ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৪২ এএম
দেশে বছরে যে পরিমাণ ফল উৎপাদিত হয় তার বেশিরভাগ অংশই ক্যালসিয়াম কার্বাইড ও ইথেফোন দিয়ে পাকানো হয়। এতে ফলের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় না। এসব কেমিক্যাল ব্যবহারে বিভিন্ন ধরনের রোগ দেহে বাসা বাঁধে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ইথিলিন স্প্রে করে ফল পাকাতে নতুন একটি চেম্বার উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)। আর এই নতুন উদ্ভাবন নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাখবে কার্যকরী ভূমিকা। গবেষণার আলোকে চেম্বার তৈরি করে সেখানে ইথিলিন গ্যাস স্প্রে করে পরিপুষ্ট ফল পাকানোর পদ্ধতিটি বর্তমানে দুটি জেলায় স্থাপন করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে রাজশাহী জেলার গোদাগারী ও নরসিংদী জেলার মনোহরদীতে। প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যাশা দেশে বছরে যে পরিমাণ ক্যালসিয়াম কার্বাইড আমদানি হয় তাদের চেম্বার ব্যবহার করলে তাতে বিপুল বৈদেশিক অর্থ সাশ্রয়ের সঙ্গে রোগবালাই কমবে।
বারির সহযোগিতায় রাজশাহী জেলার গোদাগারীতে একটি চেম্বার স্থাপন করেছেন ইমাম হোসেন। তিনি বলেন, রাজশাহীতে প্রচুর টমেটো, আম ও মাল্টা উৎপাদন হয়। বেশিরভাগ অঞ্চলে রাইফেন, ইটিপ্লাসসহ বিভিন্ন স্প্রে দিয়ে ফল পাকানো হয়। আমাদের চেম্বারটি দিয়ে পরিপুষ্ট ফল- আম, কলা, মাল্টা এবং টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি পাকানো যায়। এতে ফলের স্বাদ সম্পূর্ণ অক্ষত থাকে। এতে পাকানো ফল আর গাছে পাকানো ফলে প্রায় একই ধরনের স্বাদ বিদ্যমান থাকে।
তিনি বলেন, এই চেম্বারে ১২০ ক্যারেটের মতো টমেটো রাখা যায়। প্রতি ক্যারেটে ২০ কেজি করে ৬০ মণের মতো। পাকানোর জন্য ইথিলিন গ্যাস ও বিদ্যুৎ খরচ হয়। এখন ফল পাকাতে বিদ্যুৎ খরচ হয় ২ হাজার টাকা ও গ্যাস সরকারিভাবে দেওয়া হচ্ছে। আমরা স্প্রে করে আম, টমেটোসহ অন্যান্য ফল পাকানো বন্ধ করতে পারলে এই চেম্বারের ব্যবহার বাড়বে। আমরা একটা মাল্টা পাকাতে সময় নিচ্ছি ৩-৫ দিন। অথচ সেটি স্প্রে করে দু-এক দিনের মধ্যে পাকানো হচ্ছে। এসব স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। কলা পাকাতে ২ দিন, আম ৩ দিনের মধ্যে থেকে যায়।
নরসিংদী জেলার মনোহরদীতে চেম্বার স্থাপন করেছেন শামীম দেওয়ান। তিনি জানান, গ্রামের অনেক ব্যবসায়ী এটিতে কলা পাকাচ্ছে। তবে এক বছর হয়ে গেলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী, ফল পাকানোর হার কম। এর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, বেশিরভাগ ব্যবসায়ী অল্প সময়ে ফল পাকাতে চায়। এখানে মান ধরে রাখার জন্য সময় দরকার। এতটা সময় তারা অপেক্ষা করে না।
চেম্বারটি সম্পর্কে বারির বিজ্ঞানী ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন- আম, কলা, পেঁপে ও টমেটো এ জাতীয় ফল পাকানো নিয়ে আমরা গবেষণা করে যাচ্ছি। কেননা দেশে এই ফলগুলোর যেমন চাহিদা বেশি, তেমনি নানা ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করে এগুলো পাকানো হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সেটির আলোকেই মাল পাকানোর দিকটি সামনে আনা
হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এটি ব্যবহার হচ্ছে। ইথিলিন পরিপুষ্ট ফলকে পাকাতে সাহায্য করে। তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে ইথিলিন গ্যাস দিয়ে ফল পাকাতে ৫০-১০০ পিপিএমেএর মাত্রা দিয়ে চেম্বারে ১২ ঘণ্টা সময় ধরে রাখতে হয়। এতে তিন দিনের মধ্যে ফল পেকে যায়।
তিনি আরও বলেন, দেড় থেকে দুই টনের চেম্বার তৈরিতে তিন লাখ টাকা এবং অপারেশন বায় ১৭ হাজার ৪০০ টাকার মতো খরচ হয়। এতে প্রতি কেজি ফল পাকাতে দুই টাকা খরচ হয়। এ ধরনের একটি চেম্বারে মাসে ৩৬ হাজার টাকা লাভহয় আর সব খরচ বাদ দিলে সাড়ে ১৮ হাজার টাকা লাভা থাকবে। খরচের টাকা ১৪ মাসের মধ্যে তুলে নেওয়া যাবে।
তার ভাষায়, বর্তমানে বিভিন্ন ব্রান্ডের কেমিক্যাল ব্যবহার করে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। সেগুলো ২-৩ দিন ঢেকে রেখে কালার এলে তা বাজারজাত করা হয়। এসব কেমিক্যাল ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য কী ধরনের সমস্যা তৈরি হবে তা নিয়েও কোনো গবেষণা হচ্ছে না।
ইথিলিনের ব্যবহার নিয়ে বারির আরেক বিজ্ঞানী হাফিজুল হক বলেন, কেউ কেউ ধোঁয়া দিয়ে কলা পাকায়। ইথেফোন দিয়ে টমেটোসহ অন্যানা ফল পাকিয়ে থাকে। এসব ফল বা সবজিতে স্প্রে দিচ্ছে তা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয়। কেননা আন্তর্জাতিক পদ্ধতি হচ্ছে ইথিলিন দিয়ে পরিপুষ্ট ফলকে পাকাতে হবে। আবার ফল প্রাকৃতিক উপায়ে পাকানোর জন্য বসে থাকলে হবে না। তাই এ পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। কেমিক্যাল দিয়ে ফল পাকানো সম্পর্কে
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ফল পাকানো বা সংরক্ষণের কয়েকটি দিক রয়েছে। সেখানে কিছু ক্ষেত্রে এমন কেমিক্যাল ব্যবহার রয়েছে, যা বিষ। এসব কেমিক্যাল অনেকগুলো নিষিদ্ধ। এসব কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো ফল খেলে এলার্জি, কিডনি ও লিভারের সমস্যা হয়। প্রথমত, হাতে এলার্জি হয়। মুখে প্রদাহ হয়। দীর্ঘদিন এসব ফল খাওয়ার ফলে লিভার ও কিডনি বিকল হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, মানুষের জন্য যা ক্ষতিকর তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। যারা এসব ব্যবহার করবে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মো. আরিফুর রহমান বলেন, আমরা বিদেশে আম রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করি না। প্রাকৃতিকভাবেই আম যেমন করে পাকে সেগুলো রপ্তানি করে থাকি। আর দেশে কার্বাইডসহ বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল দিয়ে আম পাকানো নিষিদ্ধ। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইথিলিন দিয়ে আম বা অন্যান্য ফল পাকানোর অনুমোদন রয়েছে। আমাদের দেশে সেটিও নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইংয়ের তথ্যমতে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সারা দেশে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ১৪৫ হেক্টর জমিতে দেশি-বিদেশিসহ ৪২ প্রকারের ফল চাষে উৎপাদন হয়েছে ৯৯ লাখ ৭২ হাজার ২৪৭ মেট্রিক টন। সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৪৯৬ হেক্টর জমিতে উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪৮ লাখ ১০ হাজার ৩৩৮ মেট্রিক টন।