বিস্ফোরণের হুমকি
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৫ ১৩:০০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ইতালির রোম থেকে ছেড়ে আসা বাংলাদেশগামী বিমানের একটি ফ্লাইটে ৩৪ কেজি এক্সপ্লোসিভ ( বিস্ফোরক) থাকার খবর জানিয়ে তা বিস্ফোরণ ঘটানো হবে বলে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) এয়ারপোর্টের দায়িত্বে থাকা ডিউটি অফিসারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কয়েক দফা বার্তা আসে। হুমকি পেয়ে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়। বিমানটি শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে অবতরণ করলে যাত্রীদের নিরাপদে নামিয়ে আনার পাশাপাশি তল্লাশি করে দেখা যায় এমন কিছুই নেই। তবে হামলার খবরে দিনভর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কেটেছে বিমানযাত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্রেফ আতঙ্ক ছড়াতে বিমান হামলার গুজব ছড়ানো হয়েছে। এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
বোমা হামলার হুমকির মধ্যে রোম থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের (বিজি ৩৫৬) ফ্লাইটটি সকাল ৯টা ২০ মিনিটে জরুরি অবতরণ করে। ওই সময় বিমানে ২৫০ জন যাত্রী এবং ১৩ জন ক্রু ছিল। বিমানটি অবতরণের আগে থেকেই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে চারদিক থেকে ঘেরা ছিল। একপর্যায়ে যাত্রী ও ক্রুদের বিমান থেকে নামিয়ে টার্মিনালে আনা হয়। তল্লাশি কার্যক্রম শেষে দুপুরের পর যাত্রীরা যে যার গন্তব্যে যায়। শেষ পর্যন্ত তল্লাশি করে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি আর বিমান অবতরণের পর কোনো বিস্ফোরণও হয়নি।
বিকাল ৪টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া বলেন, ‘হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এসেছে। এটা পাকিস্তানি নম্বর। তিনি (যে বার্তা পাঠিয়েছে) আমাদের তথ্য দিয়েছেন। দুইটা ব্যাগ সন্দেহ করেছিলাম। তবে কিছু পাওয়া যায়নি।’
তিনি বলেন, ‘হোয়াটসঅ্যাপে আমাদের কন্ট্রোল রুমে মেসেজটি এসেছে, সেখান থেকে চলে গেছে ইডির রুমে, সঙ্গে সঙ্গে ইউএসই টিমকে অ্যালার্ট করা হয়। আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে অ্যাকশনে নেমে পড়ি। আমরা যাত্রীদের প্রাণ নিয়ে কাজ করি, কোনো থ্রেট আসলে আমাদের শতভাগ প্রস্তুত নিয়ে কাজ করতে হয়।’
তথ্যদাতার সঙ্গে একাধিকবার মেসেজ আদান-প্রদান হয়েছে জানিয়ে বেবিচকের চেয়ারম্যান বলেন, ‘তথ্যদাতা দুজনের কথা বলেছেন। একটি লাগেজের ছবিও দিয়েছেন। এই ধরনের লাগেজ হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন। আমরাও সতর্ক ছিলাম, এটা হয়তো আমাদের দৃষ্টি এড়ানোর জন্য অন্য কোনো ঝামেলাও হতে পারত। অ্যালার্ট জারি করেছিলাম, যাতে প্রত্যেক লাগেজ সতর্কতার সঙ্গে চেক করা হয়।’
হুমকির খবর যেভাবে আসে প্রথমে
বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিস্তানি কোড ব্যবহার করে (+৯২) একটি হোয়াটসঅ্যাপ থেকে বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের ডিউটি অফিসার এএসপি আব্দুল হান্নানের সরকারি নম্বরে ভোর ৪টা ৩৭ মিনিটে একটি বার্তা পাঠানো হয়। ওই বার্তায় ইংরেজি লেখা ছিলÑ রোম থেকে ছেড়ে আসা বাংলাদেশগামী বিমানে (বিজি-৩৫৬ নম্বর ফ্লাইট) ৩৪ কেজি বিস্ফোরক রয়েছে। এমন বার্তা পেয়ে এএসপি আব্দুল হান্নান নম্বরটিতে কল দেন। কিন্তু অপর প্রান্তে নম্বর ব্যবহারকারী কল রিসিভ না করে একের পর এক বার্তা দিচ্ছিল। অজ্ঞাত ব্যক্তিটি (হুমকিদাতা) বলছিল বিমানের বিজনেস ক্লাসে দুজন যাত্রীর কাছে বিস্ফোরকটি রয়েছে। এটি এমনভাবে বিস্ফোরণ ঘটানো যাবে যাতে সারা বিশ্বে বাংলাদেশ আলোচনায় আসে এবং দেশের ভাবমূর্তি সংকটের মধ্যে পড়ে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘হুমকির বার্তায় বলা হয়Ñ বিমানের রোম থেকে ঢাকা অভিমুখী ফ্লাইটে ৩৪ কেজি বিস্ফোরক রয়েছে। শাহজালাল বিমানবন্দরে ফ্লাইটটি অবতরণের পর এগুলো বিস্ফোরণ ঘটানো হবে। বার্তা পাওয়ার পর ওই নম্বরে কল করা হলেও তা রিসিভ করা হয়নি উল্লেখ করে এপিবিএন সূত্র জানায়, বিমানবন্দর থেকে কল করা হলেও অপর প্রান্ত থেকে সেটি রিসিভ করা হয়নি। তবে একই সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাটিং অব্যাহত রাখা হয়, পাশাপাশি সবাইকে অ্যালার্ট করে দেওয়া হয়। বিস্ফোরক কারা রেখেছে, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটিংয়ে এমন প্রশ্ন করা হলে বলা হয়Ñ কোনো বিরোধী পক্ষ আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আনার জন্য করতে পারে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট অজ্ঞাত ব্যক্তি মেসেজ পাঠিয়ে হুমকি দিয়ে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষসহ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার বিভিন্ন ইউনিট, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে অবগত করা হয়। এর পরপরই হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিমানটি জরুরি অবতরণের সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী ওই বিমানটিকে ঘিরে রাখে। বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ডগ স্কোয়াডসহ অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা ধীরে ধীরে প্রথমে বিমান থেকে প্রায় আড়াইশ যাত্রী ও ১৩ জন ক্রুকে নিরাপদে নামিয়ে আনেন। এর পর বিমানটি তল্লাশি চালানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত এমন কিছুই পাওয়া যায়নি।
পাকিস্তানি কোড ব্যবহার করে হুমকি!
বিজি-৩৫৬ নম্বর ফ্লাইটটি রোম থেকে ঢাকায় আসার পথে বোমা হামলার হুমকি দেওয়া হয়। এতে পাকিস্তানি কোড (+৯২) ব্যবহার করা হয়। তবে এটি পাকিস্তানি কোনো নম্বর কি নাÑ তা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার এক সদস্য বলেন, ‘হোয়াটসঅ্যাপ থেকে বার্তা পাঠানো হয়। কোড থেকে এটি পাকিস্তানি নম্বর মনে করা হয়। কিন্তু নম্বরটি কল করা হলে কেউ রিসিভ করেনি। শুধু একের পর এক হুমকি দিয়ে মেসেজ পাঠানো হয়। তবে ইন্টারনেটের যুগে বাংলাদেশে বসে বিভিন্ন দেশের নম্বর ব্যবহার করে কল করা যায়। এটি বাংলাদেশ থেকে কেউ করেছে কি নাÑ তা তদন্ত চলছে।’
শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কামরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, গোটা বিমান তল্লাশি করে কোনো বোমা বা বোমাসদৃশ কিছু পাওয়া যায়নি। যাত্রীদের সব ব্যাগ চেক করা হয়েছে। কোথাও বিস্ফোরক বা এমন কিছু পাওয়া যায়নি। এ সময় পর্যন্ত বিমানের সব যাত্রীর ইমিগ্রেশন বন্ধ ছিল।
