ঐকমত্য কমিশন
দীপক দেব
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি তথা গণভোটের বিষয় নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ। তবে বৈঠকে দল দুটি গণভোট নিয়ে এখনও আগের অবস্থানের কথাই পুনর্ব্যক্ত করছে। অবশ্য কমিশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দলগুলো নিজেদের অবস্থানে কিছুটা নমনীয় আচরণ প্রদর্শন করেছে এবং ধীরে হলেও অগ্রগতি হচ্ছে।
গতকাল রবিবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে কমিশনের কার্যালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ। এরপর বিকালে একই জায়গায় জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক হয় তার।
বৈঠকের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে কমিশনের সদস্যরা জানান, প্রধান উপদেষ্টা দেশে ফিরে এলে সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ উপস্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে দলগুলোর কাছেও জুলাই বাস্তবায়ন পদ্ধতির খসড়া পাঠানো হবে। আগামী ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হবে। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এ অনুষ্ঠান করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ও এই আয়োজনে যুক্ত থাকবে।
গত বুধবার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে তৃতীয় ধাপে পঞ্চম দিনের আলোচনার মধ্য দিয়ে সংলাপ শেষ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। গণভোটের বিষয়ে দলগুলো একমত হলেও ভোটের দিনক্ষণ নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বিএনপিসহ বেশিরভাগ দল জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট দেওয়ার পক্ষে মতামত দেয়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকটি দল জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট চেয়েছে। বিষয়টির সুরাহা করতে কমিশন বিএনপি, জামায়াত, এনসিপির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার ও গতকাল রবিবার তিনটি দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন কমিশনের সদস্যরা।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে আর বৈঠক করা হবে নাÑ এ কথা জানানোর পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবারের মতো গতকাল রবিবারও বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ড. আলী রীয়াজ। সেখানে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে কেন করতে হবে, তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। এরপর বিকাল ৫টার দিকে আলোচনা হয় জামায়াত নেতাদের সঙ্গে। দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নেতৃত্বে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ ও ব্যারিস্টার শিশির মনির আলোচনায় অংশ নেন। অন্যদিকে কমিশনের পক্ষ থেকে আলোচনায় অংশ নেন আলী রীয়াজ ছাড়াও কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার।
বৈঠকে জামায়াতের পক্ষ থেকে গণভোট আগে করার বিষয়ে নিজেদের যুক্তি তুলে ধরে একটি প্যাকেজে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা জানানো হয়েছে। কমিশন তাদের যুক্তি শুনেছে। এর আগের দিন জামায়াতের নেতাদের পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা করেন অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ।
জানতে চাইলে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা তাদের মতো করে মতামত দিয়েছেন। আমরা তাদের বক্তব্য শুনেছি। সেগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করা হবে।’ আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অগ্রগতি তো হচ্ছেই। দলগুলো তাদের অবস্থান থেকে নমনীয় আচরণ করছে। সেই হিসেবে অগ্রগতি হচ্ছে, তবে ধীরগতিতে। আশা করি দলগুলো একটা জায়গায় আসবে।’ প্রধান উপদেষ্টা দেশে ফেরার পর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতির প্রস্তাব জমা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪ক বিলুপ্তির পক্ষে অধিকাংশ দল : সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি প্রদর্শন-সংক্রান্ত সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪ক বিলুপ্তির প্রস্তাব ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করার কথা জানিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে চাওয়া মতামতের বিষয়ে সাড়া দিয়েছে অধিকাংশ দল। সংলাপে অংশ নেওয়া ৩০টি দলের মধ্যে বিএনপি জামায়াত এনসিপিসহ প্রায় ২৬টি দল মতামত দিয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ দল বিলুপ্তির পক্ষে নিজেদের মতামত দিয়েছে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
কমিশনের একটি সূত্র জানায়, এই বিষয়ে দুই-তৃতীয়াংশ দল যেদিকে মতামত দেবে, সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবে কমিশন। যদিও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ তাদের মতামতে বলেছে, এই প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে সনদ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। গতকাল রবিবার ঐকমত্য কমিশনের কাছে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে এ অবস্থান তুলে ধরে বলা হয়, কমিশন যদি এই প্রস্তাব থেকে সরে না আসে, তাহলে অনেক দলের পক্ষে সনদে স্বাক্ষর করা হয়তো ‘অসম্ভব’ হয়ে পড়বে। বাসদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় কমিশন জানিয়েছিল, জাতীয় সনদে আর কোনো পরিবর্তন গ্রহণ করা হবে না। এখন কমিশনের নতুন এই প্রস্তাব ‘কমিশনের পূর্বেকার সিদ্ধান্তের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’
এ ছাড়া আ স ম আবদুর রবের দল জেএসডিও ধারাটি সম্পূর্ণ বিলোপের পরিবর্তে ইতিহাসভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সংশোধনের পক্ষে মতামত তুলে ধরেছে।