কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৫ ০৯:৫৭ এএম
‘দু্ই মাস ধরে ঝালমুড়ি বিক্রি করি, আগে প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকার বিক্রি করতাম। এখন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করতেও হিমশিম খাচ্ছি। পরিবার নিয়ে ঢাকা শহরে টেকা খুবই কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মানুষ না থাকলে ভাই আপনাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতাম।’ চোখে অশ্রু, আর কণ্ঠে একরাশ হতাশা নিয়ে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোডের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন ঝালমুড়ি বিক্রেতা আলামিন খান।
অর্থনৈতিক টানাপড়েন, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, আয় কমে যাওয়া— সব মিলিয়ে শহরে বেঁচে থাকাটা আজ নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এক কঠিন যুদ্ধ। রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্ক ও আশপাশের এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, জীবন সংগ্রামের এমন করুণ চিত্র যেন প্রতিটি মুখেই। ঝালমুড়ি, বাদাম, ছোলা, মৌসুমি ফল কিংবা খেলনা সবকিছুরই বিক্রি কমেছে ব্যাপক হারে। মানুষ কিনতে পারছে না, ব্যবসায়ীরাও বেঁচে থাকার তাগিদে লড়ছে প্রতিদিন।
আলামিন খান খুলনায় মাছের ব্যবসা করে লোকসানে পড়ে ছয় মাস আগে ঢাকায় আসেন। এখন যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের ফুটপাতে ঝালমুড়ি বিক্রি করেন। আলাপচারিতায় জানালেন, জন্মের পর এমন কষ্ট আগে কখনও করেননি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে, কিন্তু টাকার অভাবে আর এগোতে পারেননি। এখন মাসে ৬ হাজার টাকা বাসাভাড়া, খাবারের খরচ ১৫ হাজার টাকা মিটিয়ে এই অবস্থায় সংসার গড়ার চিন্তা করতে পারছেন না।
ষাটোর্ধ্ব মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা। মাথায় বড় একটি বোল ও হাতে একটি টুল নিয়ে তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়া থেকে মহাখালী রেলস্টেশনের দিকে যাচ্ছিলেন। তার সঙ্গে কথা হয় সোমবার দুপুরে। সাতজনের সংসার মোস্তফার। তিনি নিজে ছোলা-ঘুগনি বিক্রি করেন। ছেলে ও পুত্রবধূ পাশের এক কারখানায় অল্প বেতনে চাকরি করেন। মোস্তফা জানান, বর্তমানে বেচাকেনা কম। বছরখানেক আগেও দৈনিক ১২০০-১৫০০ টাকা বিক্রি করতে পারতেন। বর্তমানে সেই বেচাকেনা কমে দাঁড়িয়েছে ৫০০-৮০০ টাকার মধ্যে। তিনি বলেন, গত রবিবার যে টাকার মাল নিয়ে গেছিলাম সেই পুঞ্জি (পুঁজি) ওডে নাই।
মৌসুমি ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ বিল্লালের চিত্রটাও আলামিনের মতোই করুণ। গত ৯ বছর ধরে কুড়িল চৌরাস্তা মোড়ে ব্যবসা করছেন। আগে প্রতিদিন ৫-৬ হাজার টাকা বিক্রি হলেও এখন তা নেমে এসেছে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। ঈদের পরে দুদিন ভালো বিক্রি হলেও তারপর থেকে ধস নেমেছে। বিল্লাল বলেন, মানুষের হাতে এখন টাকা নাই। শুধু পণ্যের দাম না, আয়ও কমে গেছে।
ভাজাপুরি বিক্রেতা শাহিন বলেন, আগে বিকাল হলেই পুলিশ এসে ২৪০ টাকা চাঁদা নিত। এখন আর সেই চাঁদা দিতে হয় না, এটা অবশ্যই ভালো দিক। কিন্তু বিক্রিও আগের মতো হয় না। গাইবান্ধার এই ব্যবসায়ী ছয় বছর ধরে রাজধানীতে ভ্রাম্যমাণ খাবার বিক্রি করছেন। তার মতে, আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নেই, যার ফলে দিন শেষে কিছুই হাতে থাকে না। যা সারা দিনে বিক্রি করি তাতে লাভ খুব কমই থাকে।
বাদাম ও ছোলা বিক্রেতা রফিকুল ইসলামের অভিজ্ঞতাও একই রকম। আগে প্রতিদিন ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা বিক্রি করলেও বর্তমানে কমে এসেছে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায়। তিনি বলেন, ‘আজ (মঙ্গলবার) ৯০০ টাকার বিক্রি হয়েছে। গরমে এমনিতেই বিক্রি কম, তবে এবার মনে হচ্ছে পরিস্থিতি আরও খারাপ।’
কুড়িল বিশ্বরোডের কুড়াতলী বাজারে বাচ্চাদের খেলনা বিক্রি করেন আবদুল আওয়াল নামের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। প্রতিদিন মাটিতে মাদুর বিছিয়ে মালামাল বিক্রি করেন। তিনি বলেন, মানুষের হাতে টাকা নাই, মাত্র ঈদ গেছে। তারপরও ৫ টাকা, ১০ টাকার জিনিস নিয়েও দামাদামি করে। মাঝে মাঝে লোকসান করে জিনিস বিক্রি করতে হয়।
বিক্রির মন্দার কারণ জানতে চাইলে এসব বিক্রেতা জানান, এখন মানুষের হাতে টাকা কম। পণ্যের দাম বাড়ছে, কিন্তু আয় বাড়ছে না। ফলে কম আয়ের মানুষ যেমন প্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছে, তেমনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও আয় হারিয়ে জীবিকার টানে আরও হতাশ হয়ে পড়ছেন। এদের কারও কারও মতে, আগের মতো শহরের ফুটপাতে মানুষজনের ভিড় কম। সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে কি নাÑ এ আশঙ্কাও জেগে উঠছে তাদের মনে।
নিম্ন আয়ের মানুষের উপার্জন কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে মানুষ কেনাকাটা কমিয়ে দেয়। আর যখন বেচাবিক্রি কমে যায় তখন ব্যবসায় লাভও কমে যায়। অন্যদিকে তার প্রতিদিনের খরচ কিন্তু কমে না। বিশেষ করে তাদের দৈনিক রাস্তায় চাঁদা, বিদ্যুৎ খরচ, দোকান ভাড়া, বাসাভাড়া, খাবার, পরিবহন, সন্তানদের শিক্ষা ইত্যাদির খরচ কমানো যায় না। অথচ লাভের পরিমাণ কমে। আর খরচ ঠিকই থেকে যায়। এর ফল দাঁড়ায় তাদের আয় কমে যাওয়া।