ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:১০ এএম
খুলনার দাকোপ উপজেলার মুহিবুর রহমানের পারিবারিক চাষাবাদের জমি এখন লবণাক্ত। কৈশোর থেকে আজ বৃদ্ধ বয়সে হাজারো স্মৃতি ভেসে ওঠে হৃদয়পটে। শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা এখনও স্পষ্ট মনে আছে মুহিবুর রহমানের। পশুর নদীর পানি দিয়ে একসময় আবাদ করা হতো তাদের জমিতে নানা রকম ফসল আর শাকসবজি। ধান, গম, আলু, শসা, বেগুন, ঢেঁড়স, ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ বিভিন্ন ফসলে ভরে উঠত তাদের ক্ষেত আর বাড়ির উঠান। ফসল বিক্রি করে পরিবারের যাবতীয় চাহিদা পূরণ করে প্রতিবেশীদের মাঝেমধ্যে ধার-কর্জও দিতেন। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই খুলনার দাকোপ উপজেলার মুহিবুর রহমানের। কারণ তাদের পারিবারিক চাষাবাদের সব জমিজমাই এখন লবণাক্ত। এখন তিনি নিজেই কর্জের জন্য পরিচিতদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়ান। শুধু তার নয়, বলতে গেলে খুলনা উপকূলের সব কৃষকেরই এখন এই দশা। চলতি বছরের শুরুর দিকে খুলনা ও বাগেরহাটে সরেজমিন অনুসন্ধানের সময় জানা যায় এই নির্মম সত্য।
সত্তরের দশকে এসএসসি পাস করা মুহিবুর রহমান নিয়মিত সংবাদপত্র পড়েন। দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন খবরও তার চোখ এড়ায় না। তিনি বলেন, 'এসব অঞ্চলে চিংড়িঘের তৈরি, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের আগ্রাসন ও মানুষের পরিবেশবিরোধী নানা কারণে দিন দিন তাদের জমিগুলো অনুর্বর হয়ে পড়ছে। প্রত্যেক কৃষকের মাথায় এনজিওদের ঋণের বোঝা। নতুন করে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু ঋণের তাণ্ডব।' তার মতে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত। তাদেরই যেখানে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা, সেখানে উল্টো তাদের কাঁধেই চেপে বসছে ঋণের বোঝা। মুহিবুর রহমান বলেন, 'এই ঋণ সরাসরি শোধ করতে হয় না বটে, কিন্তু কোনো না কোনোভাবে তো আমাদের কাছ থেকেই নেওয়া হবে।'
প্রায় একই ধরনের কথা বলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সবিতা রানী দাস। সাগরে ও সুন্দরবনে মাছ ও চিংড়ির পোনা ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। সবিতা রানী বলেন, 'জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আমাদের বাড়িঘর হারাতে হয়। স্থলের দিক থেকে ধরতে গেলে সুন্দরবনে যেতে সবশেষ অঞ্চলটি আমাদের। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। অথচ আমরা কোনো ক্ষতিপূরণ পাই না।'
মারাত্মক অর্থায়নের অভাব জলবায়ু সহনশীলতা অর্জনের পথে
বিভিন্ন গবেষণাকর্মেও উঠে আসছে একই সত্য। সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ' বাংলাদেশের জলবায়ু ঋণের পরিস্থিতি নিয়ে 'ক্লাইমেট ডেট রিস্ক ইনডেক্স (সিডিআরআই-২০২৫)' শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান পরিচালিত ও সম্পাদিত এই গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের মাত্র ০.৫ শতাংশের জন্য দায়ী হলেও এখানকার প্রত্যেক ব্যক্তির জলবায়ু ঋণ ৭৯.৬ মার্কিন ডলার; যা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে ঋণের বোঝায় শীর্ষে রয়েছে। বাংলাদেশের ঋণ-অনুদান অনুপাত ২.৭: ১ ডলার; যা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) তুলনায় প্রায় চারগুণ ০.৭ বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক (এমডিবি) থেকে গৃহীত ঋণের অনুপাত শূন্য দশমিক ৯৪; যা বৈশ্বিক গড় শূন্য দশমিক ১৯-এর পাঁচগুণ বেশি। বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন খাতে বিনিয়োগ অনুপাত মাত্র শূন্য দশমিক ৪২; যা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গড় অনুপাতের অর্ধেকেরও কম। এসব কারণে জলবায়ু সহনশীলতা অর্জনের প্রচেষ্টা মারাত্মকভাবে অর্থায়নের অভাবে পড়ছে।
অর্থায়নের ৭০ শতাংশেরও বেশি আসছে ঋণ হিসেবে
গবেষণায় উঠে এসেছে, প্যারিস চুক্তিতে 'ক্ষতিপূরণ' হিসেবে প্রতিশ্রুত আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের উদ্যোগ বরং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে 'জলবায়ু ঋণের ফাঁদে' ফেলছে। কারণ জলবায়ু অর্থায়নের ৭০ শতাংশেরও বেশি আসছে ঋণ হিসেবে। তাতে সংকটাপন্ন দেশগুলো দ্বিমুখী ক্ষতির মুখে পড়ছে। একদিকে এসব দেশ প্রতিনিয়ত জলবায়ুঘটিত বিপর্যয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে ঋণের ক্রমবর্ধমান কিস্তি পরিশোধে দ্বিতীয়বার ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ২০০০ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে ১৩ কোটিরও বেশি মানুষ ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৩৬০ কোটি মার্কিন ডলার। এমন ক্ষতির পরও জলবায়ু অভিযোজন খাতে সহায়তা খুবই কম। আবার দেশের পরিবারগুলো স্ব-অর্থায়নে জলবায়ুঘটিত বিপর্যয় থেকে সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রতি বছর মাথাপিছু গড়ে ১০ হাজার ৭০০ টাকা (প্রায় ৮৮ মার্কিন ডলার) ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে এক্ষেত্রে ব্যয়িত বার্ষিক অর্থের পরিমাণ ১৭০ কোটি মার্কিন ডলার।
