পায়রা বন্দর
আরমান হেকিম
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৫ ১১:১৩ এএম
পায়রা বন্দরের খনন ও অবকাঠামো উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। পর্যাপ্ত নাব্যতা না থাকায় এখনও বড় জাহাজ চলাচলের উপযোগী হয়ে ওঠেনি বন্দরটি। এমন বাস্তবতায় আবারও প্রায় ৪ হাজার ৬৬২ কোটি টাকার একটি নতুন প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, শুধু বন্দরটিকে সচল রাখতে। সরকারি পর্যায় থেকেই পায়রা বন্দরের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একে ‘অর্থনীতির বিষফোড়া’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরাও বন্দর ঘিরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটির নাম- ‘পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের রক্ষণাবেক্ষণ খনন ও হপার ড্রেজার সংগ্রহ।’ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এ প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ সম্প্রতি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এই প্রস্তাব পর্যালোচনা করেছে। সংশোধনীর সুপারিশ সাপেক্ষে একনেকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয় বলে জানিয়েছেন কমিশনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
চলতি বছরের মার্চে এক সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ পায়রা বন্দরকে ‘অর্থনীতির বিষফল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘বন্দর চালু রাখতে প্রতি বছর দুটি ড্রেজারের প্রয়োজন হবে, মূলত পাশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানির সুবিধার্থে। তার মতে, পায়রা আসলে সমুদ্রবন্দর নয়; বরং ছোট নৌযানের জেটির মতো।’
এমনকি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেটোত্তর ব্রিফিংয়েও তিনি এই বিনিয়োগকে ভুল সরকারি সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেন। তবে তিনি এক পরিদর্শন শেষে মত দেনÑ চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে পায়রা বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
অন্যদিকে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাসুদ ইকবালও বন্দরটির ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি বলেন, বন্দরের প্রথম জেটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও সবচেয়ে বড় সংকট হলো নাব্যতা। এ সমস্যার কারণে বন্দর পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে চালু করা যাচ্ছে না। তিনি স্বীকার করেন, অতীতে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এই প্রকল্পে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।
তবে তিনি আশাবাদী মনোভাবে বলেন, আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে টেকসই পরিকল্পনায় এগিয়ে যেতে চাই। আগামী জুলাই ২০২৬ নাগাদ পায়রা বন্দরের প্রথম টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর লক্ষ্যে কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় চ্যানেলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ খননের জন্য দুটি ট্রেইলিং সাকশন হপার ড্রেজার কেনা হবে, যার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ খরচ হবে খনন কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট খাতে।
এ প্রকল্প ছাড়াও পায়রা বন্দরের ডিজিটালাইজেশনের জন্য ১৬১ কোটি টাকা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সুবিধার জন্য ৪৯০ কোটি টাকার দুটি পৃথক প্রকল্পও পিইসি সভায় উঠতে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে পায়রা বন্দরে আগামী তিন বছরে নতুন ব্যয় হতে পারে ৫ হাজার ৩১২ কোটি টাকার মতো।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্প ও একটি রাজস্ব কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৭ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছে মূলধন খনন ও রক্ষণাবেক্ষণে।
তা সত্ত্বেও চ্যানেলের নাব্যতা রক্ষা করা যায়নি। ফলে পুরনো প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে, যার জবাবে পিইসি সভা থেকে সুপারিশ করা হয়েছেÑ চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে বন্দরের রাজস্ব ও ব্যয়ের হিসাব এবং নতুন খনন থেকে প্রত্যাশিত আয় বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত নতুন খনন প্রকল্প এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ ৭৫ কিলোমিটার রাবনাবাদ চ্যানেলে ১০.৫ মিটার খনন গভীরতা বজায় রাখতে চায় এবং দুটি ট্রেইলিং সাকশন হপার ড্রেজার কিনতে চায়।
কর্মকর্তারা বলছেন, এতে করে ৪০ হাজার ডেডওয়েট টনের প্যানাম্যাক্স শ্রেণির বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। তবে এ মুহূর্তে যখন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে, রাজস্ব আয় ধীরগতির এবং উন্নয়ন সহযোগিতা হ্রাস পাচ্ছে, তখন সরকারি বিনিয়োগের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অতীতে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় দেখা গেছে এবং অনেক অপ্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতি এখন সেসব ভুলের খেসারত দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘যেহেতু ইতোমধ্যে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে এবং বন্দরটি সীমিত আকারে ব্যবহার হচ্ছে, এখন যদি এটি চালু না রাখা হয়, তাহলে সেই সব টাকাই অপচয় হবে।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বাকি অবকাঠামো খুব খরচসাশ্রয়ীভাবে নির্মাণ করতে হবে এবং বন্দরের ব্যবহার সর্বোচ্চ করতে হবে, যাতে করে আর্থিক ক্ষতি কমানো যায়।’
বন্দরের খনন ইতিহাস দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল। ২০১৩ সালে এটি একটি প্রধান প্রকল্প হিসেবে শুরু হয়েছিল, উদ্দেশ্য ছিল দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। শুরু থেকেই এটি ব্যয়বহুল মূলধন ও রক্ষণাবেক্ষণ খননের ওপর নির্ভরশীল।
প্রথমে খননের জন্য একটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) চুক্তির মাধ্যমে বেলজিয়ান কোম্পানি জান ডি নুলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আর্থিক জটিলতা ও দ্বন্দ্বের কারণে পরে এই চুক্তি বাতিল করে সরকার নিজেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে।