ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ০৮:৩৬ এএম
আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ০৮:৩৬ এএম
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে অতিমাত্রায় দলীয়করণ এবং সর্বস্তরে লাগামহীন দুর্নীতির কারণে জনপ্রশাসন পরিণত হয়েছিল একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে। দেশের সকল প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সেখান থেকেই জনপ্রশাসনের গতি বাড়াতে গত ৮ অক্টোবর নতুন বাংলাদেশ গড়তে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের ২৫টি নির্দেশনা দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের। এমন ধারণা মাথায় রেখে প্রস্তুত করা হচ্ছে মাঠপ্রশাসন। শিগগির জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধান উপদেষ্টা। এই ভাষণে নির্বাচনের তারিখ থাকতে পারে বলে রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হলে বর্তমান প্রশাসনের গতি বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল রবিবার নাটোরে নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, আপনারা প্রায়ই শোনেন ল অ্যান্ড অর্ডার কাজ করছে না, পুলিশ কাজ করছে না, করবে কীভাবে? স্ট্রাকচার নাই। আইনের স্ট্রাকচার শেষ, প্রশাসনেরও স্ট্রাকচার শেষ। দেশের সব প্রশাসনকি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এক বছরে তা ঠিক করা সম্ভব নয়।
জনপ্রশাসনকে গতিশীল করতে প্রধান উপদেষ্টার দেওয়া নির্দেশনা সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সচিব ও সিনিয়র সচিবদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়, বিবেক ও ন্যায়বোধে উজ্জীবিত হয়ে সবাইকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সততা, নিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে নতুন বাংলাদেশ গড়তে হবে। দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে, সেবা সহজীকরণের মাধ্যমে জনগণের সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টার দেওয়া সময়সীমা সামনে রেখেই প্রশাসনের গতি কিছুটা হলেও বাড়ছে। আবার মাঠপ্রশাসনে দেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন নির্দেশনা। সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিকে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যেসব সংস্কার প্রস্তাব মন্ত্রণালয় নিজ উদ্যোগেই বাস্তবায়ন করতে পারে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। গত ১৬ জুন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে আয়োজিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জন-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে প্রধান ছয়টি কমিশনসহ বিভিন্ন বিষয়ে যেসব সংস্কার কমিশন গঠন করেছে, তারা সরকারের কাছে সংস্কার প্রস্তাব জমা দিয়েছে। এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সংবিধান-সংশ্লিষ্ট ও বড় সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যের জন্য প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কাজ করছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গত ২৫ মে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠিয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।
অন্যদিকে সংস্কার কর্মসূচি প্রণয়নে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ও তাদের মতামত নিতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে, সে সরকারের জনপ্রশাসনের চলার গতি হওয়া উচিত ছিল জেটবিমানের মতো। কিন্তু বাস্তবে জনপ্রশাসন চলছে ধীরগতিতে। বর্তমান জনপ্রশাসন সাধারণ রুটিন দায়িত্বও ঠিকমতো পালন করতে সক্ষম হচ্ছে না। যার কারণে জনগণের সেবাপ্রাপ্তি বিঘ্নিত হচ্ছে, জনশৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। ক্রমেই চরম অবনতির দিকে যাচ্ছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এতে জনমনে সৃষ্টি হচ্ছে অস্থিরতা।
মানবসম্পদ উন্নয়নে যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রয়োজনে সংস্কার করতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সরবরাহ ও সঞ্চালন যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে তৎপর থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। খাদ্য সংগ্রহ, মজুদ ও সরবরাহ সন্তোষজনক পর্যায়ে রাখতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। আমদানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে। ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়মিত তদারকি করতে হবে। শিল্প উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। চিঠিতে প্রধান উপদেষ্টার দেওয়া এসব নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নে সচিবদের একান্ত সহযোগিতা ও উদ্যোগ কামনা করা হয়। একই সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে সেই বিষয়ে অগ্রগতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জনপ্রশাসনে গতি ফিরিয়ে আনতে হলে গৎবাঁধা চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে, চিন্তার সংস্কার করে, সৃজনশীল উপায়ে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। বাজেটের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে আগ্রহ, ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, দেশের স্বার্থে তা সর্বোত্তম উপায়ে কাজে লাগাতে হবে। সেবাপ্রার্থীদের কেউ যেন কোনোরূপ ভোগান্তি, হয়রানি কিংবা কোনো কারণে দীর্ঘসূত্রতার শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যক্রম নিতে হবে। কৃষি উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সরকারকে জনবান্ধব সরকারে পরিণত করতে সমবেতভাবে কাজ করতে হবে।
এক বছরে ১৫৪৯ কর্মকর্তার পদোন্নতি : প্রকাশিত হয়নি ফ্যাসিস্ট কর্মকর্তাদের তালিকা
৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর এক বছরে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে উপসচিব ১৪১ জন, যুগ্ম সচিব ৪২৪, অতিরিক্ত সচিব ১৮৯, গ্রেড-১ ছাব্বিশ জন এবং সচিব/সিনিয়র সচিব ৪৫ জনসহ মোট ৭৮৫ জন। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে উপসচিব ৪ জন, যুগ্ম সচিব ৭২, অতিরিক্ত সচিব ৫২৮ এবং সচিব ১১৯ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে অবসরে গেছেন উপসচিব ১৬ জন, যুগ্ম সচিব ১৫, অতিরিক্ত সচিব ৭৫, গ্রেড-১ কর্মকর্তা ৪৩ জন এবং সচিব/সিনিয়র সচিব ২৪ জনসহ মোট ১৬৪ কর্মকর্তা। বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন অতিরিক্ত সচিব ১৯ জন, গ্রেড-১ একজন এবং সচিব/সিনিয়র সচিব ৯ জনসহ মোট ২৯ জন। তবে গত এক বছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ আমলাদের তালিকা প্রকাশ করতে পারেনি। এখনও তারা বহাল তবিয়্যতে রয়েছেন। এ ছাড়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ২৪টি বিভাগীয় মামলা রুজু হয়েছে। ৮টি বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ১৬টি বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি অধ্যাদেশ প্রণয়ন, ৩টি বিধিমালা সংশোধন, ১টি বিশেষ বিধিমালা প্রণয়ন ও ২২টি নিয়োগ বিধিমালা/প্রবিধানমালা প্রণয়ন/সংশোধনে সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে।