ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, ঢাকা ও মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:৪৬ পিএম
পৃথিবীর অন্যতম বড় পাটকল ছিল আদমজী জুট মিলস। ২০০২ সালে মিলটির সব শ্রমিক-কর্মচারীকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় করার মধ্য দিয়ে দেশের শিল্প খাতের এক সুবর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। কালক্রমে খুলনা-যশোরের রাষ্ট্রায়ত্ত নামকরা পাটকলগুলোও একই পরিণতির শিকার হয়। একে একে থেমে যেতে থাকে এসব কারখানার সাইরেন। বেকারত্বের অভিশাপ নেমে আসে অসংখ্য শ্রমিকের জীবনে।
খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৯টি রাষ্ট্রীয় পাটকলের মধ্যে ছয়টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে লিজের মাধ্যমে। এর মধ্যে আবার দুটি মিলের মালিকানা নিয়েছে ভারতীয় কোম্পানি। বাকিগুলোও একই পথে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রীয় এসব মূল্যবান সম্পদ কি তাহলে এভাবেই ধীরে ধীরে হাতছাড়া হয়ে যেতে থাকবে?
একসময় বাংলাদেশ ছিল সোনালি আঁশের দেশ। পাট ছিল গৌরবের নাম, ছিল কৃষকের ভরসা আর রাষ্ট্রের কাছে রপ্তানির প্রধান উৎস। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই জৌলুস ঠাঁই নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়।
১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে খুলনা-যশোর অঞ্চলের বড় বড় পাটকল রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল কৃষকের জন্য পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। তবে দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় পাটকলগুলোকে লোকসান গুনতে হয় বছরের পর বছর। ২০২০ সালে সরকার একসঙ্গে ২৫টি রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধের ঘোষণা দেয়। এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় নতুন অধ্যায় লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) তথ্যমতে, খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৯টি পাটকলের মধ্যে ৬টি এখন বেসরকারি হাতে। দৌলতপুর জুট মিল লিজ নিয়েছে ফরচুন গ্রুপ, মাসিক ভাড়া ৯ লাখ টাকা। খালিশপুর জুট মিল গেছে রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের কাছে, মাসিক ২৬ লাখ টাকায়। আটরার ইস্টার্ণ জুট মিল ১০ লাখ টাকায় লিজ নিয়েছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আটলান্টিস। নওয়াপাড়ার কার্পেটিং জুট মিল ৭ লাখ টাকায় নিয়েছে আরেক ভারতীয় প্রতিষ্ঠান রিগ্যাল জুট। যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিজ (জেজেআই) ১৫ লাখ টাকায় নিয়েছে আকিজ গ্রুপ, নতুন নাম দিয়েছে আকিজ জুট পার্ক। ক্রিসেন্ট জুট মিলের ক্ষেত্রে মাহবুব এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে ৫০ লাখ টাকায় তিন বছরের চুক্তি হয়েছে; হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলছে। বাকি দুটি প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিল ও স্টার জুট মিল এখনও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ঝুলে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত চুক্তি হয়েছে যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিজ নিয়ে। ৮১ একর জমির মধ্যে ২৭ একর আকিজ গ্রুপ ২০২৩ সালের এপ্রিলে লিজ নেয়, মে মাসেই উৎপাদন শুরু করে। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী সরকার ভাড়া পাবে ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে। অর্থাৎ দুই বছর মিল চালু থেকেও সরকারের আয় শূন্য। স্থানীয়দের দাবি, এটি সরকারের জন্য সরাসরি ক্ষতির উদাহরণ।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা
একসময় মিলগুলোতে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হতো। এখন সেখানে রয়েছে মাত্র কয়েকশ। জাতীয়তাবাদী পাট শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শমসের আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এটি আসলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখলের কৌশল। অচিরেই লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে এসব জমিজিরেত অন্য কাজে ব্যবহার করা হবে। লিজ নেওয়ার পর অনেক জায়গায় গাছপালা কেটে বিক্রি করা হচ্ছে।
