রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৫ ০৯:৩০ এএম
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সেবা নিতে গ্রাহকদের পদে পদে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। দালাল চক্র, ফাইলজট ও অ্যানালগ ব্যবস্থাপনার ফাঁদে পড়ছে সাধারণ মানুষ। সংস্থাটিতে নেই স্ক্যানিং ব্যবস্থা, নেই ফাইল-ট্র্যাকিং সফটওয়্যারও। অ্যানালগ পদ্ধতিতে আটকে থাকা প্রতিষ্ঠানটি সেবার পরিবর্তে নিত্যদিন বাড়িয়ে চলেছে গ্রাহকের দুর্ভোগ।
জমি বা ফ্ল্যাটের কিস্তি, নামজারি, দলিল হস্তান্তর, বকেয়া ও বিলম্ব ফি পরিশোধসহ নানা বিষয়েই গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের গ্রাহকদের পড়তে হচ্ছে জটিলতার মুখে। আবেদন পরিস্থিতি জানতে গিয়ে ঘুরতে হচ্ছে টেবিল থেকে টেবিলে। নিরুপায় হয়ে অনেকে দালালের শরণাপন্ন হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, পুনর্বাসন প্লট বা ফ্ল্যাটের দায়মুক্তির জন্যও ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রাহক। আবেদনের পর তারা জানতে পারছেন না, ফাইল কোথায় আছে বা কোন দপ্তরে আছে। ১৫ কর্মদিবসে নামজারি সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও পেরিয়ে যাচ্ছে মাসের পর মাস। অনলাইনে সেবা না পাওয়ায় গ্রাহকরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। সংস্থার ওয়েবসাইটে রয়েছে কেবল পুরোনো নোটিস ও লটারির ফলাফল। নেই আবেদন ট্র্যাকিং বা কাগজপত্র যাচাইয়ের সুযোগ। সংস্থাটির কর্মকর্তারাও বলছেন, তথ্য যাচাই না করে হস্তান্তরের অনুমতি দিলে বাড়তে পারে জালিয়াতি ও প্রতারণা। তাই বিক্রেতার উপস্থিতি নিশ্চিত করা ও ভিডিও রেকর্ড রাখা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা শাখায় সেবাগ্রহীতাদের ভিড় লেগেই থাকে। তাদের আশপাশে ঘোরে দালাল চক্রের সদস্যরা। অভিযোগ রয়েছে, দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে কাজ দ্রুত হয়, না হলে ভোগান্তির শেষ থাকে না। বাবার ফ্ল্যাটের নামজারির জন্য আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিরপুরের এক নারী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘২০১৭ সাল থেকে ঘুরছি। আজ এক কথা বলে, কাল আরেক কথা। যেন আমাকে চিনেই না। ফাইলটা এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ছোড়াছুড়ি করে। শুধু শুধু হয়রানি করছে। এখানে দালালদের সঙ্গে কর্মচারীদের যোগসাজশ আছে। ফোনে ফোনে তারা যোগাযোগ করেন। দালাল ধরলে হয়তো কাজটা এত দিনে হয়ে যেত।’
মিরপুর থেকে নামজারি করতে আসা মো. রুবেল বলেন, ‘তিন মাস আগে কাগজ জমা দিয়েছি। এখনও বলছে, ফাইল ওপরে ওঠেনি। কর্মকর্তারাও বলতে পারেন না, কোন ফাইল কোথায় আছে। অনলাইনে খোঁজ নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে মোবাইলে খোঁজ নিতে পারতাম। এখানে সেবার নামে যা হচ্ছে, তা পুরোটাই ভোগান্তি।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা শাখার পুরো রেকর্ড রুমের দায়িত্বে রয়েছেন দুজন রেকর্ড কিপার ও একজন পিওন। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত সব ফাইলই সেখানে সংরক্ষিত। দেখা যায়, পুরোনো অনেক ফাইলে মরিচা ধরেছে। ধুলায় ঢেকে গেছে গুরুত্বপূর্ণ নথি। কোনো কোনো ফাইল খুঁজে পেতে দু-তিন দিন পর্যন্ত লেগে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রেকর্ড কিপার বলেন, ‘প্রায় ৬০ বছর আগের ফাইলও এখানে আছে। কোনো ফাইলের রিকুইজিশন দিলে তা খুঁজে বের করি। কখনও একটা ফাইল খুঁজতেই পুরো দিন চলে যায়। আবার কখনও দু-তিন দিন লেগে যায়। মিরপুর ও মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফাইল থাকে প্রধান কার্যালয়ে। যদি কোনো আইনি জটিলতা থাকে, তাহলে ফাইল চলে যায় আইন শাখায়। জেলা অফিসগুলোর নথি স্থানভেদে আলাদা করে সংরক্ষিত।’
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু নতুন প্রকল্প নিলেই হবে না, বিদ্যমান সেবার মান বাড়ানোও জরুরি। ডিজিটাল প্লাটফর্ম ছাড়া তা সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ডিজিটালাইজেশন এখন প্রতিটি সংস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল হলে নাগরিকদের জন্য সেবা পাওয়া সহজ হয়। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে ডিজিটাল করতে বিপুল অর্থ প্রয়োজনÑ এই ধারণা ঠিক নয়। মাইন্ডসেট ঠিক থাকলে স্বল্প ব্যয়েই এটি করা সম্ভব। যেহেতু সংস্থাটি ভূমি ও আবাসন নিয়ে কাজ করে, তাই অনলাইন সেবা নিশ্চিত হলে সাধারণ মানুষও আবেদন করতে পারবে। সেবা সহজ হবে।’
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে অটোমেশনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে সংস্থাটির চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. নুরুল বাসির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যুগের চাহিদা অনুযায়ী মানুষের ভোগান্তি কমাতে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে অটোমেশনের আওতায় আনা হবে। সেবাগ্রহীতাদের জন্য সমন্বিত ডিজিটাল প্লাটফর্ম তৈরি করা হবে। ইতোমধ্যে একীভূত ই-সেবা ব্যবস্থাপনার জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে নাগরিকরা ঘরে বসেই প্লট, ফ্ল্যাট বরাদ্দ, পেমেন্ট, আবেদন ও ট্র্যাকিংসহ সব তথ্য ও সেবা পাবেন।’
দালালদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেবাগ্রহীতাদের আরও সচেতন হতে হবে। আমার দপ্তর সবার জন্য খোলা। আমি সবার কথা শুনি।’
গণপূর্ত অধিদপ্তর সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আবাসন প্রকল্প নিলেও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ প্রকল্প নেয় সাধারণ মানুষের জন্য। ২০০১ সালে ‘গৃহসংস্থান অধিদপ্তর’ পুনর্গঠন করে গঠিত হয় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। সংস্থার সর্বশেষ প্রকাশিত ম্যাগাজিনে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ঢাকাসহ সারা দেশের ৩৮ জেলায় ও ৮ উপজেলায় ৬৬টি হাউজিং এস্টেট প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব হাউজিং এস্টেটে অধিগ্রহণকৃত জমির পরিমাণ ৭৮৭০.২৭ একর। এতে ১৮টি ফ্ল্যাট প্রকল্পে ৫ হাজার ৬৫৪টি ফ্ল্যাট এবং ৪১টি প্লট প্রকল্পে ২১ হাজার ৫৫৪টি প্লট তৈরি করা হয়েছে এবং এসব প্রকল্পে বরাদ্দগ্রহীতারা বসবাস করছেন।