ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৫ ২৩:৫৭ পিএম
নতুন সরকার গঠনের পর গত বছর সেপ্টেম্বরে বিধ্বস্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে অনেকটা তড়িঘড়ি করেই জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ দেওয়া হয় বিসিএস প্রশাসন ২৪, ২৫ ও ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তাদের। ওই নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। নতুন নিয়োগ পাওয়া বিসিএস ২৪ ব্যাচের ডিসিদের মধ্যে অনেকেই চলতি বছর মার্চে যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। তারা এখন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তা। অতীতে কোনো জেলা প্রশাসক যুগ্ম সচিব পদোন্নতি পেয়ে এত বেশি সময় মাঠ প্রশাসনে থাকার নজির ছিল না। কবে নাগাদ তাদের প্রত্যাহার করা হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কেউ নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না। তা ছাড়া অনেক জেলা প্রশাসক যুগ্ম সচিব পদোন্নতি পেয়ে মাঠ প্রশাসনে দীর্ঘদিন কাজ করতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না। এদিকে নতুন ডিসি নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে।
মূলত বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকসহ যুগ্ম সচিব ও এর ওপরের পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ দিতেই অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটির কমিটি গঠন করে। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির যথাযথ নির্দেশনা না পাওয়ায় ডিসি নিয়োগ ও মাঠে পদোন্নতি পাওয়া ডিসিদের প্রত্যাহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর নতুন নিয়োগ পাওয়া ডিসিদের মধ্যে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তারাও ছিলেন বলে অভিয়োগ ওঠে। এতে প্রশাসনে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। খোদ জনপ্রশাসন সচিবের দপ্তর অবরুদ্ধের মতো ঘটনাও ঘটে। তখন প্রবল চাপের মুখে নতুন নিয়োগ পাওয়া গুটিকয়েক ডিসিকে প্রত্যাহারও করা হয়। তবে অন্যরা রয়ে যান বহাল তবিয়তে।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলেও প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। মাঠ প্রশাসনের তিন ব্যাচ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে ৬৪ জেলায় তারা ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৪তম ব্যাচের ২৬ জন, ২৫তম ব্যাচের ২৫ জন এবং ২৭তম ব্যাচের ১৩ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের মধ্যে গত ২০ মার্চ ২৪তম ব্যাচের ২৬ জেলা প্রশাসকের মধ্যে ২১ জন পদোন্নতি পেয়ে যুগ্ম সচিব হয়েছেন।
প্রায় ৫ মাস হতে চললেও তারা এখনও কোনো মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পদায়ন পাচ্ছেন না। শিগগির জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটির পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে সূত্রে জানা গেছে।
নির্বাচনের মাস ঘোষণার পরপরই নিজের দলের আদর্শের কর্মকর্তাদের ডিসি নিয়োগের মাধ্যমে দলগুলো কমবেশি সুবিধা নিতে চেষ্টা করছে। সূত্র বলছে, ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে পৃথক পৃথকভাবে কয়েকটি জেলায় ডিসি নিয়োগের সুপারিশও করা হয়েছিল। বিষয়টি চাউর হওয়ায় তাদের ডিসি নিয়োগ দেওয়া হবে কি না, তাও নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
জানা গেছে, গত অক্টোবরে ডিসিরা যুগ্ম সচিব পদোন্নতি পাওয়ার পরপরই মে মাসে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটির সিদ্ধান্তের বিলম্বের কারণে এখন পর্যন্ত ডিসি নিয়োগ দিতে পারেনি সরকার। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি (নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ অনুবিভাগ) অতিরিক্ত সচিব মো. এরফানুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ডিসি নিয়োগের বিষয়টি জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটির ওপরই নির্ভর করছে। কমিটিই বলতে পারবে কবে নাগাদ নিয়োগ হবে।
গত ৫ আগস্টের পর ডিসি নিয়োগ নিয়ে নানান ধরনের সমালোচনায় পড়তে হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারকে। এ প্রেক্ষিতে বিতর্ক এড়াতে সরকার বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকসহ যুগ্ম সচিব ও তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ প্রদানের জন্য চারজন উপদেষ্টা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং জনপ্রশাসন সচিবকে নিয়ে ‘জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটি’ করে। কমিটি গঠনের পর ব্যাপক যাচাই-বাছাই করে ডিসি নিয়োগে সরকার খুবই সতর্ক থাকছে। জনপ্রশাসন বিষয়ক পরামর্শ কমিটি সুবিধাভোগী কোনো কর্মকর্তা যাতে নিয়োগ না পায়, সে বিষয়ে যাচাই-বাছাই করতে বলেছে। কেউ তথ্য গোপন করে ডিসি হলে এবং পরে তা প্রমাণিত হলে, ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ভালো হবে না বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জানিয়ে দিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে নতুন ডিসি নিয়োগে রাজনৈতিকভাবে নানান লবিং চলছে। যে কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও ডিসি বাছাইয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ১০৮ জন ডিসির ফিটলিস্ট তৈরি করা হয়। ওই লিস্ট থেকে ৬১ জেলায় ডিসি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই নিয়োগ ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছিল। এরপর চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি থেকে নতুন ফিটলিস্ট তৈরির কাজ শুরু করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তারা ছয় ধাপে বিসিএস প্রশাসন ২৫ ও ২৭তম ব্যাচের ২৬৯ জন উপসচিবের সাক্ষাৎকার নেয়। এর মধ্যে অর্ধশতকের কিছু বেশি কর্মকর্তাকে ফিটলিস্টে রাখা হয়েছে।