সচিব সভা আজ
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৪ ১০:৫৮ এএম
বাংলাদেশ সচিবালয়। ফাইল ফটো
টানা তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্বগ্রহণের পর সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের নিয়ে দ্বিতীয় দফা ‘সচিব সভা’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার বিকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেনের সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে।
সভায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতিরোধ, দ্রুত বাস্তবায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে কর্মপরিকল্পনা, দুর্নীতি প্রতিরোধে সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, গত ৬ ফেব্রুয়ারি চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দায়িত্বগ্রহণের পর তার কার্যালয়ে প্রথম সচিব সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় প্রধানমন্ত্রী সচিবদের দায়িত্বশীল হয়ে কাজ করার নির্দেশনা দেন। বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে যেন দীর্ঘসূত্রতা না হয় সে বিষয়ে তদারকি করা, উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়নকাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা ও কাজের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবদের কাজ করার নির্দেশনা দেন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স থাকা, প্রশাসনে যারা দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত থাকবেনÑ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন প্রধানমন্ত্রী। তারই ধারাবাহিকতায় গত সোমবারের মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের দৃঢ় অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। খোদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন প্রেস ব্রিফিংয়ে এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে দ্বিতীয় সচিব সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যে কারণে এ সভা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে সভায় প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত না থাকলেও অনির্ধারিত আলোচনায় সাম্প্রতিক সময়ে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব, দুর্নীতি রোধে কঠোর অবস্থান, গত ছয় মাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার, আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি আলোচনায় প্রাধান্য পাবে।
রেওয়াজ অনুযায়ী সচিব সভায় প্রধান অতিথি থাকেন প্রধানমন্ত্রী এবং সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব। তবে এবার সভায় প্রধানমন্ত্রী থাকছেন না বলে জানা গেছে। এর আগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি সচিবদের নিয়ে প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির প্রথম বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সভায় বর্তমান সরকারের আমলে প্রথম সচিব সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভার আলোচ্যসূচিতে ৪১টি এজেন্ডা ছিল।
সম্প্রতি একনেক সভা শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুস সালাম বলেছেন, কাজের মান নিশ্চিত করতে সবারই দায়িত্ব রয়েছে। এ বিষয়গুলো লক্ষ রেখে কাজ করতে হবে। ২০৪১ সালের দিকে উন্নয়নশীল দেশে চলে আসবে বাংলাদেশ। এ জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
জানা গেছে, সভায় বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নকাজ দ্রুত করা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষাসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি বন্ধের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা আলোচনায় থাকতে পারে। পাশাপাশি সচিবরা প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে নিজেদের মতামত ও কাজের বাধাগুলো তুলে ধরবেন। এর বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, আগের সচিব সভার সিদ্ধান্তের অগ্রগতি, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো সভায় অবহিত করা হবে।
এ ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ জনবলের অভাবে কাজে গতি পাচ্ছে না। গত সরকারের মেয়াদে এসব শূন্যপদ পূরণে নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বিভিন্ন মেয়াদে তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে শূন্যপদের তথ্য সংবলিত চাহিদা পাঠানো হয়নি। এ বিষয়ে খোদ মন্ত্রিসভার বৈঠকে একাধিকবার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নির্দেশনা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে না আসায় মন্ত্রণালয় তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না। জনবলের অভাবে দাপ্তরিক কাজ যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য শূন্যপদে জনবল নিয়োগের দিকনির্দেশনা দিতে পারেন তিনি।
সূত্র মতে, নানামুখী নির্দেশনার পরও প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি চলছে। সরকারের রাজস্ব আদায়ে গতি কম থাকায় প্রকল্পের গতিও কমেছে। এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতার অভাবও আছে। সেই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের নতুন পরিকল্পনা ও নির্দেশনা এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বাজার নিয়ন্ত্রণে যাতে বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারেÑ সে বিষয়ও আলোচনা হতে পারে। সচিব সভার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে পরবর্তীকালে সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়াও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশের নিত্যপণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে সরকারের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ কারণ দেখিয়ে মজুদদাররা যাতে দাম বাড়িয়ে ফায়দা নিতে না পারে সেজন্য নিয়মিত বাজার মনিটরিং, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ মজুদদারির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সচিব সভার নির্ধারিত কিছু এজেন্ডা থাকলেও অনির্ধারিত আলোচনা বিবেচিত হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা আসতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে কর্মকর্তাদের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হওয়ায় তাদের মধ্যে বিব্রতকর অবস্থা বিরাজ করছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তারা।
গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেছেন, দুর্নীতি তো সকলে করেন না। একটি দপ্তরে সকলেই দুর্নীতিবাজ হতে পারেন না। হাতে গোনা কয়েকজনের দুর্নীতির কারণে অন্যরা সবাই বিব্রত হন। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার শক্ত অবস্থানে রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, দুর্নীতির কোনো বিষয়ের সঙ্গে জড়িতদের কোনো রকম সহানুভূতি দেখানো হবে না।
জানা যায়, সবশেষ সচিব সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২২ সালের ২৭ নভেম্বর। পরবর্তীকালে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভার্চুয়াল সচিব সভায় অংশ নেন। ওই সময় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।
সরকারের ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের সঙ্গে বিভিন্ন দপ্তর বা সংস্থায় কাজ করা সচিবরাও সভায় উপস্থিত থাকবেন। বর্তমানে নিয়মিত ও চুক্তিভিত্তিক মিলিয়ে ৮৭ জন সচিব ও সিনিয়র সচিব দায়িত্ব পালন করছেন।