× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পাহাড়ে সুবাস ছড়াচ্ছে মসলা

ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৫ ১০:০১ এএম

পাহাড়ে সুবাস ছড়াচ্ছে মসলা

রসনাবিলাস বাঙালির খাবারের স্বাদ মেটাতে বছরে মসলা আমদানি করতে হয় প্রায় ৬০ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে দেশে এই মসলার বাজার ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। আদা, হলুদ, ধনিয়া, পেঁয়াজ, রসুনসহ অল্প কিছু মসলা দেশে উৎপাদিত হয়, বাকিগুলো আমদানিনির্ভর। তবে বর্তমানে মসলা জাতীয় ফসলের আবাদ বাড়ছে। বিশেষ করে তিন পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির জেলার পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মসলা চাষ।

গোলমরিচ, আদা, পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়া, মরিচ, কালোজিরাসহ ৮ প্রকারের মসলার আবাদ হচ্ছে। ঝোপঝাড় আর লতাপাতায় ঢেকে থাকা পাহাড়ের বুকে সুবাস ছড়াচ্ছে মসলা। আদা ক্ষেতের পাশ দিয়ে গেলও সুঘ্রাণে কিছুক্ষণ পথচারীকে থামিয়ে দেয়। গোলমরিচের বাহারি রঙ মন কেড়ে নেয়। দারুচিনির ম ম সুবাস থমকে দেয় দাঁড়ায় পথিকের গন্তব্য। এটি সম্ভব হচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে ‘মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর কল্যাণে। প্রকল্পটি বর্তমানে ৪০ জেলার ১১০টি উপজেলায় ও ২৫টি হটিকালচার সেন্টারে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ১ জুলাই ২০২২ থেকে শুরু হওয়া এ প্রকল্প চলবে ৩০ জুন, ২০২৭ পর্যন্ত।

বীজ ও বাজার সহায়তা চান কৃষক 

বান্দরবানের পাহাড়ি জমিতে আদা, হলুদ ও মরিচ চাষে সাফল্য পাচ্ছেন সুজিত কুমার দাস। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ৩৩ শতাংশ জমিতে চাষ করে ৪৫ মণ আদা পেয়েছি। প্রতি মণ আদা বিক্রি হয়েছে ৫ হাজার ২০০ টাকা। ৪০ কানি জমিতে (স্থানীয় মাপ) হলুদ পেয়েছেন ১৬ মণ। তিনি বলেন, আদার বীজ পেয়েছিলাম প্রকল্প থেকে। এসবের উৎপাদনও ভালো ছিল। তা ছাড়া সার, কীটনাশক ও কিছু টাকাও দেওয়া হয়েছে। আমাদের দাবি হচ্ছেÑ পাহাড়িদের মসলার বীজ সরবরাহ করলে উৎপাদনে সহায়তা হয়। কেননা এক মণ বীজ আদা কিনতে টাকা লাগে ৬-৭ হাজার। এ পরিমাণ টাকা সবার জন্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া কৃষকদের ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

বাজার ব্যবস্থা সম্পর্কে বলেন, এখানে বাজার ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। কারবারিরা বাড়ি থেকে মসলাসহ বিভিন্ন ফসল কিনে নেন। তারা যে দামের কথা বলেন, তার বাইরে যাওয়া সম্ভব হয় না অর্থাৎ বাজার পুরোপুরি কারবারিদের অধীনে। তাই আমাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

বান্দরবান জেলার হেডম্যানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মেন ইয়াং ম্রো গোলমরিচ, দারুচিনি, আদা চাষ করছেন। ৫ বছর ধরে এসব মসলা আবাদ করছেন তিনি। প্রতি কেজি গোলমরিচ বিক্রি করেন ৫০০ টাকা। 

বান্দরবানের থানচি উপজেলায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮০৮.৫০ হেক্টর জমিতে মসলার আবাদ হয়েছে। তাতে উৎপাদন হয়েছে ১৬ হাজার ৫৪০.৭০ মেট্রিক টন। উপজেলাটিতে মসলা চাষে সমস্যা সম্পর্কে কৃষি কর্মকর্তা মো. ওয়ালিদ হোসেন বলেন, কৃষক আগ্রহ নিয়ে মসলা চাষ করলেও সঠিক বাজারমূল্য পাচ্ছেন না। দুর্গম এলাকা হওয়ায় মসলা পরিবহনে সমস্যা হয়। এতে বাজারকরণে আরও বেশি জটিলতা তৈরি করে। সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি বলেন, পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া মসলাজাতীয় ফসল উৎপাদনের জন্য খুবই সহায়ক। বিভিন্ন ফল বাগান, কফি, কাজুবাদামের ফাঁকে ফাঁকে ছায়াযুক্ত স্থানে আদা, হলুদ চাষাবাদ উপযোগী। সঠিকভাবে মসলাজাতীয় ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে পাহাড়িদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। 

মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক রাসেল আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পার্বত্যাঞ্চলে মসলা বাড়ানোর বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি নিয়ে কাজ করছে প্রকল্পটি। এর মাধ্যমে পাহাড়ের কৃষকদের মাঝে পরিচিতি লাভ করেছে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চাষাবাদ। প্রকল্পের অধীনে বারি উদ্ভাবিত দুটি উচ্চ ফলনশীল আদা ভালো আবাদ হচ্ছে। বারি আদা-২ হেক্টরে ৩৫ মেট্রিক টন করে উৎপাদন হচ্ছে। তিনি বলেন, চট্টগাম এবং তিন পার্বত্য জেলায় ৩০ হাজার গোলমরিচের চারা রোপণ করা হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা এই গোলমরিচ উৎপাদন বাড়লে ভবিষ্যতে রপ্তানি করা যাবে। 

রাসেল আহমেদ বলেন, মসলাজাতীয় ফসলের ৫ শতাংশ কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আয়বর্ধক কার্যক্রমে ২৫-৩০% মহিলাদের (বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মহিলাদের) সম্পৃক্ততার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ৫৯ হাজার ৯১০ জন চাষিকে মসলাজাতীয় ফসলের চাষ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে ১৪টি মসলা ফসলের উন্নত জাতের সম্প্রসারণে কাজ করছে। 

৫ বছরে আবাদ বেড়েছে দেড় হাজার হেক্টর

বান্দরবান কৃষি অফিসের তথ্যমতে, জেলার ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে এখন হলুদের চাষ হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা। আদা উৎপাদিত হচ্ছে ৩ হাজার হেক্টরে, যার মূল্য প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এলাচ, দারুচিনি ও অন্যান্য মসলার উৎপাদনও বাড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে পার্বত্যাঞ্চলে মসলা চাষের জমির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২০০ হেক্টর, ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৭৫০ হেক্টর। অর্থা দেড় বছরে আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ১ হাজার ৫৫০ হেক্টর। এ সময়ের মধ্যে আদা চাষের পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণ ও হলুদ ৬৫ শতাংশ হয়েছে।

বর্তমান বাজারদর

বর্তমানে বাজারে মসলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এলাচ। গতকাল রবিবার রাজধানীর মহাখালী কাঁচা বাজারের খোকন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ইমরান হোসেন বলেন, প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৫০০ টাকা, দারুচিনি ৫৫০, হলুদ ৪৫০-৫০০, সাদা গোলমরিচ ১৮০০ ও কালো ১৬০০ টাকা, লবঙ্গ ১৬০০, আদা ১০০, পেঁয়াজ ৬০, রসুন ১৮০, আলুবোখারা ৫০০ ও জিরা ৬০০ টাকা।

এদিকে চট্টগ্রাম কাস্টমস অফিসের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলাচ, দারুচিনিসহ ৩৪ প্রকারের মসলা ১ লাখ ৯৯ হাজার ৬৪.৪৭ মেট্রিক টন আমদানি করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মসলা আমদানি হয়েছে ৪৭৮.৪ মিলিয়ন ডলারের। তার আগের বছর ছিল ৩৫৭.৯ মিলিয়ন ডলার। 

কী বলছেন কর্মকর্তারা

বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এম এম শাহ্ নেয়াজ বলেন, পার্বত্যাঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু উচ্চমূল্যের মসলা আবাদের জন্য খুবই উপযোগী। ২০২১ সালের পর থেকে এলাচ ও দারুচিনি পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করে চমৎকার ফল মিলছে। এখানে মসলা চাষ শুধু বিকল্প চাষ নয় বরং অর্থনৈতিক নতুন দিগন্ত চালু হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহ, নারীদের অংশগ্রহণ এবং সরকারের সহায়তা সব মিলিয়ে পাহাড় একটি সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠছে। আমরা স্বপ্ন দেখি এক দিন মসলা রপ্তানি করতে পারব। 

তিনি বলেন, দেশে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার মসলা আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে এলাচ, দারুচিনি, জিরা ও গোলমরিচরই সবচেয়ে বেশি। ২০২৪ সালের মধ্যে পাহাড়ি তিন জেলায় উৎপাদিত এলাচ ও হলুদ দিয়ে ৩০ শতাংশ আমদানিনির্ভরতা কমানো গেছে। 

বান্দরবান হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক লিটন দেবনাথ বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে মসলা চাষ বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে। দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হলে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানি তিনটি স্তরিই সমন্বয় করতে হবে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইং পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, আমরা মসলা আমদানি করি বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার। পাহাড়ে মসলার আবাদ বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। যথাযথভাবে পাহাড়ে ভালো প্রজাতি ও প্রশিক্ষণ দিতে পারলে মসলা আমদানির বদলে রপ্তানি করতে পারব। আমরা এ ধরনের প্রত্যাশা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা