প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২৭ এএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৫৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাইবার ঝুঁকি। যার মধ্যে রয়েছে র্যানসমওয়্যার, ফিশিং এবং ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন অ্যাটাকসহ নানা ধরনের হুমকি। এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দক্ষ জনবল বর্তমানে যার বড় ঘাটতি রয়েছে। তবে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের পুরোটাই নির্ভর করছে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তার ওপর।
তাই ব্যাংকগুলোর উচিত তাদের সিস্টেমের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করতে এবং ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন করে দেখা। উল্লেখ্য, ফোনকল, এসএমএস, ই-মেইল কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের ব্যাংক কর্মকর্তা বা বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি পরিচয়ে যোগাযোগ করে প্রতারকরা গ্রাহকের কাছ থেকে ওটিপি, পিন, পাসওয়ার্ড বা কার্ড তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। একবার এই তথ্য ফাঁস করে নিতে পারলে প্রতারকরা মুহূর্তেই অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ সরিয়ে নেয়।
ডিজিটাল প্রতারণার নানা রূপ
ফিশিং : ফিশিং হলো এক ধরনের সাইবার প্রতারণা, যেখানে প্রতারকরা ভুয়া ইমেইল, এসএমএস, ফোনকল বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করে গ্রাহকের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য, যেমন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, পাসওয়ার্ড, ক্রেডিট কার্ড তথ্য ইত্যাদি সংগ্রহ করে। সাধারণত এই ধরনের বার্তাগুলো দেখতে একদম আসল ব্যাংক, কোম্পানি বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো হয়, যাতে ব্যবহারকারী বিশ্বাস করে নিজের তথ্য দিয়ে থাকে। এইভাবে প্রতারকরা ভুক্তভোগীর অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে অর্থ চুরি করতে পারে। ফিশিং থেকে বাঁচতে অজানা লিংক বা ইমেইলে ক্লিক না করা, সন্দেহজনক ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত তথ্য না দেওয়া এবং সব সময় অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও অ্যাপ ব্যবহার করা উচিত।
বিশিং : বিশিং হলো এক ধরনের ফোনভিত্তিক প্রতারণা, যেখানে প্রতারকরা ফোনকল বা ভয়েস মেসেজের মাধ্যমে নিজেকে ব্যাংকের কর্মকর্তা, সরকারি কর্মচারী বা কোনো বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়ে গ্রাহকের গোপন তথ্য যেমন ওটিপি, পিন, অ্যাকাউন্ট নম্বর বা কার্ড তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করে।
সাধারণত তারা জরুরি বা ভয়ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে, যেমন ‘আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’ বা ‘অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে’ এ ধরনের কথাবার্তা বলে গ্রাহককে বিভ্রান্ত করে। বিশিং থেকে রক্ষা পেতে কোনো অচেনা নম্বর থেকে প্রাপ্ত ফোনে ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য না দেওয়া এবং সন্দেহ হলে ব্যাংকের অফিসিয়াল হেল্পলাইন নম্বরে সরাসরি যোগাযোগ করা উচিত।
স্মিশিং : স্মিশিং হলো এক ধরনের প্রতারণা, যেখানে প্রতারকরা এসএমএস বা মেসেজের মাধ্যমে ভুয়া লিংক পাঠিয়ে গ্রাহকের ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। সাধারণত এই মেসেজগুলো ব্যাংক, মোবাইল অপারেটর বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে পাঠানো হয়, যেমন আপনার অ্যাকাউন্ট ব্লক হয়েছে, নিচের লিংকে ক্লিক করে যাচাই করুন ইত্যাদি। গ্রাহক সেই লিংকে ক্লিক করলে তার ফোনে ক্ষতিকর সফটওয়্যার ইনস্টল হতে পারে বা ভুয়া ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে নিজের গোপন তথ্য দিয়ে ফেলতে পারে।
স্মিশিং থেকে বাঁচতে অচেনা বা সন্দেহজনক লিংকে কখনও ক্লিক না করা, এমন মেসেজ উপেক্ষা করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল নম্বরে যোগাযোগ করা উচিত।
কিউশিং : কিউশিং হলো এক ধরনের প্রতারণা, যেখানে ভুয়া কিউআর কোড স্ক্যান করিয়ে গ্রাহকের ফোনে ক্ষতিকর সফটওয়্যার (ম্যালওয়্যার) ইনস্টল করা হয়, যা ব্যাংকিং তথ্য, লগইন, ওটিপি বা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করতে পারে। সাধারণত প্রতারকরা দোকান, পোস্টার বা অনলাইনে ভুয়া কিউআর কোড বসায়। যা স্ক্যান করলেই ব্যবহারকারীকে একটি ম্যালিশিয়াস ওয়েবসাইট বা ভুয়া অ্যাপে নিয়ে যায়। ব্যবহারকারী অজান্তে অ্যাপটি ইনস্টল করলে সেটি ফোনে অনুমতি নিয়ে ব্যাংক অ্যাপের ওপর ভুয়া লগইন উইন্ডো দেখিয়ে তথ্য চুরি করে বা ওটিপি পড়ে নেয়। এ ধরনের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে অপরিচিত কিউআর কোড স্ক্যান না করা, স্ক্যানের পর লিংক যাচাই করা, শুধুমাত্র অফিসিয়াল প্লে-স্টোর বা অ্যাপ-স্টোর থেকে অ্যাপ ইনস্টল করা, অপ্রয়োজনীয় পারমিশন না দেওয়া, ব্যাংকিং অ্যাপ ও ফোন আপডেট রাখা এবং সন্দেহজনক কিছু ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকের হটলাইনে যোগাযোগ করা উচিত।
সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্যাম : সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্যাম হলো এক ধরনের অনলাইন প্রতারণা, যেখানে প্রতারকরা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে মানুষের কাছ থেকে টাকা বা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেয়। তারা ভুয়া প্রোফাইল খুলে নিজেকে ব্যাংক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, পুরস্কার বিজয়ী বা বিদেশে থাকা বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেয় এবং বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করে। এরপর তারা টাকা পাঠাতে, লিংকে ক্লিক করতে বা তথ্য দিতে বলে, যার মাধ্যমে প্রতারণা সংঘটিত হয়। সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্যাম থেকে রক্ষা পেতে অচেনা প্রোফাইলের সঙ্গে যোগাযোগ না করা, কোনো লিংক বা অফারে সহজে বিশ্বাস না করা এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপ রিপোর্ট বা ব্লক করা উচিত।
দুর্বল সিস্টেম অখণ্ডতা : সিস্টেমের নিরাপত্তা ত্রুটির সুযোগ নিয়ে অননুমোদিত অ্যাক্সেস বা তথ্য চুরির ঘটনা ঘটে। অনিচ্ছাকৃত বা দুর্ঘটনাজনিত নিরাপত্তা লঙ্ঘন ভুলবশত কোনো নিরাপত্তা ত্রুটি বা ডেটা ফাঁস হওয়াও একটি বড় ঝুঁকি।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপায়
দক্ষ জনবলের অভাব : সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা : ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের জন্য একক এবং শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করা প্রয়োজন।
সচেতনতা বৃদ্ধি : ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে এবং ফিশিংয়ের মতো প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকতে হবে।