বন্যা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৪ ১০:৩৯ এএম
আপডেট : ২১ জুন ২০২৪ ১০:৪২ এএম
সুনামগঞ্জে লোকালয়ে প্রবেশ করে বন্যার পানি। ফলে যাতায়াতে ব্যবহার করতে হয় নৌকা। প্রবা ফটো
ঘূর্ণিঝড় রেমালের রেশ কাটতে না কাটতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয়েছে বন্যা। বিশেষ করে সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। শুধু সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ। বিভাগটিতে ৩০ জুন হতে শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষা ৮ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া রংপুরের কুড়িগ্রামে ২০টি গ্রাম প্লাবিত। নেত্রকোণায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক মানুষ।
সিলেট প্রতিবেদক জানান, গত ২৬ মে দেশে ঘূর্ণিঝড় রেমালের পর ২৯ মে সিলেটে ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দেয়। এটি ৮ জুন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। পরবর্তীতে ১৭ জুন থেকে আবারও ভারী ও অতি ভারী বর্ষণ এবং উজানের ঢলে সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারাসহ অন্যান্য নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যার সৃষ্টি হয়। বৃহস্পতিবার (২০ জুন) পর্যন্ত সিলেটের জেলা প্রশাসকের তথ্যমতে, পাহাড়ি ঢলে নগরীর ২৩টি ওয়ার্ড ও বিভিন্ন উপজেলা মিলিয়ে ১৩০টি ইউনিয়নে ৯ লাখ ৫৭ হাজার ৪৪৮ জন বন্যা আক্রান্ত হয়েছে। উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৬৯৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তাতে ২১ হাজার ৭৮৬ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। তাছাড়া গোয়াইনঘাট উপজেলার কাপনা নদীতে তীব্র স্রোতে নৌকা ডুবে সাদাত হোসেন নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস জানিয়েছেন, সুরমা, কুশিয়ারা নদীর ৬টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
মৌলভীবাজারে পানিতে ডুবে দুজনের মৃত্যু, আহত একজন
মৌলভীবাজার প্রতিবেদক জানান, জেলার শ্যামেরকোনা গ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে ফয়সাল মিয়ার ছেলে সাদ মিয়া (৯) ও জমির মিয়ার ছেলে হৃদয় আহমদের (১৬) মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া একই গ্রামের বাহরাম খাঁর ছেলে মায়িদ খাঁকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ প্রতিবেদক জানান, সুনামগঞ্জ পৌরশহরের ষোলঘর পয়েন্টে নদীর পানি ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাড়া-মহল্লায় পানি কিছুটা কমলেও জেলার ৮৮টি ইউনিয়নে অন্তত ৮ লাখ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে।
হবিগঞ্জ প্রতিবেদক জানান, হবিগঞ্জের মাধবপুরে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের স্রোতে সোনাই নদের বাঁধ ভেঙে বাড়িঘর, কৃষিজমি ও রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার বাঘাসুরা, ছাতিয়াইন, নোয়াপাড়া, অন্দিউড়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের ফসল, পুকুরের মাছ ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৮০ হেক্টর আউশ ধান ও ২৫ হেক্টর সবজির ক্ষেত তলিয়ে আছে। এছাড়া নবীগঞ্জ উপজেলায় কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ৫টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১০টি আশ্রয়কেন্দ্রে কয়েকশ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। ইনাতগঞ্জের মোস্তফাপুর পাঠানহাটি গ্রামের ১৫-২০টি রাস্তা তলিয়ে গেছে। এতে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র ও বিবিয়ানা ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২ থেকে ৩ হাত নিচে পানি চলে এসেছে।
এদিকে ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোণা জেলায় ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন নেত্রকোণা প্রতিবেদক। বৃহস্পতিবার কমলাকান্দা উপজেলার উপ্ধাখালী নদীর পানি বিপদসীমার ৫১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তাছাড়া সোমেশ্বরী, কংস, মগড়া ও ধনু নদের পানি বিপদসীমা ছুঁইছুঁই করছে। বন্যার পানিতে কমলাকান্দা, দুর্গাপুর, বারহাট্টা, মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী, আটপাড়া, কেন্দুয়াসহ ১০টি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে কমলাকান্দার ৮টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এসবের মধ্যে ৫টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
