মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৪৬ এএম
দেশের সব আদালতে মামলাজট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পুরনো মামলার সঙ্গে নতুন মামলা যোগ হওয়ায় জট বাড়ছে। গ্রাম আদালত পুরো মাত্রায় কার্যকর থাকলে এসব মামলার বড় একটি অংশ হয়তো স্থানীয়ভাবে সালিশেই সমাধান হতে পারত। এতে জেলা আদালত ও উচ্চ আদালতে মামলাজট কমত। রাজনৈতিক মামলার ভয়ে জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিও গ্রাম আদালতের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। এতে গ্রাম আদালতের গতি মন্থর হয়ে পড়েছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ৪৫ লাখ ১৬ হাজার ৬০৩টি মামলা বিচারাধীন ছিল, যা গত এক দশকের সর্বোচ্চ। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগেই ৩১ হাজার ১২০টি মামলা বিচারাধীন। ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার মোট সংখ্যা ছিল ৩৭ লাখ ২৯ হাজার ২৩৫।
গ্রাম আদালত হলো একটি স্থানীয় ব্যবস্থা, যেখানে ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে ছোট ছোট দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়। ২০০৬ সালের গ্রাম আদালত আইন অনুযায়ী এটি গঠিত হয় এবং এর মাধ্যমে গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ সহজে এবং কম খরচে বিচারিক সুবিধা পায়। গ্রাম-আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নির্ধারিত পদ্ধতিতে ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে, এখতিয়ারসম্পন্ন সহকারী জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করতে পারেন এবং এই আবেদন সহকারী জজ ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করেন। গ্রাম আদালত অধ্যাদেশ ছিল ১৯৭৬ সালে প্রণীত একটি আইন, যা পরবর্তীকালে গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। এরপর ২০২৪ সালের ১৩ মে জাতীয় সংসদে আইনটি সংশোধন করা হয়।
শুরুর দিকে গ্রাম আদালতের প্রধান, চেয়ারম্যানের বিরোধ মীমাংসার আওতা বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করা হয়। এখানে কোনো পক্ষেরই আইনজীবী নিয়োগ করতে হয় না, যা নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য একটি ইতিবাচক আইনি সহায়তার দ্বার খুলে দিয়েছে।
গ্রাম আদালত সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান, চারজন ইউপি সদস্য এবং আরেকজন মনোনীত সদস্যসহ পাঁচজন সদস্য নিয়ে গঠিত হয়। এতে ভুক্তভোগী অভিযোগ দায়ের করার দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিরোধপূর্ণ বিষয়ে প্রতিকার পান। আইনে গ্রাম আদালতে তিন মাসের সময়সীমার কথা বলা হলেও সর্বোচ্চ তিন সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হয়। চুরি, পারিবারিক কলহ, নারী নির্যাতন, মারামারি, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ, ইভ টিজিং, ব্যবসায়িক বিরোধ ইত্যাদি বিষয়ে গ্রাম আদালতে মীমাংসা করা হয়। আদালতও অনেক সময় মামলার গুরুত্ব বুঝে তা গ্রাম আদালতে পাঠায়, ভুক্তভোগীরা গ্রাম আদালতের দ্বারস্থ হন। এভাবে গ্রাম আদালত স্থানীয়ভাবে সমস্যার সমাধান করে মামলাজট কমাতে সাহায্য করে।
সূত্র জানায়, জুলাই আন্দোলনে বৈরী ভূমিকা পালনের মামলায় অভিযুক্ত কিংবা রাজনৈতিকভাবে হয়রানির শিকার অনেক ইউপি চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউপির চেয়াম্যান সাইফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকায় গত এক বছর ধরে পরিষদে সশরীরে যেতে পারছি না। কখনও কখনও পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ফাইল স্বাক্ষর করতে আমার কাছে আসেন।’
সাইফুল আরও জানান, গ্রামের বাসিন্দাদের বিরোধপূর্ণ নানা বিষয়ের সমাধানে গ্রাম আদালত খুবই কার্যকরী। এতে গ্রামের মানুষজন স্থানীয়ভাবে, নামমাত্র খরচে তাদের পারস্পরিক বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক চেয়ারম্যান হেনস্থা ও মামলার ভয়ে তার কার্যালয়ে যেতে পারছেন না। এই চেয়ারম্যান জানান, তার নিজের নামে কোনো মামলা না থাকলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হুমকি ও মবের ভয়ে তিনি নিয়মিত ইউপি কার্যালয়ে যান না।
শরীয়তপুরের এক ইউপি চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যানের এই দায়িত্ব পাওয়ার কথা থাকলেও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের (ইউএনও) দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। তারা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সেভাবে সম্পৃক্ত না থাকায় তারা গ্রাম আদালতে ভূমিকা রাখতে সমর্থ নন।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জের চৌহালীর ইউএনও মো. মোস্তাফিজুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ইউএনও সরাসরি গ্রাম আদালত পরিচালনা করেন না, তদারক করেন। অনেক সময় সরকারি নবম বা দশম গ্রেডের কর্মকর্তারা ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়তি দায়িত্ব পালন করেন এবং তাদের কাজের সফলতা নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো হয়।
উদাহরণ দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘চৌহালীর সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে চারটিতে চেয়ারম্যান নেই। এগুলো প্রশাসক দিয়ে পরিচালনা করায় অপেক্ষাকৃত ভালো চলছে। এসব আদালতে প্রতি চেয়ারম্যানকে মাসে পাঁচটি মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও অনেকে ১৫টা পর্যন্ত পর্যন্ত নিষ্পত্তি করছেন।’ গ্রাম আদালতের ইতিবাচক দিক নিয়ে এই ইউএনও বলেন, ‘গ্রাম আদালতে কোনো আইনজীবী খরচ নেই, স্থানীয়ভাবে স্বল্প সময়ে বিরোধের সমাধান হচ্ছে। এতে আদালতের ওপর চাপ কমছে।’
নাম না প্রকাশ করার শর্তে প্রশাসন ক্যাডারের এক কর্মকর্তা বলেন, আইনজীবীদের একটি অংশ গ্রাম আদালতকে সক্রিয় দেখতে চায় না। এর সঙ্গে তাদের আইন পেশার ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চামটা ইউপির চেয়ারম্যান নিজাম রাঢ়ী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এলাকার প্রভাবশালী পক্ষ অনেক সময় চৌকিদারের মাধ্যমে একাধিকবার আদালতে উপস্থিতির বার্তা পাঠালেও সাড়া দিতে চান না। এতে দ্রুত বিচারপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হয়। এসব ব্যাপারে যদি জেলা আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেন, তাহলে গ্রাম আদালতের ওপর মানুষের আস্থা বেড়ে যাবে। তবে রাজনৈতিক কারণে কিছু চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না এবং এতে ওই এলাকার গ্রাম আদালতের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রাম আদালতের কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়েছে কি না জানতে চাইলে ফরিদপুর জেলা গ্রাম আদালতের সমন্বয়কারী ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. সোহরাব হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে প্যানেল চেয়ারম্যানের দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার ওপর গ্রাম আদালতের সফলতা নির্ভর করে। প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পর বাড়তি দায়িত্ব পালন করলে তার মূল কাজের ওপর প্রভাব পড়ে। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, স্থানীয় লোকজনের মধ্যে চেয়ারম্যানের ইমেজ আর প্রশাসকের ইমেজ সমান নয়। প্রশাসক ওই এলাকার স্থানীয়ভাবে বসবাসকারী ব্যক্তি নন। এ কারণে এটা গ্রাম আদালতের কার্যকারিতায় অনেকাংশে প্রভাব ফেলে।
গ্রাম আদালতের বিচার কার্যক্রম নিয়ে জানতে চাইলে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সাউথখালী ইউপির চেয়ারম্যান রাজিব হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকায় নতুন কিছু মানুষ বিচার-সালিশের বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করছে। এতে মানুষজন প্রভাবশালী মহলের কাছে ধরনা দিচ্ছে, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ভুক্তভোগীদের টাকা-পয়সা লেনদেন করার কথা শোনা যায়। অনেক সময় এই প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে পুলিশের সংশ্লিষ্টতা থাকে। এই চেয়ারম্যান আরও জানান, গ্রাম আদালতকে অধিকতর কার্যকর করতে হলে, জনবল বাড়াতে হবে। আরও বেশি সংখ্যক চৌকিদার ও স্থায়ী অফিস সহায়ক নিয়োগ দিতে হবে।
গ্রাম আদালতের সক্রিয় হওয়াসহ নানা দিক নিয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের খ্যাতিমান আইনজীবী মনজিল মোরশেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমান আইনি কাঠামোতে গ্রাম আদালতের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ; ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিষয়গুলো সমাধানের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাব নেই। এর বড় কারণ রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত চেয়ারম্যানরা অনেক আগেই তাদের নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন। যিনি গ্রাম আদালতের প্রধান, ইউপি চেয়ারম্যান একটি দলের প্রতিনিধিত্ব করার কারণে অর্ধেক বিচারপ্রার্থীই তার কাছ থেকে নিরপেক্ষ বিচার পায় না। গ্রাম আদালতকে কার্যকর করতে হলে, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন করা যাবে না।
রাজনৈতিক কারণে অনেক চেয়ারম্যানের কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে এই আইনজীবী বলেন, গত বছরের ৫ আগস্টের পর মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলার জোয়ার দেখা দিয়েছে। অতিদ্রুত নির্বাচন দিলে হয়রানি করার প্রবণতা হ্রাস পাবে, পরিস্থিতি সহনীয় হবে।
বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ-তৃতীয় পর্যায় প্রকল্প-স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় স্থানীয় সরকার বিভাগের একটি প্রকল্প। এটি বাংলাদেশ সরকার, ইউএনডিপি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উল্লেখযোগ্য প্রকল্প, যার লক্ষ্য কার্যকরী স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া হিসেবে সারা দেশে গ্রাম আদালত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।
জানা যায়, ১৯৭৬ সাল থেকে ভিলেজ কোর্ট অ্যাক্ট কার্যকর রয়েছে। তবে এটা সক্রিয় ছিল না। ২০০৬ সালে এই আইনের সংশোধন ও বিধিমালা প্রণয়নের পর থেকে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ কার্যক্রম শুরু হয়। ২০২৪ সালেও নতুন করে সংশোধনীর মাধ্যমে আইনটিকে আরও যুগোপযোগী করা হয়েছে। গ্রাম আদালত প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার মতো কোনো আদালত নয়। এটি কেইস বাই কেইস গঠন হয়। একটি কেইস এলে এই কোর্ট গঠন করার পর তা সমাপ্ত হলে এই আদালতের কার্যক্রমও সমাপ্ত হয়। ২০০৯ সাল থেকে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। বর্তমানে তৃতীয় পর্যায়ে প্রকল্পটি চলমান রয়েছে। দেশের ৬১টি জেলায় গ্রাম আদালত সক্রিয় আছে।
গ্রাম আদালতের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৫৯ হাজার মামলা সমাধান করা হয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। এরপর আর প্রকল্পটি থাকছে না। প্রকল্প শেষ হলে সরকার এই কার্যক্রম চলমান রাখবে কি না এ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
চলতি মাসের ১৭ তারিখে রাজধানীর একটি হোটেলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সঙ্গে ‘গ্রাম আদালত ব্যবস্থা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও বাংলাদেশ গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ তৃতীয় পর্যায় প্রকল্পের জাতীয় প্রকল্প পরিচালক সুরাইয়া আখতার জাহান অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, ‘গ্রাম আদালত ব্যবস্থাকে আরও জোরালো করা গেলে বিচারপ্রার্থীদের সময় ও অর্থ বাঁচবে। রক্ষা পাবে সামাজিক সম্প্রীতি।’ গ্রাম আদালত ও স্থানীয় সালিশ ব্যবস্থার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। গ্রাম আদালত হলো, নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করা।