সিডিআরআই-২০২৫ সূচকে ৫৫টি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে গবেষণা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ১৩টি দেশ অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে, ৩৪টি দেশ উচ্চ ঝুঁকিতে এবং ৮টি দেশ মাঝারি/কম ঝুঁকিতে রয়েছে। সব স্বল্পোন্নত দেশে জলবায়ু অর্থায়নের ৭০ শতাংশের বেশি ঋণ হিসেবে আসে, যা প্যারিস চুক্তির 'দূষণকারীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়' (পলিউটারস পে প্রিন্সিপাল) নীতি এবং জলবায়ু ক্ষতিপূরণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) ২০২৫ সালের রায়ের সরাসরি লঙ্ঘন। কপ-৩০ সম্মেলনে এই সূচকে বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক চিত্রসহ পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক সংস্করণ প্রকাশ করা হবে।
২৯.৫২ ডলার ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ
এ গবেষণায় বলা হয়েছে, অনুদানের বদলে ঋণ দেওয়া 'পলিউটারস পে প্রিন্সিপাল' নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাতে বলা হয়, বর্তমানে প্রতি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের জন্য বাংলাদেশকে ২৯.৫২ মার্কিন ডলার ঋণ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
ঋণের টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানিতে ব্যয় হয়েছে ৫৪.৪৭ শতাংশ। এ ছাড়া পরিবেশগত সংরক্ষণে ১৩.২৮ শতাংশ, ডিজাস্টার প্রিপারেশন অ্যান্ড প্রিপেয়ার্ডনেসে ২.২৭, পপুলেশনে ০.০১, মাল্টি সেক্টরে ৪.৩৩, ইন্ডাস্ট্রিতে ০.০১, ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড স্টোরেজে ৯.১৮, হেলথে ০.০৪, ওয়াটার সাপ্লাই ১১.৩৮, এফোলো ২.৭৭ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ২.২৭ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছে। অর্থায়নের নামে প্রতারণা সম্পর্কে গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের জন্য রিপোর্টকৃত 'জলবায়ু' অর্থায়নের ১৮.৮৪ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে ভুলভাবে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। এই প্রকল্পগুলোতে ঋণ-অনুদান অনুপাত ২৮.৮। অর্থাৎ বাংলাদেশের সামগ্রিক ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে প্রকৃত জলবায়ু সমাধানকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।
'ঋণের টাকা দ্বিগুণ আকারে পরিশোধ করতে হবে'
ক্ষতিপূরণ আদায়ের বদলে রাষ্ট্র কেন ঋণ নিচ্ছে-এমন প্রশ্ন করা হলে গবেষক এম জাকির হোসেন খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, 'এর মূল কারণ অবৈধ সুযোগ-সুবিধা অর্জন। আমাদের এই গবেষণা ২০০০ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ঋণের তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে।' তিনি বলেন, 'দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এসব ঋণের অর্থ কিন্তু পরিশোধ করতে হবে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে। কেননা এসব ঋণের বেশিরভাগই দেখানো হয়েছে দেশের সমুদ্র উপকূল ও নদীর চর তথা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য। এসব ঋণের টাকা দ্বিগুণ আকারে পরিশোধ করতে হবে।'
'ফেনীর বন্যার জন্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া সম্ভব ছিল'
ইমেরিটাস অধ্যাপক ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং টেকসই উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ও পানি-পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, 'আমরা যখন বলছি কার্বন ডাই-অক্সাইড কমাও, তেলের ব্যবহার কমাও, তখন সৌদি আরবসহ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো বলছে, তোমরা তেলের ব্যবহার কমালে আমরা গরিব হয়ে যাব। সেজন্য আমাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এর নাম হচ্ছে রেসপন্স মেকানিজম।' তিনি বলেন, 'লস অ্যান্ড ড্যামেজের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অলীক স্বপ্ন বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে বিরুপ প্রতিক্রিয়া মোকাবিলার লক্ষ্যে কাজ করা উচিত।'
ড. আইনুন নিশাত বলেন, 'এখন পর্যন্ত লস অ্যান্ড ড্যামেজকে কোনো সংজ্ঞায় নির্ধারণ করা হয়নি। কপ-২৮-এ দুবাইয়ের পরিবেশমন্ত্রী বলেছিলেন, বাংলাদেশকে ১০০ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হবে। যদিও প্রয়োজন হচ্ছে ১০০ ট্রিলিয়ন। তা ছাড়া কবে কোথায় এ অর্থ দেওয়া হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হচ্ছে না।' তিনি বলেন, '৩২ বছর ধরে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ বলে আসছে ক্ষতিপূরণ দেবে। কিন্তু আজও দেয়নি। আবার গত বছর যখন ফেনীতে বন্যা হলো, তখন তার ক্ষতিপূরণের জন্য যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে পর্যাপ্ত টাকা পাওয়া যেত। এ টাকা আসবে গ্রিন ফান্ড থেকে। কিন্তু আবেদনই করা হয়নি। যোগ্যতা না থাকাও আমাদের ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অন্যতম কারণ।'