প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২২ ১৮:৩৭ পিএম
আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২২ ২০:০৯ পিএম
সিরাজগঞ্জে রাষ্ট্রীয় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিচে পরীক্ষামূলক চাষাবাদ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
মাটির ঢিবির ওপর দুটি চারা গাছ। নিশ্চয়ই এ ছবি দেখে খুব আনন্দিত বা উদ্বেলিত হওয়ার মতো কিছু নেই। তবে কেউ এর পেছনের ঘটনাটি জেনে থাকলে বলবেন, ‘ওয়াও’।
অসাধারণ বলার কারণটা হলো, এই চারা উঁকি দেওয়ার স্থানটি যে দেশের একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে! এটি তারই ছবি।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ নিজের ফেসবুক পেজে এ ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, এই উদ্যোগ শুধু বাংলাদেশে নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের এক ইঞ্চি জমি অনাবাদি না রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মাথায় রেখে রাষ্ট্রীয় নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি তাদের সিরাজগঞ্জ ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রর নিচে পরীক্ষামূকভাবে ফসল আবাদ শুরু করেছে। তাদের গত কয়েক মাসের প্রচেষ্টার খবর বলছে, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিচে কৃষি নতুন পথ দেখাবে।
একসময় ধারণা করা হতো, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিচে কোনো ফসল আবাদ করা সম্ভব নয়। কারণ হিসেবে বলা হতো, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্যানেল বসানোর ফলে এর নিচে তাপমাত্রা বেড়ে যায়; যা ফল-ফসল আবাদের পরিবেশকে নষ্ট করে।
কিন্তু বহু আগেই সে সমস্যা দূর হয়েছে। এখন যে ফটোভোল্টিক প্যানেল বসানো হয়, সেগুলোতে তাপ উৎপন্ন হয় না। নতুন গবেষণা বলছে, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিচে যদি ফসল আবাদ করা হয়, অর্থাৎ উদ্ভিদ থাকে, তাহলে কেন্দ্রের উৎপাদন দক্ষতা এক ভাগ বৃদ্ধি পায়।

অন্যদিকে যদি পানি থাকে, তাহলে তিন ভাগ বাড়ে। অথচ দেশে সব সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জমি ফেলে রাখা হয়েছে। সেখানে কোনো ফসল আবাদ করা হয় না।
জানতে চাইলে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ব্যবস্থানা পরিচালক প্রকৌশলী এএম খোরশেদুল আলম বলেন, ‘আমরা সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিচের জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে চাষাবাদ শুরু করেছি। এটি সফল হলে অন্য কেন্দ্রগুলোর নিচেও কৃষিকাজ করব।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে অন্তত তিন একর জমি প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজন হয় ৩০০ একর বা ৯০০ বিঘা জমি। কিন্তু বিপুল পরিমাণ জমি কি অনন্তকাল ধরেই অনাবাদি থাকবে? অন্তত বাংলাদেশের মতো জনবহুল এবং ছোট দেশের পক্ষে এটি সম্ভব কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তাহলে গলদটি কোথায়, এমন প্রশ্নে বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গলদ হচ্ছে আমাদের নীতিতে। সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের যে নীতিমালা রয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য অকৃষি জমির সংস্থান করতে অর্থাৎ শুরুতেই উদ্যোক্তাকে কৃষিকাজ করতে হবে না, এ বিষয়ে ছাড় দেওয়া হয়েছে। মূলত দেশের সর্বনাশ করে বেসরকারি উদ্যোক্তারা যাতে কম খরচে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে পারেন, সে নীতিতে সেই সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘উচিত ছিল সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকে ফার্মিংয়ের প্রস্তাব নেওয়া। সেগুলো ওই কোম্পানিটি যথাযথভাবে করছে কি না তা মনিটরিং করা। যদি ফার্মিং না করে শুধু সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ বিক্রি করে, তাকে জরিমানা করা।’
দেশে বেসরকারি যে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে, তার নিচে দিয়ে মানুষ চলাচল করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সোলার প্যানেলের একটির সঙ্গে আরেকটির দূরত্বও খুব কম।
কিন্তু এসব কিছুর ব্যতিক্রম হচ্ছে সিরাজগঞ্জের ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। এখানে একটি প্যানেল থেকে আরেক প্যানেলের দূরত্ব যেমন অনেক বেশি, আবার প্যানেলগুলো মাটি থেকে অনেক ওপরে স্থাপন করা হয়েছে।
নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি অন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষামূলকভাবে ফসল উৎপাদনের জন্য জমি দিয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রো ইকোলজিক্যাল জোন লিমিটেড নামের ওই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিচে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব কি না সে বিষয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে।
দেশের প্রখ্যাত কৃষিবিদরা বেশ কয়েকবার সিরাজগঞ্জে সে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিদর্শন করেছেন। তারা বলছেন, এখানে সব ধরনের ফসল আবাদ করা সম্ভব। তবে ছায়াযুক্ত স্থানে হয়, এমন কিছু ফসল এখানে খুব ভালো হবে।
এসব ফসলের মধ্যে রয়েছে, চেরি টমেটো, ক্যাপসিকাম, স্ট্রবেরির মতো দামি ফসল। এজন্য একটি ক্রপ চার্ট তৈরি করেছেন তারা। বছরের কোন সময় কোন ফসল আবাদ করা সম্ভব, এ বিষয়ে আপাতত এক বছরের গবেষণা শেষ; এখন আগামী বছর থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রো ইকোলজিক্যাল জোন লিমিটেডের ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা গত সপ্তাহে মিষ্টি কুমড়ার বীজ বপন করেছিলাম। সবগুলো মাদায় খুব সুন্দর চারা হয়েছে। শুধু আমরাই না, বিদ্যুৎকেন্দ্রর কর্মকর্তারাও চারা দেখে খুশি হয়েছেন।’