জনপ্রশাসন
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৫১ এএম
আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৩২ পিএম
বিসিএস প্রশাসন নবম ব্যাচের মেধাবী কর্মকর্তা মো. শামসুল আলম। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১-এর শাসনামলে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে চারদলীয় সরকারের আমলে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব-১, প্রটোকল অফিসার ও একান্ত সচিব (ভারপ্রাপ্ত)। কিন্তু ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উপসচিব হিসেবে কর্মরত থাকলেও রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘ ১৭ বছর তার ঘটেনি পদোন্নতি।
গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হলে অতীতের বঞ্চনার কথা উল্লেখ করে শামসুল আলম ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পেতে সরকারের কাছে আবেদন করেন। সরকার সদয় বিবেচনা করে তাকে সিনিয়র সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেন। কিন্তু এখনও কোনো মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে তাকে পদায়ন করা হয়নি। কিংবা চুক্তিতে কোনো মন্ত্রণালয়ে সচিবও করা হয়নি। ফলে তার যোগ্যতা ও মেধা তিনি পারছেন না কাজে লাগাতে। একরাশ হতাশা নিয়ে তিনি সময় কাটাচ্ছেন।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এক যুগ আগে অবসরে গিয়েছেন এমন অনেক কর্মকর্তাকে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ বিগত শাসনামলে বঞ্চনার শিকার অনেক কর্মকর্তাকে বর্তমানে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হলেও যোগ্যতা ও মেধাকে কাজে লাগানো হচ্ছে না।
এমন আরেক কর্মকর্তা ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ এফসিএ। তিনিও বিসিএস নবম ব্যাচের চৌকস কর্মকর্তা হিসেবে প্রশাসনে পরিচিত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৯ বার পদোন্নতিবঞ্চিত হন তিনি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভূতাপেক্ষ সচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে নিয়োগ পান জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে সচিব পদে। তবে মাত্র তিন মাস সচিবের দায়িত্ব পালন করতে পারলেও পরে আর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়নি তাকে।
একইভাবে চারবার বঞ্চিত হয়েছেন বিসিএস নবম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সচিব হিসেবে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী হন তিনি। কিন্তু দুই মাস পরই যেতে হয়েছে অবসরের পূর্ববর্তী ছুটিতে (পিআরএল)। একাদশ ব্যাচের কর্মকর্তা মহ. মনিরুজ্জামান ভূমি জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে মাত্র তিন মাস দায়িত্ব পালন করে অবসরে যান। সাতবার পদোন্নতিবঞ্চিত ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান তথ্য কমিশনের মহাপরিচালক ছিলেন মাত্র তিন মাস; ১৫তম ব্যাচের মো. আরিফ ১১ বার পদোন্নতিবঞ্চিত হয়ে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেলেও দায়িত্ব নেওয়ার আগেই চলে গেছেন পিআরএলে। এভাবে বিভিন্ন ব্যাচের আরও অনেক পদোন্নতিবঞ্চিত মেধাবী কর্মকর্তাকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পদোন্নতি দেওয়া হয়; কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার আগেই অবসরে চলে যেতে হয়েছে তাদের। এ কারণে এসব কর্মকর্তা প্রশাসনে ন্যায়বিচার চেয়েছেন। সম্প্রতি পদোন্নতি ও পদায়নপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তারা পিআরএল স্থগিত করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় দেড় যুগের শাসনামলে একাধিকবার পদোন্নতি ও পদায়নবঞ্চিত মেধাবী কর্মকর্তাদের অনেকেই অর্থ, পরিকল্পনা, ভূমি, তথ্য কিংবা সংসদ সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাদের অনেকে সচিব বা গ্রেড-১ পদে পদোন্নতি পেয়ে পদায়ন পেলেও মাত্র দুই-তিন মাসের মাথায় অবসরের (পিআরএল) মুখে পড়েছেন। প্রশাসন পরিচালনায় তারা যোগ্যতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারছেন না। পদোন্নতি পেয়েও দায়িত্ব পালনের সুযোগ না পাওয়া তাদের জন্য বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আনোয়ার ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এমন ঘটনা বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর গভীর এক অসুখের ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনে ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ পদোন্নতির প্রধান মানদণ্ড হয়ে গেছে। এতে নীতিনিষ্ঠ কর্মকর্তারা বারবার উপেক্ষিত হচ্ছেন। ফলে প্রশাসনে মেধা ও নৈতিকতার সংকট তৈরি হয়েছে। যারা সারা জীবন যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের কর্মজীবনের শেষ সময়ে এমন বঞ্চনার ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষতিও বটে। তাই প্রশাসনে মনোবল ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তী সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের অভিজ্ঞতা হারানো মানে রাষ্ট্রীয় স্মৃতি হারানো। যারা বঞ্চনার পরও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা রেখেছেন, তাদের কাজে লাগালে রাষ্ট্রেরই লাভ। এসব কর্মকর্তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ শুধু মানবিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি প্রশাসনে এক ধরনের ‘প্রতীকী পুনর্বাসন’। এতে তরুণ কর্মকর্তারাও বার্তা পাবেন যে, সততার পথ শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি পায়।’
বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলছেন, পিআরএল স্থগিত করে তাদের অন্তত এক থেকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। এতে সরকার অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের পুনরায় কাজে লাগাতে পারবে। যা প্রশাসনের ধারাবাহিকতা ও নীতি বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। বর্তমান সরকার প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে ন্যায়নিষ্ঠ ও দক্ষ রাষ্ট্রযন্ত্র গঠন করতে চায়। সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারবেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব কর্মকর্তা প্রশাসনে মেধাবী ও যোগ্য হিসেবে পরিচিত। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে বিগত সরকার তাদের দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত রেখেছিল। বিষয়টি মানবিক ও প্রশাসনিক দুইদিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রণালয় চাইলে বিশেষ বিবেচনায় অবসরের পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারে। এজন্য প্রধান উপদেষ্টাকে দিকনির্দেশনা দিতে হবে। কারণ সরকারের হাতেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ রয়েছে।’
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, এই উদ্যোগটি যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে এটিই হতে পারে বঞ্চিত প্রশাসন সংস্কার প্রক্রিয়ার সূচনা। সরকার চাইলে বিশেষজ্ঞ এই কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সংস্কার কমিশন, নীতি বাস্তবায়ন টাস্কফোর্স কিংবা সরকারি প্রশিক্ষণ একাডেমিতে যুক্ত করতে পারে। দীর্ঘ বঞ্চনার পরও যারা রাষ্ট্রের সঙ্গে থেকে সেবা দিতে চান, তাদের কাজে না লাগানো রাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতিকর।