টিসিবি
কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ১০:১২ এএম
ফাইল ফটো
দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের মানুষের জন্য টিসিবি কার্ড। অথচ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন পরিবারও এই কার্ড পেয়েছে, যাদের মাসিক আয় ৩০-৪০ হাজার টাকা। আবার অনেক পরিবারের হাতে রয়েছে একাধিক কার্ড। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী অনিয়মের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ ভুয়া কার্ড। অর্থাৎ এসব কার্ডের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার টন ভর্তুকি দেওয়া পণ্য প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বঞ্চিত করে বেহাত হচ্ছে।
টিসিবির উপপরিচালক মো. শাহাদাত হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘২০২২ সালের মার্চ থেকে চলমান ছিল এক কোটি ফ্যামিলি কার্ডধারীদের কাছে পণ্য বিক্রি। সরকার ফ্যামিলি কার্ডের বিপরীতে স্মার্ট কার্ড তৈরির উদ্যোগ নেওয়ায় জানুয়ারি ২০২৫ থেকে শুধু স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডধারীদের কাছেই টিসিবির পণ্য বিক্রয় শুরু হয়। আর ফ্যামিলি কার্ড স্মার্ট কার্ডে রূপান্তরিত হওয়ায় রিপিটেড কার্ডগুলো অটোমেটিক বাতিল হয়ে যায়। একই এনআইডি, একই মোবাইল নম্বর ও ভুল তথ্যের কারণেও অনেক কার্ড বাতিল হয়।’
নতুন কার্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নতুন কার্ড প্রদানের জন্য তালিকা তৈরির কাজ চলছে এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে। অর্থাৎ যাচাই শেষে প্রকৃত দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে নতুন কার্ড প্রদান করা হবে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন গত এপ্রিলে রাজধানীর আর্মি গলফ ক্লাবে টিসিবির কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বলেছিলেন, ‘ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পাঁচতলা বাড়ির মালিকের কাছেও টিসিবির কার্ড পাওয়া গেছে। ভুয়া ৪০ লাখ কার্ডধারীকে টিসিবির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’
প্রকৃত অভাবীদের বদলে প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতাকর্মীÑ এমনকি কিছু মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছেও পৌঁছেছে এই কার্ড। ফলে ভর্তুকির পণ্য থেকে বাদ পড়ছে প্রকৃত দরিদ্র মানুষ।
গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় নির্মাণাধীন সাইলো ও নতুন খাদ্যগুদামের নির্মাণকাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করতে এসে সাংবাদিকদের সাক্ষাতে খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেছিলেন, ‘টিসিবির অনেক ভুয়া কার্ড ছিল। সেগুলো বাতিল করে নতুন স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে। যাতে প্রকৃত দাবিদাররাই অগ্রাধিকার পায়।’
বারিধারা লেকের পাড়ে কোলে সাত মাসের সন্তান হাসিবকে নিয়ে টিসিবির দাঁড়িয়ে আছেন নাজমা। তিনি বলেন, ‘কয়েকবার ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আবেদন করলেও কার্ড হয়নি।’
ঢাকা মিরপুরের বাসিন্দা আজহারুল হক বলেন, ‘ভাইয়ের পরিবারসহ তিনজন একই ঘরে বসবাস করলেও আমরা তিনটি কার্ড পেয়েছি।’
ঢাকার মোহাম্মদপুরের গার্মেন্টস কর্মী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘তিন বছর ধরে অফিস থেকে অফিসে ঘুরছি। কার্ড পাইনি। অথচ যাদের চাকরি আছে, যাদের হাতে টাকা আছে, তারাই কার্ড পায়।’
ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্ড বিতরণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিয়মের কারণে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হয়েছেন। প্রায় ৪০ লাখ ভুয়া কার্ডধারী উপকারভোগীর তালিকায় ছিল, যারা কার্ড পাওয়ার যোগ্য নয়।’
স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা দলীয় বিবেচনায় আত্মীয়-স্বজন ও দলীয় কর্মীদের কার্ড দিয়েছেন, ফলে সরকারের ভালো উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘উপকারভোগী বাছাইয়ের জন্য স্পষ্ট গাইডলাইন থাকলেও দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের তদারকি দুর্বল থাকায় অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এ ধরনের চর্চা শুধু সুশাসন ব্যাহত করে না, বরং ভোক্তাদের অধিকারও ক্ষুণ্ন করে।’
এজন্য তৃণমূলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং ভোক্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নাগরিক সমাজ ও ভোক্তা সংগঠনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে জোর দেন এসএম নাজের হোসাইন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আল-আমিন বলেন, ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধার জন্য টিসিবির কার্যক্রম শুরু হলেও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে তা জনগণের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে না। এতে যেমন সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি হয়, তেমনি দুর্নীতিগ্রস্তরা সুযোগ নেয়।’
সরকার পরিবর্তনের পর দায়িত্বে আসা নতুন কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে অবগত কি না তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সম্প্রতি টিসিবির করপোরেট ট্রেডিং প্রোফাইল মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সরকারি অন্যান্য কার্যক্রমের তুলনায় টিসিবিতে দুর্নীতির অভিযোগ তুলনামূলক কম। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে গেলেও ভর্তুকি মূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম বন্ধ বা কমানো হবে না। ভোক্তাদের পাশাপাশি উৎপাদকদের স্বার্থ রক্ষায় টিসিবি কাজ করছে। আলু চাষিরা যেন ন্যায্যমূল্য পান, সেদিকেও প্রতিষ্ঠানের বিশেষ নজর রয়েছে।’
স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের জন্য কীভাবে আবেদন করবেন
টিসিবি ওয়েবসাইট সূত্রে জানা যায়, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ সুবিধা হিসেবে চালু করেছে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড। কার্ডের জন্য নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আবেদন করতে হয় স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কার্যালয়ে যেমন মেয়র, কাউন্সিলর বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে। এই সুবিধা কেবল দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য প্রযোজ্য। কার্ড পেতে কোনো ধরনের ফি বা টাকা দিতে হয় না; সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এটি প্রদান করা হয়।
নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজন জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ এবং তার নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর। প্রতিটি পরিবার থেকে কেবল একজন সদস্য এই কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারবেন। নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর কার্ড প্রস্তুত হলে উপকারভোগীর মোবাইল নম্বরে এসএমএস পাঠানো হবে; যেখানে বিতরণের স্থান, তারিখ ও কোড জানানো হবে। নির্ধারিত সময় ও স্থান থেকে কার্ড সংগ্রহ করতে হবে।
প্রসঙ্গত, গত ৯ আগস্ট টিসিবির উপপরিচালক মো. শাহাদাত হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, ১০ আগস্ট থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিন (শুক্রবার ব্যতীত) সারা দেশে দৈনিক ট্রাকপ্রতি ৫০০ জন সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হবে। যেকোনো ভোক্তা ট্রাক থেকে পণ্য ক্রয় করতে পারবেন। ভোজ্য তেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা, মসুর ডাল প্রতি কেজি ৭০ টাকা এবং চিনি প্রতি কেজি ৮০ টাকায় বিক্রয় করে। এ তিন পণ্যের বর্তমান সর্বনিম্ন বাজারমূল্য ভোজ্য তেল ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা, মসুর ডাল ১২০ থেকে ১৩৫ এবং চিনি ১১০ থেকে ১৪০ টাকা।