প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৫৪ পিএম
ফাইল ফটো
একটি জেলে কার্ডের জন্য জনপ্রতিনিধিদের কাছে বিগত ৬-৭ বছর যাবত ঘুরছেন সনজিনা বেগম। কিন্তু ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েনি। সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর ইউনিয়নের ভাটি জামালগড় গ্রামের সিরাজুল হকের স্ত্রী সনজিনা নিজে হাওরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্বামী অসুস্থ ও অচল। ৩ সন্তানের মধ্যে একটি প্রতিবন্ধী। সকালে বাড়ি থেকে মাছ ধরতে বের হন, বিকালে সেই মাছ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে যে টাকা পান তা দিয়েই চলে ৫ জনের সংসার।
গত বুধবার প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে টেলিফোনে তিনি বলেন, আমার স্বামীর বিরাট সমস্যা, খাম (কাজ) করতে পারে না। ১৬ বছর বয়সি ছেলেও অসুস্থ (প্রতিবন্ধী)। ট্যাকার লাইগ্যা চিকিৎসা করাইতে পারি না।
সনজিনা বেগম বলেন, দিনে ২ থেকে আড়াইশ টাকার মাছ পান। কোনোদিন আরও কম। একটি জেলে কার্ডের জন্য ১০ বছর ঘুরেও পাননি।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে সেমিনারে অংশ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন দেশের উপকূলীয় সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানার ৭নং মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ কদমতলা গ্রামের সবিতা রানী মণ্ডল। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ১০ বছর আগে জেলে কার্ড পেলেও চাল পেয়েছেন মাত্র দুইবার। তাদের অঞ্চলে শতকরা ২ শতাংশ নারীও পাওয়া যাবে না কার্ডধারী। সবিতা রানীর ভাষ্যমতে, পানিতে দীর্ঘসময় থাকায় গায়ে খোসপাঁচড়া হয়। এ সময় সবিতা রানী তার হাতে খোসপাঁচড়ার চিহ্ন দেখিয়ে বলেন, চিকিৎসা করালে কয়েক দিন ভালো থাকে। পরে আবার শুরু হয়। তা ছাড়া পানিতে দীর্ঘসময় থাকার কারণে জরায়ু সমস্যায় পড়েন।
একই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন চাঁদপুরের শাহানাজ আক্তার, কুয়াকাটা থেকে এসেছিলেন শাহিনুর আরা ও ফরিদা আক্তার। তারা জানান, মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করলেও তারা জেলে কার্ড বা সরকারি কোনো ভিজিএফ কার্ড পান না।
জাগো নারী ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে করা ‘ভালনারেবিলিটিস অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড এ স্টাডি অন ওম্যান ফিশার ফল্ক ইন বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়, এসব অঞ্চলের নারীদের মধ্যে ১১.৮ শতাংশ শুঁটকি পল্লীতে কাজ করেন। ৭৩.২ শতাংশ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। মান্তা সম্প্রদায়ের ৫.৯ শতাংশ নৌকা দিয়ে মাছ ধরেন। ঘেরে চিংড়িসহ অন্যান্য মাছ ধরার কাজে যুক্ত থাকেন রাখাইন সম্প্রদায়ের ৪.৯ শতাংশ এবং জাল বুননের কাজে যুক্ত ৪.২ শতাংশ নারী।
গবেষণায় নারী জেলেদের শ্রমের মজুরি সম্পর্কে বলা হয়েছে, শুঁটকি পল্লীতে দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করা হয়। পুরুষরা মজুরি পান ৭০০ ও নারীরা ৩০০ টাকা। জাল বুননে পুরুষরা মজুরি পান ৮০০ ও নারীরা ৩০০ টাকা। মাছের আড়তে পুরুষরা মজুরি পান ৮০০ ও নারীরা ৪০০ টাকা। নদীতে মাছ ধরার শ্রমিক হিসেবে পুরুষরা মজুরি পান ৭০০ ও নারীরা ৩০০ টাকা।
পটুয়াখালী থেকে ঢাকায় আসা এক নারী জেলে শেফালি আক্তার বলেন, গত ১৫ বছরে ৪ বার তাদের বাড়িঘর নদী ভেঙে নিয়ে গেছে। কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা ও জেলে কার্ড তাদের ভাগ্যে জুটেনি। তিনি বলেন, ‘আমাদের জীবন কাটে অভাব-অনটন আর বঞ্চনায়। আমাদের দেখারও কেউ নেই। শুধু কিছু এনজিও আমাদের নিয়ে উঠান বৈঠক করে। কিছু বুদ্ধি পরামর্শ দেয়। কোনো কোনো এনজিও ওষুধপত্র দেয়। তাই সুদে ঋণ করা ছাড়া কোনো গতি নেই।’
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘আমি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জয়েন করার পর থেকে কোনো নারী জেলে কার্ডের জন্য আসেনি। তা ছাড়া আমাদের হাওরের জেলেদের জন্য সরকারি কোনো প্রণোদনা, বিশেষ বরাদ্দ নেই। আমরা শুনতে পাচ্ছি, ইলিশের ডিম পাড়া মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ থাকে, হাওরেও সেই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তখন হয়তো বরাদ্দ পাওয়া যাবে।’
সম্প্রতি নারী জেলেদের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছিলেন, ইতঃপূর্বে পুরুষদের কথা চিন্তা করে মৎস্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এ অবস্থায় আমরা ২০২৫ সালে আইনের একটি খসড়া তৈরি করেছি। সেখানে নারী জেলেদের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, বলতে গেলে তালিকায় নারীদের নামই নেই। স্বীকৃতি নেই। তাই আমরা নারী জেলেদের কার্ড, সামাজিক নিরাপত্তাবলয় বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছি।