প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৫ ১৫:৪৯ পিএম
অর্থসংকট, অবকাঠামো সংকটসহ নানা কারণে শুধু জোড়াতালি দিয়ে চিড়িয়াখানাকে উন্নত কিছু যাবে না। এজন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোকদের নিয়ে সুপরিকল্পিত কাজ করা বলে মন্তব্য করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, চিড়িয়াখানা এমন একটি সংকটের মধ্যে রয়েছে সেখানে ইচ্ছে করলেই ডিজি বা পরিচালক কিছু করতে পারবে না। এটি অনেক বছর যাবত চলে আসছে। এগুলোর সমাধানের জন্য অধিদপ্তর, চিড়িয়াখানার কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকসহ সকলে মিলে কাজ করতে হবে।
‘বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার বর্তমান অবস্থা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথি এসব কথা বলেন। রবিবার (২ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর ফার্মগেটের বাংলাদেশ তুলা উন্নয়ন বোর্ডের হলরুমে কর্মশালাটির আয়োজন করে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, বিশেষ অতিথি ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. জাবের, স্বাগত বক্তব্য রাখেন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. বয়জার রহমান, মূলপ্রবন্ধ করেন চিড়িয়াখানার পরিচালক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার, মূলপ্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন চিড়িয়াখানার সাবেক কিউরেটর ডা. এ বি এম শহীদ উল্লাহ, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনিমেল সাইন্স এন্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের ডিন ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ারর তৌহিদুর রহমান প্রমুখ।
উপদেষ্টা বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে চিড়িয়াখানার সমস্যা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে জানতে আমরা চিড়িয়াখানা পরিদর্শন করেছি। সেখানে গিয়ে অনেক ধরনের সমস্যা চোখে পড়েছে। তিনি সকলের পরামর্শ দেওয়ার জন্য আকুল আবেদন ও অনুরোধ জানিয়ে বলেন, চিড়িয়াখানাকে উন্নত করতে, প্রয়োজনে নাম পরিবর্তনের দরকার হলেও আপনারা পরামর্শ দিবেন।
প্রাণিগুলোর প্রতি মানবিক আচরণ করছি না উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, আমরা চিড়িয়াখানাকে বিনোদন ও অর্থ আয়ের জায়গা হিসেবে দেখি, যা ঠিক না। এটি অন্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প হিসেবে দেখা হয় তা ঠিক না। এটি কী জাতীয় কিছুই না? বরং জাতিকে পরিচিত করে তুলে চিড়িয়াখানা।
তিনি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকদের নিয়ে বোর্ড করা দরকার উল্লেখ করে বলেন, আজ অনেক পরামর্শ পাওয়া গেছে যা নিজেরা মিটিং করলে হতো না। আমরা আগামীতে এমন একটি কমিটি করব যেখানে সব শ্রেণির অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। প্রয়োজনে প্রতি মাসে সবাই বসে চিড়িয়াখানার উন্নয়নে কী কী করা যায় তা নির্ধারণ করা হবে।
উপদেষ্টা বলেন, চিড়িয়াখানার নামটি পাল্টাতে পারলে ভালো হয়। এ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতে হবে।
ফরিদা আখতার বলেন, আমাদের অনেক প্রাণী আছে বিলুপ্তির পথে সেগুলোর সংরক্ষণ করতে হবে। তা ছাড়া স্বাভাবিক মৃত্যুর সময় হয়েগেছে তাদের নিয়ে কী করা যায় তা নিয়েও চিন্তা করতে হবে। তাদেরকে ভালো পরিবেশ দেওয়া ব্যাপারে চিন্তা করা দরকার।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে শুধু টাকার চিন্তা না করে বরং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে চিন্তা করবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের বলেন, আমাদের প্রাণিগুলোকে ভালোভাবে রাখার জন্য যে ধরনের পরিবেশ তা নেই। চিড়িয়াখানা বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমরা সুন্দরভাবে চিড়িয়াখানাকে তুলে ধরতে পারলে সারা বিশ্বে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়বে।
ব্রিগেডিয়ার তৌহিদুর রহমান বলেন, চিড়িয়াখানার শুধু অবকাঠামো নয় বরং থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মত উন্নত করতে হবে। কেননা আমাদের সন্তানরা এখন খুবই স্মার্ট। তারা টেলিভিশনে বিশ্বের বিভিন্ন চিড়িয়াখানার জীবজন্তু দেখছে। তাদের কাছে চিড়িয়াখানাকে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরতে হবে।
ডা. এ বি এম শহীদ উল্লাহ বলেন, চিড়িয়াখানাকে বিশ্বমানের করতে হলে আইন দরকার হয়, আমরা তা করেছি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়। তিনি বলেন, আমাদের একটি মাস্টারপ্লান তৈরি করা হয়েছে, এটি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চিড়িয়াখানাকে একেবারে সাফারি পার্কের মত করা যাবে না বরং দর্শকরা যেন প্রাণিগুলোকে ভালোভাবে দেখতে পারে। পাশাপাশি প্রাণিগুলোর সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, হারিয়ে যাওয়া প্রাণিগুলোর ব্রিডিং করে জন্মহার বাড়াতে হবে। তা ছাড়া চিড়িয়াখানার প্রাণিগুলো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা বাড়াতে আরো বেশি করে যুক্ত করতে হবে। দর্শকদের অভিযোগ ও পরামর্শগুলো গুরুত্ব দিলে অনেক সমস্যার সমাধান করা যায়।
বর্জ্যব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্জ্য থেকে রিনিউবল এনার্জি, সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাণিগুলোকে উত্যক্ত করলে জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে। তা ছাড়া নিরাপত্তা বাড়ানো, বিভিন্ন প্রাণির জন্য আলাদা টিকেট সিস্টেম করলে আয় দ্বিগুণ হবে।
২০০৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গড়িয়েছে একটি আইন তৈরি করতে বলে জানিয়েছেন নাজমুল হক নামের চিড়িয়াখানার এক কর্মকর্তা। ২৬শ প্রাণির জন্য মাত্র একজন চিকিৎসক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফিরোজজামান বলেন, আমাদের প্রাণিদের ব্রিডিংয়ে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। প্রাণিগুলোর মধ্যে ক্যাপ্টিং ব্রিডিং করে প্রকৃতিতেও দিতে পারি সে ব্যবস্থা করা যেতে পারে।