বিজেএমসির আঞ্চলিক সমন্বয়কারী গোলাম রব্বানী জানান, দৌলতপুর জুট মিলে বর্তমানে কাজ করছে মাত্র ১৩৮ শ্রমিক। অথচ তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন ৬০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। ফলে কর্মসংস্থান বাড়ছে না, বরং কমছে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দখল নিয়ে উদ্বেগ
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় দুটি পাটকল এখন বিদেশি অর্থাৎ ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে। আটরার ইস্টার্ণ জুট মিল চালাচ্ছে আটলান্টিস, আর নওয়াপাড়ার কার্পেটিং জুট মিল গেছে রিগ্যাল জুটের কাছে। স্থানীয় নাগরিক সমাজের আশঙ্কা, জমিগুলো শিল্পকারখানা ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পাটকল মানে শুধু ইতিহাস নয়। লিজের নামে যদি রাষ্ট্রীয় সম্পদ হাতছাড়া হয়, ক্ষতির দায় বহন করবে পুরো দেশ। পাট শিল্পের এই ধস কেবল শিল্প নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
খুলনার ব্যবসায়ীরা বলছেন, লিজের নামে মাসিক ভাড়া সামান্য হলেও জমির মূল্য অগাধ। ভবিষ্যতে এসব জমি অন্য খাতে ব্যবহার করা হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হবে। স্বল্পমেয়াদে বেসরকারি খাতে উৎপাদন বাড়তে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় মালিকানার ঐতিহ্য হারালে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি অনেক বেশি। শিল্প পুনরুদ্ধারের বদলে জমি বাণিজ্যিক কাজে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। পাটচাষি এখন পাটের দাম পেতে হিমশিম খাচ্ছে।
খুলনার ডুমুরিয়ার কৃষক আলমগীর হোসেন বলেন, আগে সরকারি পাটকল থেকে পাটের দাম ভালো পেতাম। এখন মিল বন্ধ, ক্রেতা কম। আমাদের লাভ নেই, বরং ক্ষতি।
শিল্পের ইতিহাস হারানোর আশঙ্কা
১৯৫০ সালের শুরুর দিকে আদমজী গ্রুপের প্রতিষ্ঠিত আদমজী জুট মিলস বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত ছিল লাভজনক প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতার পর আদমজীসহ আরও প্রায় ৮২টি বেসরকারি পাটকলকে জাতীয়করণ করে সেগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য ১৯৭৪ সালে বিজেএমসি গঠন করা হয়। শুরু থেকেই এই পাটকলগুলো চরম অব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে থাকে। একসময় দেশের শিল্প ইতিহাসে যে আদমজী জুট মিলের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা ছিল, সেটি বন্ধ হওয়ার পর খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিল ছিল দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় পাটকল। এখন সেটিও যাচ্ছে বেসরকারি হাতে। শ্রমিকদের দাবি, রাষ্ট্রীয় মালিকানার মিলগুলো দ্রুত পুনরায় চালু করতে হবে এবং লিজ বাতিল করতে হবে। ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে তারা ইতোমধ্যে এই দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, এই গতিতে চলতে থাকলে ‘রাষ্ট্রীয় পাট শিল্প’ বলতে কিছুই থাকবে না; থাকবে শুধু লিজ চুক্তির কাগজপত্র আর স্মৃতিচিহ্ন।
সরকার বলছে, লোকসান রোধে ও উৎপাদন সচল রাখতে বেসরকারি ব্যবস্থাপনা জরুরি। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শ্রমিক হারাচ্ছে চাকরি, সরকারের আয় কমছে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বাড়ছে। যদি লিজের শর্ত কঠোর না হয়, তাহলে একসময় এসব জমি শিল্প থেকে সরে গিয়ে রিয়েল এস্টেট বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাট বাংলাদেশের সংস্কৃতি, কৃষি ও শিল্প- তিন ক্ষেত্রেই গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলো শুধু উৎপাদনকেন্দ্র নয়, ইতিহাস ও মানুষের জীবনের অংশ। আজ যখন একে একে লিজে চলে যাচ্ছে এই শিল্পের দুর্গগুলো, তখন প্রশ্ন জাগে- সোনালি আঁশের সেই গৌরব কি ফিরবে কখনও? যদি পরিকল্পনা ছাড়া এই লিজনীতি চলতে থাকে, তবে হয়তো ইতিহাসের পাতায় ‘পাটকল’ শব্দটি কেবলই স্মৃতি হয়ে থাকবে। একসময় এইখানে ছিল বাংলাদেশের গর্ব, সোনালি আঁশের স্বপ্ন।