার সেটিও এই সিন্ডিকেটের প্রভাবের ফল বলে অভিযোগ।
নিয়োগে স্বচ্ছতা ভেঙে পড়ছে
সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বারবার বিতর্কিত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া প্রশাসনের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করছে। বঞ্চনার এই চক্র সৎ কর্মকর্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। একই কর্মকর্তাদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পাঠানো স্পষ্ট সিন্ডিকেটের প্রমাণ। এটি প্রশাসনের ক্যারিয়ার প্রগ্রেশনকেই ধ্বংস করছে।
বাহ্যিক পরিবর্তন হলেও সিন্ডিকেট অটুট
প্রশাসনিক সংক্রান্ত আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, কিছু আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তা বাদ গেলেও অনেকেই বহাল রয়েছেন। কারা বাদ পড়ছেন আর কারা বারবার সুযোগ পাচ্ছেন সেখানেই সিন্ডিকেটের আসল চেহারা প্রকাশ পায়। তার মতে, এই নিয়ন্ত্রণ শুধু বর্তমান নয়, আগামী কয়েক বছরের প্রশাসনকেও প্রভাবিত করবে। বাহ্যিক বদল ঘটলেও অভ্যন্তরের সিন্ডিকেট অক্ষত থাকলে নতুন মুখও পুরনো ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রতিনিধি হয়ে উঠবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা, যোগ্যতার মূল্যায়ন ও নীতিগত পদায়ন দীর্ঘদিনের দাবি। কিন্তু বারবার একই গোষ্ঠীর পদোন্নতি-পদায়নের ঘটনা প্রশ্ন তুলছে প্রশাসন কি সত্যিই বদলাচ্ছে নাকি কোনো সিন্ডিকেট এর নেপথ্যে সক্রিয়। আগামী দিনে মাঠ প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ, কতটা সেবামুখী এবং কতটা জনমানুষের প্রতি দায়বদ্ধ হতে পারবে তখনই এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে।