রুফটপ সোলার প্যানেল
কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৩ এএম
আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৪ এএম
ঢাকায় বাড়ির ছাদে উৎপাদনে সক্ষম ৬১ হাজার ৬৯৩টি সৌরবিদ্যুৎ সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হলেও বর্তমানে একটিও কার্যকর নয়। একসময় এগুলো থেকে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ছিল। তবে বাস্তবে তা হয়নি, বরং এই প্রকল্পে খেলাপি হয়ে পড়েছে ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ। এখন আবার নীতিনির্ধারকদের নির্দেশনায় নতুন করে অনিশ্চয়তা আর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
গত জুনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির বৈঠকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্দেশ দেন। প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি আবারও একটি ব্যর্থ প্রকল্পে রূপ নেবে নাকি এবার গ্রিডে যুক্ত হবে সৌরবিদ্যুৎ?
এই নির্দেশনার পর ২৭ জুলাই একটি যৌথ পর্যালোচনামূলক আলোচনার আয়োজন করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) ও বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিলে অনিয়ম বাড়বে, বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সরঞ্জাম কেনাকাটার ক্ষেত্রে।
সিপিডির পক্ষ থেকে নিবন্ধন উপস্থাপনায় জানানো হয়, ২০১০ সালে বিদ্যুৎ সংযোগের শর্ত হিসেবে তিন শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু বাস্তবে নামমাত্র ও নিম্নমানের সোলার বসানো হয়, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্যকর ছিল না। তারা বলেন, এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিলে হিতে বিপরীত হবে। প্রস্তাবনায় বলা হয়, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি অফিসে রক্ষণাবেক্ষণ ও গ্রিড সংযুক্তির সক্ষমতা না থাকলে আবারও একই ক্ষতির মুখে পড়বে দেশ। এ ছাড়া আলাদা ট্যারিফ নির্ধারণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।
সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ২০২৫-এর ডিসেম্বরের মধ্যে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ স্থাপন করতে চায় সরকার। তারা হয়তো তাদের মেয়াদের মধ্যে এটি করে দেখাতে তাড়াহুড়া করছে। যদিও এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। দ্রুত করতে গেলে নানা সমস্যা হতে পারে। সরকারের ক্রয় প্রক্রিয়ায় ত্রুটি দেখা দিতে পারে। ক্রয় প্রক্রিয়া নয়ছয় করে কারও পকেট ভারী যেন না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে।
সিপিডি সুপারিশ করেছে, পরীক্ষামূলকভাবে বাছাই করা ৪০০ থেকে ৫০০ সরকারি ভবনে ডিসেম্বরের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করা হোক। এতে প্রকল্পের কার্যকারিতা যাচাই করা সম্ভব হবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য হাতে আসবে। তারা আরও বলেছেন, প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিজ নিজ এলাকার সরকারি ভবনে কাজ শুরু করতে পারে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগে বাছাই করা কিছু ভবনে এটা করতে হবে। এটা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে হবে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুবিধা ও অসুবিধা নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য জানা যাবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ অনুসারে, ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসবে- এই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ৫৫টি স্থলভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা ২০২৮ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা।
ইন্টারন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি এজেন্সির ২০২৪ সালের প্রতিবেদন বলছে, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে বাংলাদেশ তার প্রতিবেশীদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ভারতে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২৪ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৭.১৬ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কায় ৩৯.৭ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে; বাংলাদেশে তা মাত্র ৫.৬ শতাংশ।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডার) পরিচালক মো. মুজিবুর রহমান বলেন, ২০১০ সালে বাসায় সৌরবিদ্যুৎ বসানোর বাধ্যবাধকতা ছিল, উৎপাদনের বাধ্যবাধকতা ছিল না। তাই ওইটা কোনো কাজে আসেনি। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বাধ্যবাধকতা দিয়ে দিতে হবে। উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, বাস্তবায়ন কঠিন। তবে এটি ডিসেম্বরে না হলেও আগামী জুনের মধ্যে হবে। সব একসঙ্গে হবে না। সব বিতরণ কোম্পানি কিছু উপজেলায় করবে শুরুতে।
বিএসআরইএ সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, সৌরবিদ্যুতের বিষয়টা সাহসী ও উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ। অতীতের মতো যাতে ধ্বংস না হয়, সতর্ক থাকা জরুরি। তাড়াহুড়া করে ছয় মাসের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অনেক ভুঁইফোড় কোম্পানি কাজ নিতে পারে।
বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি তুলে ধরতে গিয়ে বিএসআরইএর পক্ষ থেকে এক নিবন্ধে বলা হয়, স্বল্প সুদে ঋণ দিতে হবে, যা কোনোভাবেই ৩ শতাংশের বেশি না। গ্রামাঞ্চলে স্কুল, কলেজে নিরাপত্তা থাকে না, তাই সৌর প্যানেল চুরি হতে পারে। এটি বিবেচনায় রাখতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন পণ্য আমদানি শুল্ক বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগের সাবেক পরিচালক খোন্দকার মোর্শেদ মিল্লাত বলেন, সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রাধিকার প্রকল্প হলো ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদন। ছাদে বিদ্যুৎ অর্থায়নে ব্যাংক উৎসাহ দিচ্ছে। সুদের হার ৩ শতাংশ করা যাবে না, এটা ৫ শতাংশ ঠিক আছে। ব্যাংকের আর্থিক দিকটিও বিবেচনা করতে হবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, আলোচনা সভায় যেসব আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, এগুলো বিবেচনায় নিয়েই কাজ করছে সরকার। শিগগির পরিষ্কার নির্দেশনা সবাই পাবে। পিডিবির প্রকল্প সংস্থাটির নিজস্ব জনবল প্রশিক্ষণ দিয়ে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। ছাদে করলে জমির অপচয় হয় না, খরচও কমে যাচ্ছে।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম রুফটপ সোলার খাতে সরকারের ব্যর্থতাকে বণ্টন কাঠামোর ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, সরকার সোলার প্যানেল স্থাপনে সরাসরি জড়িয়ে ব্যবসা করেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঠামো তৈরি করেনি। যদি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হতো এবং সরকার সেখান থেকে নির্দিষ্ট হারে বিদ্যুৎ কিনত, তাহলে অনেক আগেই এই খাত কার্যকর হতো। ২০১০ সাল থেকেই যদি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে আজ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ সোলার থেকে আসত।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অন্যান্য খাতের মতো এখানে অর্থ লুটপাট হয়েছে এবং প্রকৃত উদ্যোক্তাদের জায়গা না দিয়ে সরকারি লোকজন নিজেরাই ব্যবসা করেছে। প্রযুক্তির দোষ না দিয়ে তিনি বণ্টন কাঠামোর দায়কেই সামনে আনেন। তার মতে, বেসরকারি কোম্পানিকে সোলার স্থাপনের দায়িত্ব দিলে এবং সরকার সাড়ে ৭ টাকা দরে বিদ্যুৎ কিনলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে খরচ কমে যেত এবং একসময় সাড়ে ৫ টাকা দরে বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব হতো।