× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শ্রমিক আন্দোলন

আহত শ্রমিক ছাঁটাই, মানা হয় না আইন

ফারহানা বহ্নি

প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ০০:২৩ এএম

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৫৩ এএম

আহত শ্রমিক ছাঁটাই, মানা হয় না আইন

নাজমুল হাসান আর আগের মতো স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবেন না। সাভারের আশুলিয়ায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর শ্রমিক আন্দোলনের সময় তার পায়ে গুলি লেগেছিল। ডাক্তার জানিয়েছেন, এখন সারা বছরই তার পায়ের ব্যথা থাকবে। কখনও ব্যথায় জ্বরও আসতে পারে। সুস্থ হলেও আগের মতো কাজ করতে পারবেন না। এরই মধ্যে কারখানা থেকে তাকে চাকরি না থাকার কথা জানানো হয়েছে। তবে বিনা নোটিসে এবং তিন মাসের টাকা না দিয়েই চাকরিচ্যুতির বিষয়টি পরিষ্কার না করায় কারখানায় অভিযোগ করেছেন তিনি।

আহত হওয়ার পর নাজমুল ও আরও কয়েকজনকে প্রথমে নেওয়া হয়েছিল এমকে মেডিকেল হাসপাতালে। পরে সেখান থেকে সাভারে এনাম মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখানে তার খরচ হয় ৭০ হাজার টাকা। পরে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে নিয়ে যাওয়া হয় সিএমএইচ হাসপাতালে।

নাজমুল বলেন, ‘কারখানা থেকে সেদিন মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, আহতদের সহায়তা করবেন তারা। চাকরিও বহাল থাকবে। ১৭ দিন আইসিইউতে থাকার সময় আমি আর চাকরির খবর নিতে পারিনি। তারপর যখন ফোন দিলাম, তখনও কিছু জানায়নি। পরে আরেকটু সুস্থ হয়ে কারখানায় গেলে বলা হয় ‘তুমি আন্দোলনে ছিলা, তাই তোমাকে রাখা যাবে না’। এই কারখানা থেকে প্রায় ৫০০ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে, যাদের পাওনা টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর শ্রমিকদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর সংঘর্ষে নিহত হন টঙ্গিবাড়ীর ম্যাংগো টেক্সের শ্রমিক কাউসার হোসেন খান (২৬)। সেদিনই গুলিবিদ্ধ হন

ন্যাচারাল ডেনিমস কারখানার শ্রমিক নাজমুল হাসান। আরও আহত হয়েছেন শ্রমিক রাসেল ও নয়ন এবং শ্রমিক হাবিব। আহতদের বেশিরভাগই এখন চাকরিচ্যুত। ধারদেনা করে চলছেন পরিবার নিয়ে। অনেকে এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

সেদিন যা ঘটেছিল

নাজমুল হোসেন সেদিনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘মন্ডল গ্রুপের শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠক চলছিল। সমঝোতা না হওয়ায় শ্রমিকরা কারখানার বাইরে অবস্থান নেন। পরে অন্যান্য কারখানার শ্রমিকরা সেখানে জড়ো হন। বাগ্‌বিতণ্ডার একপর্যায়ে লাঠিচার্জ করতে করতে হঠাৎ গুলি ছুড়তে থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বাসায় যাওয়ার রাস্তায় এসব ঘটছিল বলে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এমন সময় আমার সামনে ন্যাচারাল ডেনিমসের আরেক শ্রমিক নয়নের বুকে গুলি লাগে। আমরা কয়েকজন তাকে বাঁচাতে যাই। সেই সময় আমার পায়েও গুলি লাগে। পরিস্থিতিই এমন ছিল অনেকেই বুঝতে পারছিলেন না কী হচ্ছে। কলিগের গায়ে গুলি লাগলে বাঁচাতে যাওয়াটা আমার দোষ হতে পারে না। আমাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার সময় সঙ্গে ছিলেন ন্যাশনাল ইন্ডিগোর শ্রমিক ওবায়দুল। হাসপাতালে যাওয়ার সময়ও বাধা দেওয়া হয় আমাদের।’ 

সেদিনের ঘটনা নিয়ে কথা হয় বুকে গুলি লাগা গাজীপুরে ন্যাচারাল ডেনিমসের অপারেটর নয়নের সঙ্গে। নয়নের দাবি আন্দোলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন না। তার পিঠে দুইটা এবং বুকে একটা গুলি লাগে। সুস্থ হতে আরও প্রায় পাঁচ মাস সময় লাগবে। ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা নিলেও বাকি মাসগুলো পরিবারকে কীভাবে চালাবেন, সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে নয়নের। তিনি বলেন, ‘আহত হওয়ার পর কারখানা থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমাকে বেতন দিচ্ছে না। চাকরির বিষয়েও কিছু জানাচ্ছে না। সুস্থ হতে ছয় মাস সময় লাগবে। কিন্তু এই কয়েক মাস সংসার চালাব কীভাবে? আর কত ধারদেনা করা যায় মানুষের কাছে? আমি তো আমার দোষে আজকে এখানে না।’

সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘সেদিন মন্ডল কারখানার শ্রমিকরা সবাইকে বের করে আনে। তারা দুজন নিখোঁজ শ্রমিকের সন্ধান চায়। আমি ছিলাম অনেক দূরে। হঠাৎ গুলি করতে শুরু করে পুলিশ আর সেনাবাহিনী। সেই গুলি আমার গায়ে লাগে।’ গুলি করার মতো পরিস্থিতি হয়েছিল কি না জানতে চাইলে নয়ন বলেন, ‘লাঠি দিয়ে আরও মাইর দিলেও পারত, টিয়ার শেল মারত। হয়তো মানুষ একটু ব্যথা পাইত। গুলিতে তো আমার মতো আরও অনেক মানুষ আহত হয়েছে। কেউ তেমন সাহায্য পায় নাই। অনেকের চাকরি নাই।’

চাকরি নেই সেদিন আহত হওয়া শ্রমিক মো. রাসেলেরও। সেদিন ঘটনা বুঝে ওঠার আগেই গুলি এসে বুকে লাগে তার। তিনি বলেন, ‘চার বছর সেই কারখানায় কাজ করেছি। সেদিন তেমন কিছু হয় নাই। কয়েকজন চিল্লাইছে। তারপর গুলি করছে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে কারখানায় যোগাযোগ করলে জানায়, ‘সুস্থ আছো, বাড়িতে থাকো’। আমার কাজের বিষয়ে আমারে কিছুই জানায় নাই। অনেক পোলাপানের চাকরি নাই। এখন আমার পরিবারের অবস্থাও বেশি ভালো না। বড় ভাই রাজমিস্ত্রির কাজ করে দিনে আনি দিনে খাই।’

‘আন্দোলনের কারণে চাকরি নাই’ 

আহত আরেক শ্রমিক ওবায়দুল জানান, বিভিন্ন কারখানার অনেক শ্রমিক আহত হন সেই দিন। তাদের বেশিরভাগই জানত না সেখানে কী হচ্ছিল। যৌথ বাহিনীর গুলিতে তার বাম পা ও হাতে গুলি লাগে। এখনও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। হাতের হাড় গুঁড়ো হয়ে গেছে, তাই প্রায় অচল বলা যায়। এদিকে কারখানার চাকরিটাও নেই। কারখানা থেকে বলা হয়েছে, আন্দোলনে থাকার কারণে তার চাকরি চলে গেছে।

ওবায়দুল বলেন, ‘১০টার দিকে কারখানা বন্ধ করে দিলে বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করি। বাসায় যাওয়ার রাস্তা আন্দোলকারীরা বন্ধ করে রাখায় অন্য পথ দিয়ে যাওয়ার কথা ভাবলাম। আরেকটা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বাম পায়ে ও হাতে গুলি লাগে। সেদিন সেখান থেকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় কাছাকাছি একটা হাসপাতালে। তারপর নেওয়া হয় এনাম মেডিকেলে। সেখানে আমার ৩২ হাজার টাকা খরচ হয়। ধারদেনা করে তাৎক্ষণিক কিছু টাকা হাসপাতালে দিলেও বাকি টাকা দিতে পারিনি। পরে সেখান থেকে সিএমএইচে আনা হয়। গত সোমবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছি। পা ঠিক হতে এক বছর লাগবে, ডান হাতের আঙুলের হাড় ভেঙে গেছে। সংসারও কষ্টমষ্ট করে চালাইতেছি।’

আইনে যা আছে

শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো শ্রমিককে ছাঁটাই করলে এক মাস আগে নোটিস দিতে হবে। এছাড়া তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে প্রতিষ্ঠান থেকে। তবে কারখানাগুলো থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না শ্রমিকরা। 

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, ‘কারখানা যে কাউকে চাকরিচ্যুত করতে পারে। তবে অবশ্যই নোটিস দিতে হবে। তাদেরক ১২০ দিনের অর্থাৎ চার মাসের টাকা দিতে হবে। যদি এক্ষেত্রে তারা টাকা না পায়, তবে অবশ্যই শ্রমিকদের লেবার কোর্টে যাওয়া দরকার। আমাদের দেশে লেবার কোর্টে প্রচুর মামলা হয় এই ধরনের ঘটনায়। এখন শ্রমিকরা এসব বিষয়ে জানে। তারা কোর্টের মাধ্যমে তাদের পাওনা টাকা আদায় করতে পারবে।’

বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন বলে জানান, শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বিষয়গুলো দেখব। বেতন বকেয়া থাকলে শ্রমিকরা তো বারবার রাস্তায় নামবেই। কারণ রাস্তায় না নামলে তাদের কথা কেউ শোনে না। এখন আমাদের প্রথম কাজ হলো, শ্রমিকদের বেতন যেন বকেয়া না হয়। সবকিছু মাথায় রেখে সম্মিলিত ও পরিকল্পিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে শ্রম সংস্কার কমিশন সুপারিশ প্রণয়ন করা হবে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা