দুখুমের দুঃখগাথা
আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৩৭ পিএম
‘আদরের ছেলে রেখে চলে যাচ্ছি প্রবাসে’-২৩ আগস্ট ওমানের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার আগে এভাবেই নিজের কষ্টের কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন সন্দ্বীপের মোশাররফ হোসেন রনি। দেড় মাসের মাথায় ছেলেকে রেখে পৃথিবী ছেড়েই চলে গেলেন তিনি। গত বুধবার দুপুরে ওমানের দুখুমে মাছ ধরে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন রনি।
একই দুর্ঘটনায় আরও সাত বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাদের সবার বাড়ি চট্টগ্রামে। এর মধ্যে সাতজনের বাড়ি সন্দ্বীপে, অন্যজন রাউজানের বাসিন্দা। নিহতরা হলেন- সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের আমিন মাঝি, মো. আরজু, মো. রকি, সাহাব উদ্দিন ও মো. বাবলু, মাইটভাঙা ইউনিয়নের মো. জুয়েল, পৌর এলাকার মোশাররফ হোসেন রনি এবং রাউজানের মো. আলাউদ্দিন। একসঙ্গে এত প্রবাসীর মৃত্যুতে শোকের জনপদে পরিণত হয়েছে সন্দ্বীপ। তবে এমন অভিজ্ঞতা সন্দ্বীপের মানুষের কাছে এবারই প্রথম না। এর আগে ২০২১ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছিলেন। তারাও মাছ ধরে ফেরার পথে দুখুমে দুর্ঘটনার শিকার হন। সেবারও নিহত সবাই ছিলেন সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের বাসিন্দা।
কেন বারবার এমনটা হচ্ছে- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল দুখুমে বাংলাদেশিদের চরম এক দুঃখগাথার গল্প। দুখুম হলো- ওমানের মাস্কট শহর থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে দুর্গম মরু এলাকা। সেখান থেকে অনেকে আরব সাগরে মাছ ধরতে যান। সাধারণত ওমানের নাগরিক ছাড়া কারও সাগরে মাছ ধরার অনুমতি নেই। তবে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ভিসায় ওমানে গিয়ে কোনো কাজ না পেয়ে অবৈধভাবে মাছ ধরতে যান অনেকে। যাদের নির্দিষ্ট বেতন থাকে না। মাছ ধরার ওপর একটা কমিশন পান। অন্যদিকে পুরো সময়ে অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক নিয়েই কাটে তাদের জীবন। মাঝে মাঝে গ্রেপ্তারও হতে হয়। ওই এলাকার সড়কগুলোও এক লেনের। সরু এক লেনের সড়কে দুদিক থেকে গাড়ি চলে। বিশেষ করে মাছবাহী গাড়িগুলো একটু বড় ও বেপরোয়া গতির থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেসব গাড়ির সঙ্গেই যাত্রীবাহী গাড়ির সংঘর্ষ হয়। গত বুধবারের দুর্ঘটনাটি ছিল তেমনই। একটি মাছবাহী গাড়ির ধাক্কায় মাছ ধরে ফেরা প্রবাসীদের গাড়িটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
ওমানে কাজ করা প্রবাসী রাজিব খান জানান, সাধারণত দুখুমে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ, নোয়াখালীর হাতিয়া ও ভোলার মানুষজন বেশি কাজ করে। সন্দ্বীপের যারা আছে, তাদের বেশিরভাগ আবার সারিকাইতের বাসিন্দা। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ইব্রাহীম খলিল নামে আরেক প্রবাসী বলেন, দুখুম জায়গাটা অনেক প্রত্যন্ত মরুভূমি। কাজ না পেয়ে অবৈধভাবে মাছ ধরতে সাগরে যায় লোকজন। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে একবার আমি মাটি খুঁড়ে গর্ত করে সেখানে সারা রাত ছিলাম। ওখানে যারা কাজ করে, একদম বাধ্য হয়েই করে। এর মধ্যে নানামুখী চাপ, দ্রুত সরে যাওয়ার তাড়া থাকে। ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।
মো. আমিন খান নকিব নামে একজনের গল্প আরও করুন। সাড়ে ৩ লাখ টাকা খরচ করে ওমান গিয়ে কাজ না পেয়ে দুখুমে মাছ ধরেন তিন মাস। ওই তিন মাসে তিনি আয় করেছিলেন ২০ হাজার টাকার মতো। তবে শেষ পর্যন্ত ওমান রয়েল পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এক দিন জেল খাটেন। ওই মামলায় তার খরচ হয়েছে ১ লাখ টাকার মতো। দুই বছর পর যখন ভিসা নবায়ন করতে যান, তখন ওই মামলার কারণে ভিসা নবায়ন না করেই তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। নকিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নানামুখী হয়রানির শিকার প্রবাসীদের সমস্যাগুলোর বিষয়ে দূতাবাস আন্তরিক নয়। তারা কাউন্সেলিংও করেন না। আবার বিপদেও তাদের খুব বেশি পাওয়া যায় না।
তবে এবারের দুর্ঘটনায় ওমানে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা অবশ্য ভিন্ন। ঘটনায় ১ ঘণ্টার মধ্যেই দূতাবাসের প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে যান। দূতাবাসের পক্ষ থেকে এই বিষয়টির দেখভাল করছেন- এমন এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে প্রতিদিনের বাংলাদেশের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, নিহতদের একেক জনকে একেক হাসপাতালে রাখা হয়েছে। এক হাসপাতাল থেকে আরেকটার দূরত্ব ১০০-১৫০ কিলোমিটার। তবে একটা সুবিধা হলো নিহত সবারই স্পন্সর একই ব্যক্তি। আমরা স্পন্সর ও রয়েল পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি। পুলিশ বলেছে, রবিবার তারা তদন্ত প্রতিবেদন দেবে। প্রতিবেদনের পর স্পন্সর ও সরকারি খরচে লাশগুলো দেশে পাঠানো হবে। সব ঠিকঠাক থাকলে ১৫ অক্টোবর লাশগুলো দেশে পাঠানো যাবে বলে আশা রাখছি।
ওই কর্মকর্তা জানান, নিহত আটজনের মধ্যে শুধু একজনের ইন্স্যুরেন্স ছিল। তিনি এক-দুই মাসের মধ্যে ৫ হাজার ওমানি রিয়েল (প্রায় ১৬ লাখ টাকা) ক্ষতিপূরণ পাবেন। এখানকার আইনে আছে, গাড়ির ইন্স্যুরেন্সের কারণে যাত্রী যে-ই হোক না কেন, আইনি প্রক্রিয়ায় জয়ী হলে প্রতি যাত্রী ১৫ হাজার রিয়েল ক্ষতিপূরণ পাবে। এই ঘটনার বিষয়ে যা জেনেছি, তাতে এই ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে। এজন্য চার ধাপে আইনি লড়াই করতে হবে। নিহতের পরিবারের সদস্যদের দূতাবাসকে (কোনো ব্যক্তি নয়) পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিতে হবে। তারপর দূতাবাস আইনজীবী নিয়োগ দেবে। এটি সম্পন্ন হতে দেড়-দুই বছর লাগে।