প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৪ ১৬:০৫ পিএম
আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৪ ১৮:২০ পিএম
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ হলো জামায়াত-শিবির। বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুসারে এতে সই করেন মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মো. জাহাংগীর আলম।

এর কয়েক ঘণ্টা আগে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, গত পরশু ১৪ দলের একটি সভা হয়েছিল, সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল- যে জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করা হবে। এটার একটা আইনি প্রক্রিয়া আছে, সেটা আমরা গত পরশু শুরু করে দিয়েছিলাম। এর মধ্যে এই নিষিদ্ধের যে গেজেট প্রকাশ করা হবে, সেটারও কিছু আইনি বাধ্যবাধকতা আছে, সেগুলো পূরণ করতে হবে।
তিনি বলেন,‘যে কারণে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সেই আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণ করে আমার মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগে পাঠিয়েছে, এরপর সেটিকে ভেটিং করে আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি, আমার মনে হয়ে, কিছুক্ষণের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই গেজেট প্রকাশ করে দেবে।’
আনিসুল হক বলেন, সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮/১ ধারায় জামায়াত-শিবির ও অন্যান্য যে অঙ্গ সংগঠন নিষিদ্ধ করল এবং এটা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের যে দ্বিতীয় তফসিল আছে, সেখানে এগুলো তালিকাভুক্ত হবে। এটাই আমাদের সিদ্ধান্ত, আপনারা মনে হয় কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন পেয়ে যাবেন। এটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি ও উদ্যোগ দীর্ঘদিনের
জামায়াত ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার দাবি ও উদ্যোগ দীর্ঘদিনের। ২০১৩ সালের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন থেকেও ‘যুদ্ধাপরাধী’ দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। ওই বছরের ১৫ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-১ গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে যে রায় ঘোষণা করেন সে রায়ের অভিমতে বলা হয়, দলটি গত ৪২ বছরেও তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চায়নি বা অনুশোচনা করেনি। একই সঙ্গে এ দলটির কোনো সদস্য যাতে কোনো প্রতিষ্ঠানের পদে থাকতে না পারে সে জন্য সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। ট্রাইব্যুনাল একাধিক রায়ে জামায়াতকে অপরাধী সংগঠন বলে অভিমত দেন। একই বছরেরে ১ অগাস্ট হাই কোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে দেওয়ার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বাম দলগুলোর নেতারা জামায়াত নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া শুরুর ওপর জোর দেন। এ অবস্থায় ২০১৩ সালের আগস্টেই দলটি নিষিদ্ধ করার জন্য সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের আওতায় আপিল বিভাগে সরকারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়। সে সময় তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গণ মাধ্যমকে বলেছিলেন, সরকারের নির্বাহী আদেশে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করায় আইনগত বাধা নেই। তবে আদালতের রায়ের আলোকে বিষয়টির সমাধান করা হলে তা স্থায়ী রূপ পাবে।
আইনজীবীদের মতে, সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের (গ) ও (ঘ) উপ-অনুচ্ছেদ ও দ্য পলিটিক্যাল পার্টিস অর্ডিন্যান্স ১৯৭৮-এর বিধিবিধান অনুসরণ করে যেকোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা যায়। এ জন্য সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট।
সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে’।
‘তবে শর্ত থাকে যে, কোনো ব্যক্তির উক্তরূপ সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার কিংবা উহার সদস্য হইবার অধিকার থাকিবে না, যদি (ক) উহা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; (খ) উহা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; (গ) উহা রাষ্ট্র বা নাগরিকদের বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোন দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বা জঙ্গী কার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; বা (ঘ) উহার গঠন ও উদ্দেশ্য এই সংবিধানের পরিপন্থী হয়’।
এখন জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে চাইলে তাদের বিরুদ্ধে এই চারটির যেকোনো একটি অথবা সবগুলো অভিযোগই আনা যেতে পারে। কেননা, সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে, জামায়াত কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটা একটা সন্ত্রাসী জঙ্গি সংগঠন।
রিপ্রেজেন্টেশন অব পিপলস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭২-এর ৯০ (এইচ) ধারায়ও রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সরকারকে। দ্য পলিটিক্যাল পার্টিস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৮-এর ৩ ও ৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ববিরোধী কার্যকলাপ করতে পারবে না। একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দল সশস্ত্র বাহিনী গঠন করে গোপন তৎপরতা চালাতে পারবে না’।
২০১৯ সালে জানুয়ারিতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার জন্য দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিচারের জন্য সরকার আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান।
ওই সময় তিনি জানিয়েছিলেন, ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত আইনের খসড়া তৈরি হয়েছে এবং তা মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে।