অনিশ্চিত পথের মোড়ে বাংলাদেশ
বিশেষ প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৫ ১২:৩৫ পিএম
আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৫ ১২:৫১ পিএম
যে মুক্তির এবং শুভ ও ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা নিয়ে বাংলাদেশের তরুণেরা রাজপথে বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে অকাতরে জীবন দিয়েছে, সেই রক্তভেজা বিজয়ের প্রথম বার্ষিকী ছুঁতে যাওয়া সময়ে হতাশার কালো মেঘে ভরে গেছে সকলের হৃদয়াকাশ। আবারও সংঘাতের ছোবল ও রাজনৈতিক হানাহানি জাতিকে দিকচিহ্নহীন এক অনিশ্চিত প্রান্তরে এনে দাঁড় করিয়েছে। আমাদের আগামীর নিয়তি কি সংকট, বিপর্যয় নাকি সব প্রতিকূলতাকে পরাহত করে বিজয় ও সম্ভাবনার পথে যাত্রাÑ সেই জ্বলন্ত প্রশ্ন এখন সকলকেই কুরে কুরে খাচ্ছে।
পেছনের কথা
বাংলাদেশে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের
সর্বসম্মত পদ্ধতি ছিল। এই পদ্ধতির আওতায় মোটামুটি গ্রহণযোগ্য কয়েকটি নির্বাচনও হয়েছিল।
শেখ হাসিনা আদালতের দোহাই দিয়ে ২০১১ সালে সে পদ্ধতি বাতিল করেন এবং ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন
করার বিধান ফিরিয়ে আনেন। এরপর ক্ষমতায় থেকে তারা ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে পরপর তিনটি
নির্বাচন করে নিজেদের ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করেছেন। সেগুলো আদপে কোনো নির্বাচন ছিল না।
নানা অপকৌশলে নির্বাচনকে কলঙ্কিত ও প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল। মানুষ ভোট দিতে পারেনি।
জনগণ ভোটাধিকার হারাবার পথ ধরে ক্রমে অন্যসব অধিকার হারায়। মতপ্রকাশ, সংগঠন, সমাবেশসহ
অন্যান্য গণতান্ত্রিক অধিকারও বিপর্যস্ত হয়। রাষ্ট্রকে তারা দানবীয় যন্ত্রে পরিণত করে
অবাধে গুম, খুন, নির্যাতন চালাতে থাকেন।
তারুণ্যের বিদ্রোহ : পটবদল
চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-তরুণদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ফ্যাসিবাদবিরোধী
এক দফার আন্দোলনে উন্নীত হলে দল-মত নির্বিশেষে হাসিনা রেজিম-বিরোধী জনতা বিদ্রোহ করে।
সারা দেশ নেমে আসে রাজপথে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা রেজিমের পতন ঘটে। আন্দোলনকারী রাজনৈতিক
দল ও শক্তিগুলোর সম্মতি ও সমর্থনে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে
ইন্টেরিম সরকার দায়িত্ব নেয়। এই সরকার তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হিসেবে তিনটি
লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেÑ ১. ফ্যাসিবাদী অপরাধীদের বিচার ২. রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজনীয়
সংস্কার ও ৩. একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন।
এবং তারপর
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হবার পর তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম ক্ষমতায়
থাকাকালের অপরিসীম অপরাধের কারণে স্থগিত রেখেছে সরকার। এ অবস্থায় সর্ববৃহৎ দল বিএনপি
দ্রুত নির্বাচন দাবি করে। সরকার নির্বাচনের স্পষ্ট রূপরেখা দিতে গড়িমসি করায় বিএনপির
সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। ড. ইউনূসের লন্ডন সফরকালে সেখানে প্রবাসী বিএনপির
অ্যাক্টিং চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। এতে আগামী রোজার আগে ফেব্রুয়ারিতে
নির্বাচন ও অন্যান্য কিছু বিষয়ে তাদের মধ্যে সমঝোতা হলে উত্তেজনা প্রশমিত হয়। এই সমঝোতাকে
প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য দলগুলো ভালো চোখে দেখেনি। তারা সংস্কার ও নির্বাচন পদ্ধতিসহ বিভিন্ন
বিষয়ে বিএনপির মতামতের বিপরীতে কঠোর অবস্থান নেওয়া শুরু করেছে। তরুণদের নবগঠিত দল অভিযোগ
তোলে, বিএনপি আবারও দেশকে পুরনো রাজনীতির ফাঁদে ফেরাতে চায়। এসব ঘটনা রাজনৈতিক দলগুলোর
পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছে এবং নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
ভাঙা এক রাষ্ট্র
এদিকে ফ্যাসিস্ট রেজিম দীর্ঘদিন পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনকে জনগণ ও বিরোধী
দলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। হাসিনার পতনের পর এরা পুরোই অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে
আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। এই সুযোগে নানা প্রেসার গ্রুপ উচ্ছৃঙ্খলতার আশ্রয় নিচ্ছে,
অনেকে দলবদ্ধভাবে আইন হাতে তুলে নিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে, যা মবক্রেসি নামে পরিচিতি
পেয়েছে। শক্তিশালী রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় নেতাকর্মীরা ভয় দেখিয়ে দখল ও চাঁদাবাজিতে
নেমে পড়ায় পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। নানা নৃশংস ঘটনা সাধারণ মানুষদের সন্ত্রস্ত
ও নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে। অনেকেই বর্তমান সরকারকে দুর্বল ও অকেজো ভাবতে শুরু করেছে।
সম্প্রতি নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপির তরুণ নেতারা গোপালগঞ্জে সভা করতে গেলে হাসিনা
সমর্থক সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা
ও যানবাহন তাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে মোতায়েন সেনারা
গুলি চালালে এ পর্যন্ত পাওয়া হিসাবে পাঁচজন নিহত ও অনেকে আহত হয়। পরিস্থিতির এই অবনতিশীল
মোড় সময়মতো সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আবারও সংশয় সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচনী অনিশ্চয়তা ও আগামী রাজনীতি
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করলে দেখা যাচ্ছে, ড. ইউনূস সরকারের লক্ষ্য
ও বাস্তবতার মধ্যে একটি বিপজ্জনক ফাঁক তৈরি হচ্ছে। একদিকে নির্বাচন চেয়ে চাপ বাড়াচ্ছে
বিএনপি, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো সংস্কারহীন নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার হুমকি
দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির দিকে আরও এগোতে থাকলে নির্বাচন আয়োজনে বাস্তব
বাধা তৈরি হতে পারে। তবে আশার দিক হলো, জনমনে এখনও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রবল। ছাত্র-যুবাদের
রাজনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতি এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক জাগরণ রাজনীতির নতুন ধারার
ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই ধারা যদি পুরনো শক্তিশালী দলগুলো আত্মস্থ করতে পারে এবং যদি অন্তর্বর্তী
সরকার সুষ্ঠু ও সর্বগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের রূপরেখা নির্ধারণ করতে পারে, তবে একটি গণতান্ত্রিক
নবযাত্রা সম্ভব। অন্যথায় অস্থিরতা, হতাশা এবং অরাজকতার মাঝে দেশের ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চয়তার
দিকে গড়িয়ে পড়তে পারে।