পরিস্থিতি নিয়ে যা বললেন ওই বিমানের এক যাত্রী
ইতালির রোম থেকে ঢাকাগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে বোমা হামলার খবর শোনার পরে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন বলে জানিয়েছেন ওই ফ্লাইটের যাত্রী জাবেদ আহমেদ। দুপুর ১টা ২০ মিনিটে অবতরণের প্রায় ৪ ঘণ্টা পর বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে এ কথা বলেন ওই তিনি।
জাবেদ আহমেদ বলেন, ‘বিমানের ভেতরে আমরা কিছু জানতে পারিনি। আমরা বিমান থেকে বের হওয়ার পর শুনেছি। শোনার পরে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। তবে কোনো ঝুঁকি দেখিনি। প্রথম থেকে মিথ্যা মনে হয়েছিল। আমাদের নিরাপত্তা স্বার্থে তল্লাশি করা হয়েছে। তবে কোনো প্রকার হয়রানি করা হয়নি।’
যাত্রীরা বলে, বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট প্লেনের ভেতরে সিট, করিডোর, টয়লেট, ক্যাফেতে তল্লাশি চালায়। যাত্রীদের জরুরি ভিত্তিতে নামানো হলেও তাদের হ্যান্ডব্যাগ প্লেনেই ছিল। সেগুলো একে একে তল্লাশি করা হয়েছে। যাত্রীদের সব ব্যাগ চেক করা হয়েছে। কোথাও বিস্ফোরক বা এমন কিছু পাওয়া যায়নি।
২০১৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইনসের বিজি-১৪৭ উড্ডয়নের পর পলাশ আহমেদ বোমাসদৃশ বস্তু ও অস্ত্র দেখিয়ে বিমানটি ‘ছিনতাইয়ের’ চেষ্টা করেন বলে সে সময় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা দাবি করেন। ওই দিন বিমানটি শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করা হয়। বিমানের ‘ইমার্জেন্সি ডোর’ দিয়ে যাত্রী ও কেবিন ক্রুদের দ্রুত বের করে আনা হয়। ওই সময় পলাশ অভিনেত্রী শিমলার সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন বলে তখন কমান্ডো অভিযানে থাকা বিমানবাহিনীর এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। পরে আট মিনিটের এক কমান্ডো অভিযানে পলাশ আহমেদ নিহত হন। ওই সময় বিমান থেকে একটি খেলনা পিস্তল ও কিছু বিস্ফোরকসদৃশ বস্তু আলামত হিসেবে উদ্ধার করা হয়। প্রথমে বলা হয়েছিল ছিনতাইয়ের চেষ্টাকারী পলাশ জঙ্গি গ্রুপের সদস্য হতে পারে, শেষ পর্যন্ত তদন্তে এসেছে পলাশ মানসিকভাবে বিপর্যন্ত ছিলেন। বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টাও সে করেনি। যদিও পরে পুলিশের তদন্তে বলা হয়, ২০১৮ সালের ৩ মার্চ শিমলার সঙ্গে পলাশের বিয়ে হয়। পলাশ আগের বিয়ের খবর গোপন করায় ওই বছরের ৬ নভেম্বর শিমলা তাকে ডিভোর্স দেন। ডিভোর্সের পরেই ‘হতাশা’ থেকে বিমান ‘ছিনতাইয়ের’ চেষ্টা করেন পলাশ। এ ঘটনায় অভিনেত্রী শিমলাকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। যেখানে অভিনেত্রী জানান, বিয়ের পর মনে হয়েছিল পলাশের মানসিক সমস্যা আছে। তাই ডিভোর্স দিই। তবে কেন বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা করতে গেছেন, সেটা বলতে পারছি না। বিমান ছিনতাইয়ের সেই ঘটনা টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছিল সে সময়। উড়োজাহাজ ‘ময়ূরপঙ্খী’ ছিনতাইচেষ্টা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন তদন্ত শেষে আদালতে জমা দেয় পুলিশ।