জন্ম ও মৃত্যু
ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৮:৫৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
একটি শিশু পৃথিবীর আলো দেখার ৪৫ দিনের মধ্যে তার জন্মনিবন্ধনের নিয়ম। কিন্তু দিনের পর দিন, মাসের পর মাসÑ এমনকি কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও নিবন্ধন হয় না। এর পেছনে রয়েছে পারিবারিক অবহেলা, বয়স কমানোর প্রবণতা এবং সরকারি সেবাদাতাদের পদে পদে প্রতিবন্ধকতা তৈরি। জন্মনিবন্ধন না হওয়ায় রাষ্ট্রীয় নীতিমালা গ্রহণেও পড়তে হচ্ছে সমস্যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অবস্থার উন্নতি না হলে দেশের খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানসহ সব ক্ষেত্রেই নীতিমালা গ্রহণে পিছিয়ে পড়তে হবে।
শফিকুল ইসলাম নামের ধানমন্ডির এক বাসিন্দা জানান, তিনি সিটি করপোরেশনে ৪ মাস ঘোরাঘুরি করার পর মেয়ের জন্মনিবন্ধন করতে পেরেছেন। তিনি জানান, তাকে নানা ধরনের হয়রানি করা হয়েছে। ঘুষ চাওয়া হয়েছে। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান গেন্ডারিয়ার জয়স্রী বাদুরী। তিনি জানান, তার নিজের জন্মনিবন্ধন করতে কয়েক মাস নগর ভবনে ঘুরতে হয়েছে। জন্মনিবন্ধন পদ্ধতির সহজ সমাধান প্রত্যাশা করেন তিনি।
কেন প্রয়োজন
১৯টি সেবায় প্রয়োজন জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সনদ। জন্ম ও মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে এই সনদ নিতে হবে। সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ব্যক্তিগত পর্যায়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সঠিক জনসংখ্যা নির্ণয়, স্বাস্থ্য তথ্য পরিকল্পনা, বাজেট প্রণয়ন, জনস্বাস্থ্য ও সুশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা)। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, জন্মনিবন্ধনের ওপর নির্ভর করছে রাষ্ট্রীয় ১৯টি নাগরিক সেবাপ্রাপ্তির বিষয়। নিবন্ধন না থাকায় এসব সেবা পেতে ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই) বাংলাদেশের কান্ট্রি লিড রুহুল কুদ্দুস বলেন, জন্মনিবন্ধন না করায় জীবন্ত মানুষটিও রাষ্ট্রের চোখে অদৃশ্য থাকে। তাকে নিয়ে পরিকল্পনা সাজানো যায় না। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিকল্পনা, নীতিমালা ও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সঠিক সংখ্যা না জানা থাকলে কাজের অগ্রগতি হয় না।
রুহুল কুদ্দুস বলেন, প্রতি ১০ বছর পরপর আদমশুমারি হয়। এতে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। যদি সঠিকভাবে নিবন্ধন হলে এই টাকা বেঁচে যেত। অর্থাৎ জন্মনিবন্ধনের হিসাব করে তার ভোটার আইডি কার্ড, ব্যাংক হিসাব, পাসপোর্টসহ সব ধরনের সেবা অটোমেটিক করে ফেলা সম্ভব।
মৃত্যু নিবন্ধন সম্পর্কে তিনি বলেন, মৃত্যু নিবন্ধন না হওয়ায় এক ধরনের অপরাধ বাড়ে। যেমন অনেকের সামাজিক নিরাপত্তার কার্ড থাকে। দেখা গেল ব্যক্তিটি মারা যাওয়ার পরও তার নামে সুযোগ-সুবিধাগুলো নেওয়া হয়। আর মৃতের সম্পত্তির ভাগাভাগিতেও উত্তরাধিকারীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তাই জন্মের ও মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই নিবন্ধন করতে হবে।
ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, জাতিসংঘের আঞ্চলিক সংস্থা ইউএনএসকাপ ঘোষিত সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকসের (সিআরভিএস) আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতিবন্ধ বাংলাদেশ সরকার। তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোকে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের দায়িত্ব দিলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি কেমন
ইউএনএসকাপ ও ইউনিসেফের ২০২৩ ও ২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে জন্ম নিবন্ধনের হার ৭৭ ও মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৭৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় এ হার ৭৬ শতাংশ। বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধনের হার ৫০ ও মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৪৭ শতাংশ। ইউএনএসকাপের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের হার সবচেয়ে বেশি মালদ্বীপে। সেখানে জন্ম ৯৮ ও মৃত্যু ১০০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় জন্ম ৯৮ ও মৃত্যু ৯৮, ভারতে জন্ম ৯০ ও মৃত্যু ৯০, ভুটানে জন্ম ৮০ ও ৬৯ মৃত্যু, নেপালে জন্ম ৬৪ ও মৃত্যু ৬৯, বাংলাদেশে জন্ম ৫৩ ও মৃত্যু ৪৩ এবং পাকিস্তানে জন্ম ৪৩ ও মৃত্যু ৩৫ শতাংশ।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ২০০৪ সালে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন করা হয়। সেটি বাস্তবায়ন শুরু হয় ২০০৬ সাল থেকে। এটি সংশোধন হয় ২০১৩ সালে এবং রেজিস্ট্রার জেনারেলের অফিস স্থাপন করা হয় ২০১৬ সালে।
খাদ্য নিরাপত্তায় দরকার সঠিক তথ্য
জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের গুরুত্ব তুলে ধরে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের কী পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন করতে হবে, তার মধ্যে চাল, সবজি, মাছ, মাংস ও ফলফলাদির আবাদ কতটুকু দরকারÑ সেজন্য জন্ম-মৃত্যুর সঠিক তথ্য দরকার। তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে জন্মের সঙ্গে মৃত্যুনিবন্ধনও বাধ্যতামূলক। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই জন্ম-মৃত্যুর নিবন্ধন নিশ্চিত করতে হবে।