প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৫৫ পিএম
আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:৪৫ পিএম
মাংস আমদানি করে দেশের ক্ষতি করবো না বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, অনেক দেশ ৪-৫শ টাকা কেজিতে গরুর মাংস রপ্তানির কথা বলছে। তাদের মাংস আনলে আমাদের খামারিদের ক্ষতি হবে। তাই আমরা সেসব দেশ থেকে মাংস আমদানি করবো না।
বিএলআরআই'র ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক গবেষণা পর্যালোচনা কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বুধবার (২২ অক্টোবর) সকালে ঢাকার সাভারে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) ক্যাম্পাসে দুই দিনব্যাপী সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিএলআরআই'র মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন মন্ত্রণালয়টির সচিব আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের, বক্তব্য রাখেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ান প্রমুখ।
ফরিদা আখতার বলেন, গবেষণার বরাদ্দ না থাকা দেশের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি। কেননা আমাদের গবেষণার বাজেট ৫ কোটি থেকে ৩ কোটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। গবেষণার অর্থ না পেলে কীভাবে কাজ হবে? গবেষণার অর্থ বৃদ্ধির জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের যুক্ত করার আহ্বান জানান।
জলবায়ু পরিবর্তনে প্রাণিসম্পদ খাত নিয়ে গবেষণা সম্পর্কে তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোর গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ, গাড়িতে তেল পুড়ানোর কারণে তারা পরিবেশের ক্ষতি করছে। তারা এসব বন্ধ না করে বরং আমাদের গবাদি পশুর কারণে গ্রিন হাউজ গ্যাস বাড়ছে বলে অভিযোগ করছে।

ফরিদা আখতার বলেন, গরুর রোগ গোবরেও আসে। এটি নিয়ে কাজ করা দরকার। কেননা আমাদের নারীরা গোবর শুকিয়ে রান্নায় ব্যবহার করে। হাত দিয়ে গোবর ছিটানোসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করে। তিনি বলেন, আমরা মানুষ ও গবাদিপশুর স্বাস্থ্য আলাদা করতে পারবো না। এজন্য ওয়ানহেলথের কথা বলা হচ্ছে। গবাদিপশু থেকে মাংস ও গোবরের মাধ্যমে রোগ-বালাই ছড়িয়ে পড়ে। সেসব পশুর পরিচর্যাকারীরা এতে অনেক সময় আক্রান্ত হয়।
নেপিয়ার ঘাসের চাষাবাদ সম্পর্কে তিনি বলেন, খাবারের কারণে মাংসের দাম বেশি। অথচ নেপিয়ার ঘাস চাষ করে সেই খরচ কমানো যায়। তা ছাড়া অন্যান্য যেসব উপায়ে খাদ্যের দাম কমানো যাবে তা বের করতে হবে। খাদ্যের দাম কমানো গেলে মাংসের দাম কমানো যাবে।
তিনি বলেন, আমরা মাংস আমদানি করে দেশের ক্ষতি করতে পারবো না। অনেক দেশ অতিরিক্ত উৎপাদন করে ডাম্পিং করছে। সেজন্যই আমাদের কাছে কম দামে বিক্রি করতে চায়। আমরা আমদানির পথে যাবো না। নিজেদের জাত উন্নত করে মাংস, দুধ ও ডিমের উৎপাদন বাড়াবো।
ফরিদা আখতার বলেন, গরু, ছাগলের গোস্ত আমিষ জাতীয় খাবার। অথচ এসবের ফিড তৈরির জন্য ট্যানারির বর্জ্য বিক্রি ও ব্যবহার করা হয়। এসব নিয়ে যেসব কোম্পানি খাদ্য তৈরি করছে তাদেরকে বাজার থেকে তুলে দিতে হবে। কেননা এসবে সিসা, পারদসহ বি়ভিন্ন ধরনের ভারি ধাতুর উপস্থিতি রয়েছে। এসব ধাতু মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
