আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস
ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৪ ১৩:১১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
শিক্ষকরা শিক্ষাবিস্তারে সব সময় নিজেকে ব্যস্ত রাখবেনÑ এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেশে প্রতিনিয়ত শিক্ষক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা নানান ধরনের বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। ফলে তারা নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে আন্দোলন-সংগ্রামে নামছেন। এতে শিক্ষার মান উন্নয়নে যেভাবে মনোযোগ দেওয়া দরকার তা দিতে পারছেন না। আর তাতে নষ্ট হচ্ছে আগামী প্রজন্মের স্বপ্ন। এসব সমস্যা সমাধানে শিক্ষকরা রাষ্ট্রের মনোযোগ আকর্ষণ করে চলছেন।
আবু খায়ের আনিস ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানাধীন একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি গত সেপ্টেম্বর থেকে সহকারী শিক্ষকদের দশম গ্রেডে উন্নীতকরণ আন্দোলনে কাজ করছেন। ইতঃপূর্বে ২০১৫ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে তৎকালীন সরকারের ভ্যাট আরোপের প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেওয়া প্ল্যাটফর্ম নো ভ্যাট অন এডুকেশন আন্দোলনেও ছাত্রদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন। সবশেষ চলতি বছরের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ও তাকে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। তার মন ও মননে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ন্যায্য দাবি আদায়ের সংগ্রামে যুক্ত থাকার একটি প্রেরণা সব সময় কাজ করে।
কী বলছেন শিক্ষকরা
আবু খায়ের আনিস অন্যান্য পেশায় যাওয়ার সুযোগ থাকলেও শিক্ষাবিস্তারে নিজেকে বিলিয়ে দিবেনÑ এমন মহানব্রত নিয়েই শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হোন। ২০২০ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিজের সর্বোচ্চ মেধা দিয়ে কাজ করছেন। সম্প্রতি তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, শিক্ষকরা যে টাকা বেতন-ভাতা পায় তা দিয়ে তাদের সংসার চলে না। বাধ্য হয়ে অন্য পেশাকে সহযোগী হিসেবে নিতে হয়। এতে করে শিক্ষকরা নিজেদের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সর্বোচ্চ মেধা দিয়ে প্রজন্মকে গড়ে তুলতে পারছেন না। আমাদের প্রত্যাশা রাষ্ট্র শিক্ষকদের ও শিক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এমন পর্যায়ে উন্নীত করুক, যাতে তাদের রুটি-রুজির জন্য ভিন্ন পথ অবলম্বন করতে না হয়।
শুধু যে প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলন- বিষয়টি এমন না। বরং মাধ্যমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও প্রতিনিয়ত নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ও বেতন-ভাতা, পদ-পদবি নিয়ে আন্দোলনে ব্যস্ত। এতে করে শিক্ষাবিস্তারে তাদের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভুইয়া বলেন, শিক্ষাদান ও গবেষণা কাজে যুক্ত থাকবে- এটাই শিক্ষকদের অন্যতম প্রধান কাজ। পাশাপাশি সমাজ উন্নয়নে অনেকেই বিভিন্ন দর্শনে বিশ্বাসী সে মোতাবেক তারা কাজ করেন। কিন্তু আমাদের দেশে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। আমি নিজেও একটি রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাস করি। তবে যখন ক্লাসে যাই সেখানে আমি শিক্ষক। তখন কোনো রাজনৈতিক পরিচয় সামনে আনি না। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, পদ-পদবি ও অন্যান্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বস্তরে পেছনে রয়ে গেছে। তাই শিক্ষক ও এ-সংক্রান্ত সংশ্লিষ্টদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা দরকার। শিক্ষকদের শিক্ষা ও গবেষণায় সময় বিনিয়োগে সব ধরনের সহযোগিতা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কী বলছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়
শিক্ষকদের সমস্যা ও সমাধান বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের দেশে শিক্ষকদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে তাদের পেনশনগত দিকটি। প্রতি বছরে পেনশনের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা দরকার। সেখানে আমরা বাজেটে বরাদ্দ পাই ১০০ কোটি টাকা। এই ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আমরা আশা করছি, আগামী বছর তথা ২০২৫ সাল থেকে এই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত দেওয়াও একটি সমস্যা। আশা করছি, এটিও সমাধান করতে পারব।
তিনি বলেন, শিক্ষকদের বদলি করা একটি বড় সমস্যা। সেখানে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)’র মাধ্যমে বছরে ৪০ হাজারের মতো আবেদন পড়ে। আমরা ইতোমধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার শিক্ষককে বদলি করতে পেরেছি। তবে সবাই ঢাকা বা শহরাঞ্চলে চলে আসতে চায়। এটি তো সম্ভব না। তাহলে মফস্বল শিক্ষায় ভাটা পড়বে। তাই খুব সচেতনভাবে এখানে হাত দিতে হয়।
শিক্ষকদের পদোন্নতির ব্যাপারে সমস্যায় পড়তে হয় বা খুব ধীরগতি এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের ১৬ হাজার অধ্যাপকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে এ বছর ৯২২ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষকদের বিষয়কভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছেÑ এ ব্যাপারে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা ব্যাপক আকারে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি। এটিকে শিক্ষণের বিজ্ঞান বলা হয়। এ মুহূর্তে ১ হাজার ৫০০ অধ্যাপক, সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান ও অঞ্চলে গিয়ে অন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিবে। তা ছাড়া দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ইতঃপূর্বে ছিল না। আমরা এটি নিয়েছি। আগামী ডিসেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হবে।
সরকারিভাবে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের নির্দেশনা
আজ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হলোÑ‘শিক্ষকের কণ্ঠস্বর : শিক্ষায় একটি নতুন সামাজিক অঙ্গীকার’। দিবসটি পালন উপলক্ষে গত ৮ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন নীতিমালা-২০২৪’ ঘোষণা করেছে। সে মোতাবেক গত ৩ অক্টোবর সব প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে এ দিবসটি উদযাপন করতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা জারি করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর।
কর্মসূচি
দিবস উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আজ সকাল ১০টায় শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। বিশেষ অতিথি থাকবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ এবং ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের প্রধান ড. সুসান ভিজ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ।