ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:১৫ এএম
ছবি : সংগৃহীত
স্থানীয় সরকারব্যবস্থা দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে একগুচ্ছ সুপারিশ যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ স্থানীয় নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক থাকবে না এবং মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ ছাড়াই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংসদ সদস্যরা উন্নয়ন পরিষদে উপদেষ্টা থাকবেন নাÑ এমন সুপারিশও থাকছে।
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন সুপারিশগুলো চূড়ান্ত করে শিগগির প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংস্কার কমিশন মনে করে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে হলে একটি স্বতন্ত্র কমিশন থাকা প্রয়োজন। কারণ কমিশন থাকলে কোনো রাজনৈতিক দল অহেতুক দলীয় প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। উপরন্তু স্থানীয় সরকার শক্তিশালী ও জবাবদিহিতায় রাখতে এই পদক্ষেপ সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারবে। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের খবরদারিরও সুযোগ থাকবে না।
বিদ্যমান আইনে সংসদ সদস্যরা উপজেলা উন্নয়ন পরিষদে উপদেষ্টা হিসেবে থাকছেন। এর ফলে তাদের প্রভাবের বাইরে গিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ভূমিকা রাখতে পারেন না। তা ছাড়াও নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নে সংসদ সদস্যদের হস্তক্ষেপ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এজন্য তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখতে সংবিধানের অনুচ্ছেদ (৫৯) এ সংশোধনী আবশ্যক।
বিদ্যমান বিধানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে হবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে থাকবে অভিন্ন আচরণবিধি। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার স্তরে নির্বাচনী মেয়াদ শেষ হলে মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ ছাড়াই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে ইসি।
বিদ্যমান অবস্থায় স্থানীয় স্তরে নির্বাচন করার একক কর্তৃত্ব নেই নির্বাচন কমিশনের। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে তারা এই নির্বাচনগুলো করে থাকে। আগামীতে ইসি যাতে নিজস্ব ক্ষমতায় স্থানীয় সরকারে নির্বাচন করতে পারে, সেই সক্ষমতা দিতে সুপারিশ করবে কমিশন।
এসব শর্ত সংযুক্ত করে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সুপারিশমালা প্রস্তুত করছে সংস্কার কমিশন। সুপারিশগুলো শিগগির চূড়ান্ত করে প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া হবে।
সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘দেশের তৃণমূলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের উন্নয়নে এটির গুরুত্ব অপরিসীম। এটি শক্তিশালী থাকলে দেশের উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা রাখবে। তাই এটি দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় একটা স্বতন্ত্র কমিশনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের হস্তক্ষেপ বন্ধের সুপারিশ করা হবে। জাতীয় সরকারের মতো স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের মেয়াদও একই হবে। এসব বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করে সুপারিশমালা প্রস্তুত করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে উপস্থাপন করা হবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে দলীয়করণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। ক্ষমতাসীনদের নিজেদের সুবিধার্থে স্থানীয় সরকার আইনে সংশোধনী আনা হয়। এর ধারাবাহিকতায় তৃণমূলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে (ইউপি) দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা হয়। এলাকার সংসদ সদস্যদের রাখা হয় উপদেষ্টা হিসেবে। বলে দেওয়া হয়, সংসদ সদস্যের পরামর্শ ছাড়া সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়া যাবে না। এমন শর্তের কারণে নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানরা ছিলেন অসহায়। তারা দলীয় আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক হয়রানির সম্মুখীন হয়েছেন। দলীয় বিবেচনায় নির্বাচন হওয়ায় মনোনয়ন বেচা-কেনার অভিযোগ উঠতে থাকে। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বিভেদ স্থায়ী রূপ নেয়।
স্থানীয় সরকার পর্যায়ে এমন হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতির নিরসন করতে গত বছরের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্থানীয় সরকার সংস্কারের লক্ষ্যে কমিশন গঠন করে। এরপর থেকে কমিশন বিভিন্ন পর্যায়ে অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলেছে। তার আলোকে সুপারিশমালা চূড়ান্ত করছে সংস্কার কমিশন।
সুপারিশে উল্লেখ থাকছেÑ বিগত আওয়ামী লীগ সরকার শুধু রাজনৈতিক কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌরসভা গঠন করে। কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই গঠন করা এসব পৌরসভা সরকারের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন শতাধিক পৌরসভা বিলুপ্ত করা দরকার। নারী আসন সংরক্ষিত না রাখার পাশাপাশি মাদক কারবারি, নারী নির্যাতনকারী, ফৌজদারি মামলার সাজাভুক্ত আসামি নির্বাচনে অযোগ্য হবে।
নির্বাচনে হলফনামায় সত্য অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। এর ব্যত্যয় তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনে কেউ অভিযোগ দিলে এবং তার সত্যতা মিললে তাকে অবশ্যই প্রার্থিতা হারাতে হবে। এমনকি তথ্য গোপন করে ওই প্রার্থী জয়ী হওয়ার পরও মিথ্যা প্রমাণ হলে তাকে পদ হারাতে হবে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় স্তরের নির্বাচনগুলো কাঠামোর মধ্যে আনতে স্বতন্ত্র কমিশন গঠনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অন্যান্য স্বতন্ত্র কমিশনের আলোকে এটি গঠনের সুপারিশ করবে কমিশন। জাতীয় সরকারের মেয়াদের মতোই স্থানীয় সরকারের মেয়াদ থাকার সুপারিশও থাকছে।
অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংসদ সদস্যরা সংসদে আইন প্রণয়ন করবেন। আইন প্রণেতা হিসেবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় তাদের নগ্ন হস্তক্ষেপ সত্যি দুঃখজনক। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। তা ছাড়া নির্দিষ্ট এলাকা নয়, সংসদ সদস্যদের সব কার্যক্রম হবে সংসদ ঘিরে, জনগণের সার্বিক কল্যাণে। অথচ বিগত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা বানিয়েছে। সেই থেকে স্থানীয় উন্নয়নে চেয়ারম্যানদের উপেক্ষা করে তারা নগ্নভাবে হস্তক্ষেপ করে নিজেদের অনুকূলে প্রকল্প করে সরকারি বরাদ্দ নিয়ে গেছেন। তারা টেস্ট রিলিফ, কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), কাবিটা, দুস্থ ভাতা, বয়স্ক ভাতা প্রদানের দিক-নিদের্শনা দিয়েছেন। তাই আইন প্রণেতা হয়েও সংসদ সদস্যরা প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশি আগ্রহী থেকেছেন।
প্রস্তাবিত সুপারিশে স্থানীয় উন্নয়নে সংসদ সদস্যদের নামে থোক বরাদ্দ বাতিলের প্রস্তাব থাকছে। সংরক্ষিত নারী আসন বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হবে। নারীদের নির্বাচনমুখী ও সক্ষম হওয়ার সুযোগ রাখতে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে তিন মেয়াদ পর্যন্ত আসন সংরক্ষিত থাকবে। প্রথমবার নির্বাচনে ১ থেকে ৩টি ওয়ার্ড হলে পরবর্তী নির্বাচনে ৪ থেকে ৬ এবং তৃতীয়বার ৭ থেকে ৯ ওয়ার্ডে শুধু নারী বনাম নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। চতুর্থ বার উঠে যাবে সংরক্ষিত ওয়ার্ড এবং নারী-পুরুষ উভয়েই প্রার্থী হবেন।