তিনি বলেন, আমাদের মন্ত্রণালয়ের দুটি গবেষণা ইনস্টিটিউট রয়েছে। প্রথমটি মৎস্য ও দ্বিতীয়টি প্রাণিসম্পদ নিয়ে। এসব গবেষণাগুলোর ফলাফল মানুষের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আমরা কোন দূরত্ব চাই না। তা ছাড়া কোন বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজন হলে অধিদপ্তর ইনস্টিটিউটকে জানাতে পারে। সেই তালিকা অনুযায়ী তারা গবেষণা করে দিবে।
আবু তাহের মো. জাবের বলেন, প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে ভ্যাক্সিনেশনের গভীরতা আমরা উপলদ্ধি করতে পারি না। আমাদের খামার পর্যায়ে বর্জ্যব্যবস্থাপনার অভাবে প্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন এটি জবাই করে ফেলা হয়। সেটির মাংস খেয়ে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমের দাম বেশির কারণ হচ্ছে খাবারের দাম বেশি। আমি ৭ টি জেলা প্রশাসকের কাছে জমি বরাদ্দ দিতে আহ্বান জানিয়েছি। এক মাস চলে গেলেও কেউ যোগাযোগ করেনি।
তিনি প্রচারের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে বলেন, প্রচারের অভাবে আমরা অগ্রসর হতে পারছি না। বাজেট পাওয়ার জন্যও প্রচার দরকার। কিন্তু গবেষণাগুলো শুধু সিভি সমৃদ্ধ করতেই কাজ করছে।
শাকিলা ফারুক বলেন, আমরা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও আমিষে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারিনি। আমরা দেশীয় জাতগুলোকে গুরুত্ব দেব। পাশাপাশি বিদেশি জাত আনবো। কেননা অধিক উৎপাদনের জন্য বিদেশি জাত দরকার।
তিনি বলেন, দেশি জাতের সম্পদকে আরো যথাযথ খাদ্য ও পরিচর্যা করা দরকার। সে দিকে নজর দিতে হবে।
শাকিলা ফারুক বলেন, আমাদের প্রাণিগুলোর ক্ষেত্রে খাদ্য খরচ চলে যায় ৭০ শতাংশ। খাদ্যের খরচ কমানো গেলে আমরা কম দামে দুধ, মাংস ও ডিম পাবো।
তিনি আরও বলেন, ১৮ কোটি মানুষের জন্য দেশে বছরে ডিম উৎপাদন হয় মাত্র ৬ কোটি। এটি তিনগুণ বাড়াতে হবে।
কর্মশালায় উদ্বাধনী অনুষ্ঠানের পরে শুরু হয় কারিগরি সেশন। এবারের কর্মশালায় ছয়টি সেশনে সর্বমোট ৩৩টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রথম দিনে ‘অ্যানিম্যাল অ্যান্ড পোল্ট্রি ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস’ শীর্ষক প্রথম সেশনে ৬টি, ‘অ্যানিম্যাল অ্যান্ড পোল্ট্রি ডিজিজ অ্যান্ড হেলথ’ শীর্ষক দ্বিতীয় সেশনে ৬টি এবং ‘এনভায়রনমেন্ট, ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক তৃতীয় সেশনে ৫ টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হবে। কর্মশালার দ্বিতীয় দিনে ‘বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড ডেইরি রিসার্চ’ শীর্ষক চতুর্থ সেশনে ৬টি, ‘নিউট্রিশন, ফিডস অ্যান্ড ফিডিং ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক পঞ্চম সেশনে ৫ টি এবং ‘সোশিও-ইকোনোমিকস অ্যান্ড ফার্মিং সিস্টেম রিসার্চ’ শীর্ষক ষষ্ঠ ও সর্বশেষ সেশনে ৫টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হবে। প্রবন্ধ উপস্থাপনার পাশাপাশি কর্মশালায় বিএলআরআই এর চলমান বিভিন্ন গবেষণার উপর মোট ৬১ টি পোস্টারও প্রদর্শন করা হয়।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) বিশেষজ্ঞ সুপারিশ পর্যালোচনা ও সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দুই দিনব্যাপী চলমান ‘বার্ষিক গবেষণা পর্যালোচনা কর্মশালা-২০২৫ শেষ হবে।