চামড়া শিল্প
ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:৫৮ পিএম
ফাইল ফটো
তৈরি পোশাকের পর দেশের রপ্তানিতে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাময় খাত হচ্ছে চামড়া শিল্প। ৮৫ বছরের পুরোনো এই শিল্প সাত-আট বছর ধরে চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। একের পর এক সমস্যার পাহাড় এসে দাঁড়াচ্ছে শিল্পটির সামনে। যে গতিতে অগ্রসর হওয়ার কথা ছিল তার বদলে যাচ্ছে পিছিয়ে। চামড়ার বৈশ্বিক বাজারের আকার ২৪১ বিলিয়ন ডলার হলেও বাংলাদেশের অনুকূলে বলতে গেলে খুবই কম। শিল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দরকার সরকারের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা। নিতে হবে পরিকল্পিত পদক্ষেপ, দিতে হবে আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা।
ভারতবর্ষের এই অঞ্চলে সর্বপ্রথম ট্যানারি প্রতিষ্ঠা করেন রণদা প্রসাদ সাহা। তিনি ১৯৪০ সালে নারায়ণগঞ্জে ট্যানারি প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর ১৯৫১ সালে ঢাকার হাজারীবাগে স্থাপিত হয় ট্যানারি শিল্প। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তর হয় ট্যানারি শিল্প। সে হিসাবে দেশে শিল্পটির বয়স ৮৫ বছরের মতো। দীর্ঘ এই পথচলায় চামড়া শিল্পটি উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির পথে ধাবিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই রপ্তানি খাতকে নানামুখী সমস্যা কেবলই পেছনের দিকে টেনেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয় ৫২ কোটি ২৭ লাখ ১৯ হাজার ৯১৬ দশমিক ১ ডলারের।
অথচ আগের বছর ২০২২-২৩ অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৬১ কোটি ৯৪ লাখ ৪৬ হাজার ৯০৩ দশমিক ২২ ডলারের পণ্য।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০৩ কোটি ৯১ লাখ ৪৮ হাজার ৭৮৭ ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ১১৭ কোটি ৫৪ লাখ ৬১ হাজার ৫৪৪ ডলারের পণ্য। তার আগের বছর ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ১২৪ কোটি ৫১ লাখ ৭৬ হাজার ২৮৯ ডলারের পণ্য। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানেও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি কমেছে ২১ কোটি টাকা।
কেন কমছে রপ্তানি
দেশে বছরে ৪০০ কোটি বর্গফুট কাঁচা চামড়া সংগ্রহ হয়ে থাকে। এর বড় অংশই আসে কোরবানির ঈদের জোগান থেকে। আর সংগৃহীত এ বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়ার মধ্যে নষ্ট হয় ৫০ লাখ বর্গফুট। বাকিটার বড় অংশই কাঁচা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য হিসেবে রপ্তানি হয়ে থাকে।
কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতায় বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি দিন দিন কমছে। বিশ্বের চামড়াজাত পণ্যের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক। এসব দেশের ব্র্যান্ডের ক্রেতারা চামড়া কিনতে সময়োপযোগী মান, ট্যানারিগুলোর পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। এতে দরকার পড়ে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ। এই সনদ না থাকায় ইউরোপ ও আমেরিকার বাজার অনেকটা হাতছাড়া।
বর্তমানে বাংলাদেশের চামড়া রপ্তানির বড় বাজার চীন। কেননা চীন এসব সনদের ধার ধারে না। তবে চীনের রপ্তানি আদেশও অস্থিতিশীল। দেশটি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য আমদানি করতে ন্যূনতম তিনটি প্রতিষ্ঠানে অর্ডার দেয়। পরবর্তীতে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য নেয়। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেওয়া কথা তারা রাখে না।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, দেশে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চামড়াসহ সব ধরনের পণ্যসামগ্রী রপ্তানি হয়েছে ৫৭ কোটি ৭২ লাখ ৯১ হাজার ১২৪ দশমিক ৯৫ ডলারের। তার মধ্যে কাঁচা ও ফিনিশড চামড়া রপ্তানি হয়েছে ৬ কোটি ২৪ লাখ ৮২ হাজার ২৩৭ দশমিক ৩৯ ডলার।
এই সময়ে জুতা, হ্যান্ডব্যাগসহ চামড়াজাত বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয়েছে ১৬ কোটি ১৯ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫৯ দশমিক ২২ ডলারের। আর খেলনা ও কৃত্রিম পশমের উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৫৫৩ দশমিক ৩৪ ডলারের। এর বাইরে পাদুকা, রাবার, প্লাস্টিক, চামড়া ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩৫ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার ৫৯২ ডলারের।
বাংলাদেশ থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হওয়া দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, চীন, কানাডা, জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, গ্রিস, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, লাউস, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, মেক্সিকো, মালয়েশিয়া, ওমান, পাকিস্তান, পর্তুগাল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ আফ্রিকা অন্যতম।