রংপুরে বিপদসীমার ওপরে তিস্তার পানি
রংপুর অফিস জানায়, উজানের পাহাড়ি ঢলে রংপুরের তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নিম্নাঞ্চল, চর ও দ্বীপচরের কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জেলার পাউবোর হিসাবে গতকাল বেলা ৩টায় তিস্তার কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দুধকুমার, তিস্তা ও ধরলার পানি বৃদ্ধি পেয়ে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে বন্যা হতে পারে।
নীলফামারী প্রতিবেদক জানান, ভারী বর্ষণ আর উজানের ঢলে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বুড়িতিস্তা নদীর বাঁধ ভেঙে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরে উপজেলার মধ্যম সুন্দরখাতা এলাকায় বুড়িতিস্তার মূল বাঁধের প্রায় ৬০ মিটার অংশ ভেঙে গেলে এসব গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে কৃষকের আমন ধানের বীজতলা।
সুন্দরখাতা গ্রামের কৃষক সহিদুল ইসলাম বলেন, বাঁধ ভাঙায় গ্রামের অন্তত ৫০ জন কৃষকের আমন ধানের বীজতলা তলিয়ে গেছে। বাড়িঘরে পানি উঠে যাওয়ায় মালপত্র খাটের ওপর উঠিয়ে রাখা হয়েছে। বাঁধটি দ্রুত সংস্কার করা না হলে প্রায় ২০ হাজার একর ফসলি জমি, অনাবাদি ও অসংখ্য বাড়িঘরের ক্ষতি হবে।
বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি
সারিয়াকান্দি প্রতিবেদক জানান, কয়েকদিনের বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যার আশঙ্কা করছে এ অঞ্চলের মানুষ।
টেকনাফে অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত
চট্টগ্রামের কক্সবাজার জেলায় বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি বিরাজ করছে। বৃষ্টি ও বন্যায় ইতোমধ্যে টেকনাফের ৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ৮ হাজার পরিবারের ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। পানি নামতে শুরু করায় মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে।
এদিকে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়ায় শীতলক্ষ্যার ভাঙনে ৫টি আধাপাকা ঘর ভেঙে গেছে বলে জানিয়েছে কাপাসিয়া প্রতিবেদক। তিনি জানান, গত দুদিনের ভারী বর্ষণে কাপাসিয়ায় শীতলক্ষ্যা নদীর আকস্মিক ভাঙনে তীরবর্তী ৫টি ঘর ভেঙে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে একটি মাদ্রাসা ও ইদগাহসহ অর্ধশত ঘরবাড়ি।
বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, সুরমা, কুশিয়ারাসহ সিলেটের কয়েকটি নদীর পানি কিছুটা কমেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতও কম হয়েছে। এতে আশা করা যায় দ্রুত সময়ের মধ্যে পানি নেমে গিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
তবে আগামী ২৪ ঘণ্টায় তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাবে। সেই অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়ে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে বৃহস্পতিবার দেওয়া বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের ১১০টি পানি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ৭৪টির পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, ৩৪টিতে কমেছে ও একটিতে অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনায় পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহতভাবে বেড়ে কিছু পয়েন্টে সতর্কসীমায় পৌঁছতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ হতে রাজবাড়ী পর্যন্ত যমুনা এবং এরপর যাকে পদ্মা বলে অভিহিত করা হয়। সেখানেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। সুরমা ব্যতীত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীসমূহের পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নেত্রকোণা জেলার নিম্নাঞ্চল, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় চলমান বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে। অপরদিকে মৌলভীবাজারের মনু-খোয়াই নদের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চলের দুধকুমার, তিস্তা, ধরলা নদীসমূহের পানি বৃদ্ধি পাবে। এতে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।