চামড়ার বৈশ্বিক বাজার
বর্তমানে চামড়ার বৈশ্বিক বাজারের পরিধি প্রায় ২৪১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কাঁচা চামড়ার বাজার প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল বাজার মূলত বড় কয়েকটি দেশের নিয়ন্ত্রণে। ওয়ার্ল্ড ইন্টিগ্রেটেড ট্রেড সলিউশনসের (ডব্লিউআইটিএস) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার চীনে ২৬ দশমিক ২৭ ও হংকংয়ে ৩৪ দশমিক ৩৫সহ মোট ৬০ দশমিক ৬২ শতাংশ। এর বাইরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
ডব্লিউআইটিএসের তথ্যমতে, চামড়ার বাজারের শীর্ষে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপরই রয়েছে চীন, সুইজারল্যান্ড, হংকং, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি ও ভিয়েতনাম। এই দেশগুলো চামড়া রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিচ্ছে। আবার চামড়ার বড় আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। এরপরের স্থানে রয়েছে চীন।
বিশ্বে চামড়ার বাজারে এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের জন্য একটি স্থান দখলের সুযোগ রয়েছে। সেজন্য প্রয়োজন সঠিক মান নিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন করা।
অভ্যন্তরীণ বাজারচিত্র
দেশে উৎপাদিত চামড়ার ২৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহার হয়। অবশিষ্ট ৭৫ শতাংশই রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। তবে কমপ্লায়েন্সের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ৪০০ কোটি বর্গফুট কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়। তার মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ বর্গফুটই নষ্ট হয়ে যায়। অবশিষ্ট ৩৫০ কোটি বর্গফুট প্রক্রিয়াজাত করা হয়। গত বছর সরকার কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছিল প্রতি বর্গফুট ৫৫-৬০ টাকা। এতে করে চামড়ার বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। আর প্রক্রিয়াজাত চামড়ার বাজারমূল্য দাঁড়ায় ৩৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বা ৩ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার।
সরকারি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্যমতে, দেশে চামড়ার মোট বাজার ৩ বিলিয়ন ডলারের। এটি প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করে ফিনিশড লেদার রপ্তানি করতে পারলে বাজার দাঁড়াবে ১০ বিলিয়ন ডলারে।
যা বলছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা
চামড়া শিল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে এই প্রতিবেদকের কথা হয় ঢাকা হাইড অ্যান্ড স্কিনস লিমিটেডের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর এএফএম রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘চামড়া খাত বরাবরই লাভজনক একটি শিল্প ছিল। কিন্তু ২০১৭ সালে অপরিকল্পিতভাবে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভার উপজেলার হেমায়েতপুরে শিল্পটি স্থানান্তরের পর করুণ দশা বিরাজ করছে। আমাদের এই প্রতিষ্ঠান আগে বছরে ১৩০ কোটি টাকার চামড়া রপ্তানি করত। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৩০ কোটি টাকায়। অথচ এই সময়ে খাত-সংশ্লিষ্ট সবকিছুর ব্যয় বেড়েছে।’
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববাজারে আগে প্রতি বর্গফুট চামড়া ২ বা ২ দশমিক ৫০ ডলারে রপ্তানি করা যেত। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১ দশমিক ১০ সেন্টে। চামড়া প্রক্রিয়াজাতের জন্য লবণ ছাড়া সব রাসায়নিকই আমদানি করতে হয়। গত পাঁচ বছরে সব ধরনের রাসায়নিকে গড়ে ৩০ থেকে ৩৪ শতাংশ দাম বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শিল্পটিকে বাঁচাতে হলে সরকারকে নতুন করে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ঋণ পর্যায়ক্রমে পরিশোধের সুযোগ রাখতে হবে। তা না হলে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। পোশাক শিল্পের মতো সার্বিকভাবে নীতি-সহায়তা না দিলে চামড়া শিল্পকে কোনোভাবেই দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি শিল্প হিসেবে গড়ে তোলা যাবে না।’
ঢাকা হাইড অ্যান্ড স্কিনস লিমিটেডের বোর্ড অব কোম্পানির সদস্য মহিউদ্দীন ভুইয়া বলেন, ‘২০১৭ সালের পর থেকে চামড়া শিল্প ক্ষতির মুখে পড়েছে। আমাদের এখন সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার চীন। তারা সবসময় কথা রাখে না। রপ্তানি গন্তব্যের যোগ্য বিকল্প না থাকায় তারপরও আমাদের কিছু করার থাকে না।’
দেশে প্রথম এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে রিফ লেদার লিমিটেড চট্টগ্রাম। ২০১৯ সালে প্রথম ব্রোঞ্জ ও চলতি বছর গোল্ড সনদ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রিফ লেদার লিমিটেডের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড সেলস) মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে সারা বিশ্বেই চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ব্যবহার কমছে। সিনথেটিক পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধিই এর মূল কারণ। চামড়াজাত পণ্যের বাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। এতে বৈশ্বিক বাজারে চামড়ার দাম কমছে।’
তিনি বলেন, ‘আগে আমরা যেখানে এক কন্টেইনার পণ্য বিক্রি করতে পারতাম, এখন তাদের কাছে ২০-২২ হাজার পিস পণ্য বিক্রি করছি। তবে সার্বিক দিক দিয়ে আমাদের চামড়াজাত পণ্যের ব্যবহার ভালো। বর্তমানে আমরা ইতালি ও স্পেনসহ ইউরোপের বাজার এবং চীন, জাপান ও ভারতের বাজারেও পণ্য রপ্তানি করছি।’
বাংলাদেশে একটি টেকসই চামড়া খাত বিনির্মাণে ১ মার্চ ২০২৩ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ৩ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে দি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। এ লক্ষ্যে হাজারীবাগ, সাভারের হেমায়েতপুরের ২০টি ট্যানারি, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, ঢাকা ও গাজীপুরের ২৫টি জুতা উৎপাদনকারী কারখানা এবং ৫টি চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য চামড়া শিল্পের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি টেকসই চামড়া খাত গড়ে তোলা। প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর মো. কবির হোসেন এ সম্পর্কে বলেন, ‘বর্তমানে রপ্তানি আয়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের অবদান ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। আর মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) অবদান দশমিক ৬০ শতাংশ। বৈশ্বিক বাজারের মাত্র ৩ শতাংশ বাংলাদেশের দখলে।’
তিনি বলেন, ‘ট্যানারি খাতে সম্পৃক্তদের মধ্যে অল্প কিছু ছাড়া বাকিরা এলডব্লিউজি সনদ না থাকার কারণে পণ্য রপ্তানি করতে পারছে না। এক্ষেত্রে ট্যানারি ও ফুটওয়্যার সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে এলডব্লিউজি সনদ পেতে পারে, সেজন্য সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা হচ্ছে যাতে করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সহায়তা করা হয়। আর এসবের ফলে ট্যানারি ও ফুটওয়্যার খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাও আগ্রহী হয়ে এলডব্লিউজির সনদ অর্জন করতে পারে। আর সনদ পেলে রপ্তানি আয় বাড়বে।’
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. টিপু সুলতান বলেন, ‘শতবর্ষের চামড়া শিল্পটি হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে চলে যাওয়ায় নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এসবের মধ্যে অন্যতম হলো, ব্যাংকগুলো ঋণ দিচ্ছে না। ট্যানারি মালিকদের কাছে আমাদের ১৫ বছর আগের ১১০ কোটি পাওনা রয়েছে। তারা তা পরিশোধ করছে না। এসব টাকা আড়তদারদের কাছে না এলে আমরা কোথায় পুঁজি পাব। আমরা পুঁজিশূন্যতায় ভুগছি। প্রান্তিক পর্যায় থেকে চামড়া আমদানি করতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘আগে প্রতি বর্গফুট চামড়া ২ ডলার বা তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা যেত। এখন তা নেমে এসেছে ১ ডলার কয়েক সেন্টে। চামড়া শিল্পের বাজার মূলত রপ্তানিমুখী। আগে ইউরোপ, হংকং ও চীনে রপ্তানি করা হতো। এখন শুধুই চীনের বাজারের মধ্যে আটকে আছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অবস্থা নেতিবাচক।’
টিপু সুলতান বলেন, ‘আমাদের চামড়ার গুণগত মান ভালো ছিল। কিন্তু রপ্তানির ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। আমাদের দেশে চামড়া খাত মার খাচ্ছে অথচ ভারতে নতুন নতুন ট্যানারি গড়ে উঠছে। তারা চামড়া খাতকে সমৃদ্ধ করছে। আগে আমাদের দেশ থেকে ভারত কাঁচামাল সংগ্রহ করে প্রসেসিং করে রপ্তানি করত। এখন তারা নিজেরাই কাঁচামাল উৎপাদন করছে।’
আর্টিফিসিয়াল লেদারের কারণে চামড়ার বৈশ্বিক বাজারে নেতিবাচক অবস্থা বিরাজ করছে বলে উল্লেখ করেন টিপু সুলতান। তিনি বলেন, ‘আগে কেডস, সু এসব চামড়া দিয়ে তৈরি হতো। এখন রেকশন, আর্টিফিসিয়াল লেদার দিয়ে জুতা তৈরি করে চীন বিশ্ববাজার দখল করছে। তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্বে চামড়া শিল্পের বাজার আছে ২০০ বিলিয়ন ডলারের। আগে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি হলেও গত চার বছর ধরে ১ বিলিয়নের কিছু বেশি রপ্তানি হচ্ছে। এ শিল্পকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে প্রচুর পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার। সিইটিপি ভালোভাবে তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশ থেকে মেশিনারিজ সংগ্রহ করতে হবে। এসব করা গেলে রপ্তানিতে গতি আসবে এবং আগের বাজার ফিরে পাওয়া সহজ হবে।’